Home নির্বাচিত লেখা জ্যোতি পোদ্দারের কবিতা ।। কবিতা

জ্যোতি পোদ্দারের কবিতা ।। কবিতা

জ্যোতি পোদ্দারের কবিতা ।। কবিতা
0
0

বই : করাতি আমাকে খুঁজছে – জ্যোতি পোদ্দার / ২০১৬, উলুখড়।।

 

করাতি আমাকে খুঁজছে

 মিঠু ফার্নিচার মার্ট আমাকে

ফিতে দিয়ে মেপে টেপে

হিসাব নিকাশ করে বের করে ফেলল

কয় সেপটি হব।

দরদামও ঠিকঠাক।

চোখের আড়াল হতেই

আমি দৌড়ে পালালাম।

আমার শরীরে বাঁধা দোলনা আছড়ে পড়ল সড়কে।

করাতি আমাকে খুঁজছে।

সদর রাস্তার উল্টা দিকে রাগী রাগী

যে নারীবাদী মহিলা আজকাল

বৃক্ষ বাঁচাও নদী বাঁচাও ক্যাম্পেইন করছে

বিলাচ্ছে ফেইস বুকের শেয়ার লিংক–

তাঁর বাড়িতেই ঢুকে পড়ি নিমিষে।

দরজায় কলিং বেল নেই।

গেইটেও নেই।

কড়া নাড়তেই খুলে দিলেন তিনি।

রাগী রাগী চোখ কোথায় রেখেছিলেন তিনি?

আহা! দুগ্গা মায়ের সজল কাজল চোখ।

কী যে ভালো লাগল চোখের ছায়া!

ভয়ার্ত শরীরে আমার তখন গভীর জলের প্রসন্নতা।

যে প্রসন্নতা একদিন আমি

সিদ্ধার্থকে দিয়েছিলাম।

রাধাকেও।

চৈতন্যও আমাকে জড়িয়ে ধরে

হা কৃষ্ণ, হা কৃষ্ণ বলে

কেঁদে ভাসিয়েছে অখণ্ড বাংলা।

বৃক্ষ যখন ছত্রপতি

বৃক্ষের প্রসন্নতায় প্রসবিত হয়।

কালের দিশা।

কে দেখাবে পথ?

আমিই তো কালের দিশা

প্রথম নতুন।

বৃক্ষ যখন হাঁটতে শুরু করে মানুষ তখন ঘুরে দাঁড়ায়।

এ কী?

কী দেখছি আমি?

লোভাতুর চোখের নোনাজলে ডুবে যাচ্ছে প্রীতিচোখ।

তুমি নিজেই এসেছ যখন।

আমার আলনা হয়ে থাক।

অথবা ওয়ার্ডরোব?

ঘর খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগছে

তুমি এলে ভরে উঠবে সব।

দামি জামদানি, সুগন্ধি, গয়না-সব, সবকিছু

তোমাকে জড়িয়ে রাখবে।

এইযে তোমায় কাঁধের দিক–কী সুন্দর গোল!

কী নরম শিশিরভেজা ত্বক তোমার!

যা উজ্জ্বল দেখাবে না তোমায় –

কী আর বলব?

যেন র‌্যাম্পে হাঁটছ।

তোমার সুডৌল উরুর প্যাঁচালো বঙ্কিম

খাঁজে আঁকব ভাস্কর্য।

আমার ড্রয়িংরুমে থাকবে তুমি।

আমার কমরেডদের বিস্ফারিত চোখ

চড়কগাছে দেখে

আমার কী যে ভালো লাগবে–আহা!

কী যে ভালো লাগবে!

লোভাতুর চোখ নিমজ্জিত হতেই

আমি দে ছুট…

ছুটছি… ছুটছি…

করাতি আমাকে খুঁজছে।

 

গৃহপালিত সৌন্দর্য

তিনটি পাখি– ছোট্ট– সবে চোখ ফুটেছে।

লোমশ লাল চামড়া সূর্যের আলোয় আরো লাল।

যেন হোলি উৎসবে ছড়ানো আবির।

বাবা পাখি দেশান্তরী।

অথবা নাগরিকের সৌখিন খাঁচায়

গৃহপালিত সৌন্দর্য।

অথবা শিকারির জালে বন্দি আনন্দ।

আস্তিন গুটিয়ে নেশাতুর শিকারি শান দিচ্ছে চাকু।

এক নিমিষেই রান্না প্রস্তুত।

হাতের কাছেই রয়েছে প্রাণ-গুঁড়া মসলা।

আঁতুড়ঘরে মা পাখি শরীরের অবসন্নতার

গোলাপি চাদর সরিয়ে

দেখে নিচ্ছে আকাশ।

দেখে নিচ্ছে সারি সারি ধিঙ্গি রাবারগাছের উচ্চতা।

দেখে নিচ্ছে ফুলহীন, ফলহীন, প্রজাপতিহীন

রাষ্ট্রীয় সবুজ বনায়ন কর্মসূচি।

বোতাম খোলা শার্টের মতো উদোম লোমশ বুক নিয়ে

তিনটি পাখির ওড়াউড়ি দেখে

কেঁপে ওঠে মা পাখির ছোট্ট বুক।

খামচে ধরে পতিত পালক।

ঠুকরে ঠুকরে ভাঙে গেরস্থালির সঞ্চিত খড়কুটো

আধখাওয়া ফলের খোসা; শুকনো পাতা, মৃত পোকার

লাশ আর পাখি পরিবারের যৌথ স্বপ্নবীজ।

 

জাতীয়তাবাদ

কিছুদূর এগোলেই মান্দিপল্লির

সাধু আন্দ্রের ধর্মপল্লি হয়ে ওঠার ইতিহাস।

কিছুদূর এগোলেই গারো পাহাড়

ভূমিকেন্দ্রিক জীবন ত্যাগের পৌরগীতি।

আর রাষ্ট্রের পাটিগণিতের বিস্তর

হিসাব নিকাশের যোগ বিয়োগ–

পূরণ ভাগের ছলাকলা।

ভোটব্যাংকের ঐকিক রাজনীতি।

অথবা আবাদি জমিনে

শকুনির পাশাখেলা।

কী নেই এখানে?

এই যে যেমন ধরুন–

ভিন্নতাকে ভেঙেচুরে একরূপতার

বাঙালি ছাঁচের সরল অঙ্ক।

কোনায় কোনায় কৌণিক পাহাড়চূড়ায়

ধিঙ্গি রাবার বাগান,

থরে থরে সাজানো

নাগরিক বিলাসের অর্থনীতি–

তথা প্রবৃদ্ধি সূচক।

সবই আপনি পাবেন এখানে।

আরেকটু এগোন, জনাব।

নেই শুধু সূচকের চূড়ায়

পাখপাখালির ডানা ঝাপটানোর সংগীত।

লাল মাটির মাতালগন্ধ

আর বুনো ফুলের ঝিলিক।