Home নির্বাচিত লেখা অবিরত লাউ গড় গড় নীরবতার ঝকর ঝকর । সুহৃদ শহীদুল্লাহ ।। পাণ্ডুলিপি পাঠ-প্রতিক্রিয়া

অবিরত লাউ গড় গড় নীরবতার ঝকর ঝকর । সুহৃদ শহীদুল্লাহ ।। পাণ্ডুলিপি পাঠ-প্রতিক্রিয়া

অবিরত লাউ গড় গড় নীরবতার ঝকর ঝকর  ।  সুহৃদ শহীদুল্লাহ ।। পাণ্ডুলিপি পাঠ-প্রতিক্রিয়া
0
0

বই: মৌন ধারাপাত – মাসুমুল আলম / উপন্যাস / ২০১৭, উলুখড়।।

 

একজন মানুষ যখন ছুঁয়ে ফেলে প্রান্তিকতার শেষ রেখা অথচ জীবন তাকে ছিটকে দিতে চায় সেই রেখারও বাইরে তখন কোথায় যায় সে? জীবনের দায় যেহেতু জীবনকেই বাঁচিয়ে রাখা তখন সে কি বেছে নেয় কোনো অমোঘ ফ্যান্টাসি –  যা তাকে মুক্তি দিতে পারে প্রান্তিকায়নের সব হিসেব-নিকেশ থেকে? লাউ গড় গড় থেকে ঝকর ঝক আর ঝকর ঝক থেকে লাউ গড় গড় বৃত্তে আটকে পড়েছে কয়েকটি প্রান্তিক চরিত্র। বয়সের গাছ-পাথর না থাকা আলেকজান বুড়ি, অতীত থেকে উঠে-আসা তার একদা মুক্তিযোদ্ধা স্বামী আয়নাল সর্দার, তাদের সন্তান অন্ধ সানাল, প্রাক্তন বিপ্লবী আপাত লুম্পেন পোস্টমাস্টার আজমল কবির, ধর্মে সংখ্যাগুরুর ভেতরে থেকেও সংখ্যালঘু শাকুর সাহেব আর তার ওয়াকফ-করা কন্যা ফারজানা রেখা, বিহারি ক্যাম্পে থাকা বাঙালি ‘লুচ্চাবুড়ো’ সহ আরো কিছু প্রান্তিক চরিত্রকে অবলম্বন করে মাসুমুল আলমের ছোট আখ্যান ‘মৌন ধারাপাত’। ছোট বলেই বোধ হয় ‘মৌন ধারাপাত’-এর দাবিটা অনেক বড়ো। আপাতসরল একটি কাহিনীর ভেতর দিয়ে মাসুমুল আমাদের জন্য উপস্থাপন করেন এক সাবঅল্টার্ন অধ্যয়ন। ছোট ছোট স্কেচে চরিত্রায়ন, ভাষার ধীর গতি ও ঘনত্ব এবং লুকিয়ে-ফেলা সামাজিক রাজনৈতিক ডিসকোর্স নিয়ে ‘মৌন ধারাপাত’ দাবি করে নিবিড় পাঠের।

আখ্যানের চরিত্রগুলো কোনো আলাদা করে বিশিষ্টতা দাবি করে না। যে-জীবন তাদের দেয়া হয়েছে যেন তাকে শেষ পর্যন্ত যাপন করে যাওয়াটাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য কিন্তু সেটা নিয়েও নেই কোনো আলগা দার্শনিকতা। বাস্তব সময়ের মাত্র দু’দিনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে আখ্যানটি। বর্তমানহীন মানুষগুলো তাই বেঁচে থাকে স্মৃতিতে। আলেকজানের সেই স্মৃতি-সরণি ধরেই যেন উঠে আসে তার স্বামী আয়নাল সর্দার। যখন যেমন কাজ তখন তেমন লেগে যাওয়া এই সরল ধারাপাতে চালিত তার জীবন। অথচ সে-ও একদিন জড়িয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে। কিন্তু তাতে আলাদা করে গুরুত্ব আরোপ হয় না কোনো। শুধু বউ যখন বলে, গোলমাল-তখন তাকে শুধরে দেয়, গণ্ডগোলও নয়, গোলমালও নয়, যুদ্ধ। আয়নাল যে যুদ্ধের আগে ‘মুক্তি’ শব্দটা বসাতে পারে না তা আমাদের একটু অস্বস্তি দেয় বটে। কিন্তু আয়নালদের জীবনে মুক্তিই বা কোথায়? যেমন মুক্তিযুদ্ধের বীরত্ব আবুল কাশেমকে মুক্তি দিতে পারে না ‘কানা কাশেম’ নামাবলী থেকে। ‘সময়ের প্রয়োজনে’ এই দুজন স্বতঃস্ফূর্ত মুক্তিযোদ্ধার এন্টিথিসিস হিসেবে সশস্ত্র ‘বিপ্লবী’ আজমল কবির নিজের জন্য জায়গা দাবি করে। কিন্তু মধ্যবিত্তের কপাললিখন মেনে সব ছেড়ে তাকে যোগ দিতে হয় সরকারি চাকরিতে। ডাকপিয়ন। বিপ্লবের বার্তা বহনের বদলে যার দায়িত্ব এক ছোটগ্রামে চিঠি বিলানোর। এখন তার সময় কাটে বিপ্লবের স্মৃতিরোমন্থনে আর স্বমেহনের দুঃস্বপ্নের ঘেরাটোপে। পতিত মধ্যবিত্তের নার্সিসিজম আর কি!

কথক হিসেবে আজমল কবিরকে পাওয়া গেলেও আখ্যান যেন অনুসরণ করেছে আলেকজানকেই। আর আলেকজানের বাস্তব এবং স্মৃতিপথে যে-সব চরিত্র উঠে এসেছে তাদের টুকরো টুকরো গল্প দিয়ে গাঁথা হয়েছে এ কাহিনী। ছোট ছোট চরিত্রের কোলাজ এই আখ্যান। চরিত্রগুলোর ভবিষ্যৎ নেই কোনো। বর্তমান গতিহীন। অতীত তাদের জীবন্ত ছিল কিছুটা কিন্তু সেখানে যাবার কোনো পথ খোলা নেই আর। এর ফলে আখ্যানের কোনো শুরু বা শেষ নেই। পরিণতি নেই সেই অর্থে। সম্পূর্ণ কোনো গল্প নেই। কিন্তু সব চরিত্রের গল্পই মিলে গেছে তাদের মুক্তিহীনতার দৈনন্দিনতায়। তবে স্বল্প পরিসরে এলেও সবকটি চরিত্র সমান মনোযোগ পেয়েছে লেখকের। চরিত্র চিত্রায়নে মাসুমুলের সংযম আখ্যানটিকে শক্তিশালী এক স্প্রিংয়ের অর্ন্তশক্তি করেছে। যেন স্প্রিং থেকে হাতের ভার তুলে নিলে প্রতিটি চরিত্র সহসা খুলে ধরবে তাদের নিজ নিজ শক্তি। চরিত্রের মোহে পড়লে ছোট এই আখ্যানটি অনায়াসে কয়েকশ’ পৃষ্ঠার মনোহারী গল্প-গাথা হয়ে দাঁড়াতে পারত। কিন্তু লেখকের উদ্দেশ্য সেটি নয়। গল্প না বাড়িয়ে তিনি পাঠকের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন ভাবনার ভার।

এই কাজে মাসুমুলকে সাহায্য করেছে তাঁর ভাষা। ‘মৌন ধারাপাত’ নিয়ে তিনটি বড়ো-ছোট আখ্যান পড়া হল আমার। তিনটিতেই তিনি আখ্যানের দাবি অনুযায়ী ভাষাকে আলাদা আলাদা করে গড়ে নিতে পেরেছেন। এই আখ্যানে যেমন ব্যবহার করেছেন প্রচুর লোকজ উপাদান, শুধু সংলাপে নয়, বর্ণনাতেও স্থানীয় ভাষার ব্যবহারে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। কিন্তু সেসবকে অতিক্রম করে মাসুমুল সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন ভাষার ভেতর থেকে সমস্ত উত্তেজনাকে সরিয়ে ফেলাতে। যেন এক সময়হীনতার ভেতরে বসে কথা বলছেন লেখক। ইচ্ছে করেই ভাষার ভেতরে লুকিয়ে ফেলেছেন গতিকে। কখনো কখনো মনে হতে পারে আখ্যান যেন এগোচ্ছে না কোথাও। দাঁড়িয়ে আছে। কথা বলছে জলের মতো ঘুরে ঘুরে। লাউ গড় গড় থেকে ঝকর ঝক আর ঝকর ঝক থেকে লাউ গড় গড়। কোথায় যেন পড়েছিলাম (অরুন্ধতী রায় থেকে সম্ভবত) আমাদের ক্ল্যাসিক গল্পগুলো হচ্ছে সেইগুলো যার প্রতিটি ঘটনা পাঠক/শ্রোতার জানা, জানে এরপর কী হবে, কোন চরিত্র কী বলবে, তবু সেই গল্প পড়া/শোনার জন্য পাঠক আন্তরিক অপেক্ষা নিয়ে বসে থাকে। ‘মৌন ধারাপাত’ তো তেমনি এক আখ্যান। প্রাচীন ভিখারিনী আলেকজানের মন্থরগতির চলাফেরা আর তার ভ্রমণপথের কয়েকজন ছুঁয়ে যাওয়া মানুষ। গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে তাদের দৈনন্দিনতা। এর বাইরে আর কী-ইবা আছে আখ্যানটিতে! তবু এটি আমাদের শেষ পর্যন্ত পড়তে হয়। কয়েকবার পড়তে হয়। খুঁজতে হয় গল্পের আড়ালে লেখক আমাদের অন্যকিছু বলতে চাননি তো! এত সাধারণ একটি গল্প কিভাবে তাহলে আমাদের অসাধারণভাবে ধরে রাখে। পড়িয়ে নেয় সবটুকু। আগেই বলেছি, এক-একটি চরিত্র এত ছোট স্কেচে কিন্তু পরিণতভাবে আঁকা যে তাদের প্রত্যেকের গভীরতা ধরে আখ্যান তার নিজ অভিমুখ খুঁজে নিতে পারত। প্রত্যেকের বলার মতো নিজস্ব গল্প আছে। কিন্তু লেখক সেসবকে অল্পকথায় বলে বাকিটুকু রেখে দিচ্ছেন পাঠকের জন্য। যেন পাঠককে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন লেখক যে, এই চরিত্রগুলো তো তোমার জানা। তুমি নিজেই কেন নিজেকে শোনাচ্ছ না এইসব চরিত্রের বাকি কথা, বাকি ইতিহাস।

আমি যেমন নিজের মতো করে বেছে নিয়েছি আখ্যানের এক ভাগ। দারিদ্র্য হ্রাসকরণের প্রকল্পের মহতী উদ্বোধনী অনুষ্ঠান যেন সফল ও সার্থকভাবে শেষ হতে পারে তার জন্য একে একে প্রান্তিক চরিত্রগুলো ধরা পড়ে রাষ্ট্রপ্রহরীদের হাতে আর একবেলার জন্য আটকে পড়ে শাকুর সাহেবের অর্ধনির্মিত পোড়ো বাড়ির বারান্দায়। বেদের দল আর হিজড়াদের ফিরে যেতে হয় উপার্জনহীন। আলেকজানের অন্ধ ছেলে সানালের ‘মজমা’ ক্যান্সেল হয়ে যায়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বসা মজমা’র জন্য এক অর্ধনির্মিত বাড়িতে আটকে রাখা হয় ওই গ্রামেরই অতিদরিদ্র মানুষদের। পেশাগত পরিচয়ের বাইরে থাকা আজমল কবির যখন সন্ধ্যার পরে খবর দিতে আসে যে, মজমা শেষ, সবাই চলে গেছে-এখন মুক্তি। তখন সে এসে যা দেখে তাতে তালগোল বেধে যায়। ধারণা হিসেবে ‘মুক্তি’তো আসলে তাদের কাছে একটি ধোঁয়াশাচ্ছন্ন ব্যাপারই। আপাত মুক্তি পেলেও কোনো গন্তব্য খুঁজে পাওয়া যায় না তাদের। প্রথমে আলেকজান আর তাকে অনুসরণ করতে করতে আজমল কবির হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় এক নদীর দিকে। সেখানে যে এক নৌকা বাঁধা আছে-চাঁদের বুড়ি দেখায় তাদের। শাকুর সাহেব অবশ্য এই দলে নেই এবার। ধার্মিক হয়েও ধর্ম নিয়ে তার ভিন্ন প্রচারণার কারণে ‘ঈমান হোমিও ফার্মেসি’ সহ তাকে আগুনে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা হয়েছিল। তিনি হাসপাতাল থেকে পালিয়ে একটি ফেস্টুন নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন রাস্তায়। কিন্তু এদেশে সংখ্যালঘুদের ফেস্টুন কে কবে পড়েছে? কোথাও বলেন না লেখক কিন্তু আমরা বুঝে যাই শাকুর সাহেবের অর্ধনির্মিত পোড়ো বাড়িটি আসলে অর্ধনির্মিত বাংলাদেশ। প্রান্তিক মানুষের জন্য যা পোড়ো’র অতিরিক্ত কোনো মানে তৈরি করে না আর। যেখান থাকতে থাকতে প্রান্তিক মানুষগুলো ভুলে গেছে মুক্তি বলে আদৌ আছে কিনা? থাকলে সেই মুক্তি আসলে তাদের কোনো কাজে আসবে কি? কোনো প্রশ্ন নেই তাই। অভিযোগহীন এক ফ্যান্টাসির ভেতর তাই হেঁটে চলা আর চাঁদের বুড়ির দেখিয়ে দেয়া নৌকা ভাসা-ই হয়তো তাদের সর্বশেষ গন্তব্য; মৃত্যু এসে যতদিন না কোলে তুলে নিচ্ছে তাদের।

আলেকজানের হাঁটার বিবরণ দিয়ে শুরু হওয়া আখ্যান শেষ হয় আলেকজানের হাঁটাকে অনুসরণ করেই। সব ফেলে আজমল কবির তাকে কেন অনুসরণ করে? আলেকজানই-বা যায় কোথায় শাকুর সােেহবের পোড়ো বাড়িতে তার ছেলেসহ আর সব প্রতিবেশীকে ফেলে? এইসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না শেষ পর্যন্ত। কিন্তু দারিদ্র্য হ্রাসকরণ প্রকল্পের উদ্বোধনী দিনে অতিদরিদ্র আলেকজানের যে উত্তরণ ঘটে চাঁদের বুড়ির উচ্চতায়- আপাত ঘোরলাগা আজমল কবির কি নিজের জন্য তাতে মুক্তি দেখতে পায় কোনো? পৃথিবীর ওপর সব দাবি ছেড়ে এই অতিজাগতিক হণ্টনই শেষ পর্যন্ত আখ্যানের সত্য হয়ে থাকে আমাদের কাছে।

বাংলা কথাসাহিত্যের ভবিষ্যৎ যে-গুটিকয় লেখকের হাতে বলে আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস তাদের মধ্যে মাসুমুল আলমের ওপর সবচেয়ে বেশি ভরসা আমার। একটি গল্পগ্রন্থ এবং দুটি উপন্যাস দিয়ে তিনি ইতোমধ্যে সে-জায়গাটি মজবুত করেছেন আরো। ‘মৌন ধারাপাত’ তাঁর সেই জায়গাকে বিস্তৃত করবে আবার। মাসুমুল আলমের সর্বশেষ ছোট আখ্যান ‘মৌন ধারাপাত’ বর্তমান বাংলাসাহিত্যে এক বড়ো সংযোজন বলে আমার আন্তরিক বিশ্বাস।