Home নির্বাচিত লেখা দুয়েন্দের তত্ত্ব ও কার্যক্রম । ফেদেরিকা গার্সিয়া লোরকা ।। অনুবাদ : শান্তনু চৌধুরী। প্রবন্ধ

দুয়েন্দের তত্ত্ব ও কার্যক্রম । ফেদেরিকা গার্সিয়া লোরকা ।। অনুবাদ : শান্তনু চৌধুরী। প্রবন্ধ

দুয়েন্দের তত্ত্ব ও কার্যক্রম  ।  ফেদেরিকা গার্সিয়া লোরকা ।। অনুবাদ : শান্তনু চৌধুরী। প্রবন্ধ
0
0

বই: লব্ধস্বর – শান্তনু চৌধুরী / প্রবন্ধ ও অনুবাদ গ্রন্থ/ উলুখড়, ২০১০।।

 

যদি কেউ হুকার, গুয়াদালেতে, সিল অথবা পিসুয়ার্গা নদীবর্তী ষাঁড় চরে বেড়ানো বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ঘুরে বেড়ান, তিনি আগে কিংবা পরে এ-রকম এক অভিব্যক্তি শুনতে পাবেন, ‘এর অনেক দুয়েন্দে আছে।’ ম্যানুয়েল তোরেস নামে একজন মহান আন্দালুশীয় শিল্পী এক অনুষ্ঠানে কোনো একজন গায়ককে বলেছিলেন: ‘তোমার স্বর আছে, ভঙ্গিমা আছে, কিন্তু তুমি কখনও সফল হবে না, কারণ তোমার কোনো দুয়েন্দে নেই।’

আন্দালুশিয়ার সর্বত্র, জেনের পর্বতমালা থেকে কাদিজের উপকূল পর্যন্ত লোকজন প্রতিনিয়ত দুয়েন্দে সম্পর্কে বলাবলি করে এবং যখন কোথাও এটি দৃষ্টিগোচর হয় তখন ওরা চিরায়ত প্রেরণায় এর সঙ্গে একাত্ব হয়ে যায়। দেবলার স্রষ্টা, বিস্ময়কর ফ্ল্যামেঙ্কো গায়ক এল লেব্রিহানো বলেন, ‘যখন আমি দুয়েন্দের সঙ্গে গান গাই, কেউ আমার সমকক্ষ হতে পারে না।’ব্রেইলোস্কির বাজানো বাখ শুনে বৃদ্ধা জিপসি নৃত্যশিল্পী লা মালেনা একবার বিস্ময়ের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘বাহ! এর দুয়েন্দে আছে!’ যদিও আজো তিনি গ্লাক, ব্রাহমস এবং দারিউস মিলহাদের ওপর বিরক্ত। ম্যানুয়েল তোরেস, যার শিরায় অন্য যে কারো চেয়ে অনেক বেশি সংস্কৃতি মিশে আছে— যখনই তাঁকে আমি ফাল্লায় তাঁর নিজের ‘নকতার্নো দেল জেনারেলাইফ’ বাজাতে শুনি, তখন এই উজ্জ্বল অভিমতটুকুই মনে হয়, ‘সমস্ত কিছু, যার মধ্যে রয়েছে অন্ধকার ধ্বনি, তাতে আছে দুয়েন্দে।’ এর চেয়ে আর কোনো মহত্তর সত্য নেই।

এসব  ‘অন্ধকার ধ্বনিমালা’ হচ্ছে রহস্য, আমরা জানি এর শিকড়গুচ্ছ ঢুকে যায় উর্বর দোয়াঁশ মাটিতে, যা আমাদের সবার অজ্ঞাত থাকে। অথচ তা থেকেই আমরা বুঝতে পারি শিল্পের সত্য কোনটি। তোরেস এখানে গ্যেটের সঙ্গে একমত। তিনি প্যাগানিনি সম্পর্কে বলতে গিয়ে দুয়েন্দেকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে, ‘এটি এক রহস্যময় শক্তি যা প্রত্যেকেই অনুভব করেছেন, কিন্তু কোনো দার্শনিক তার ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।’

তাই দুয়েন্দে হচ্ছে একটি শক্তি, কিন্তু কোনো আচরণ নয়, এটি এক ধরনের যন্ত্রণা কিন্তু কোনো ধারণা নয়। আমি একজন বৃদ্ধ গিটার ওস্তাদকে বলতে শুনেছিলাম: ‘দুয়েন্দে কণ্ঠ নয়, পায়ের তলদেশ থেকে উৎসারিত।’ মানে, এটি কোনো রকম পারদর্শিতার বিষয় নয়, কিন্তু রক্তের, প্রাচীন সংস্কৃতির, সৃষ্টিমূলের প্রকৃত জীবনকাঠামো।

এই যে রহস্যময় শক্তি যা প্রত্যেকেই অনুভব করেছেন, কিন্তু যার ব্যাখ্যা কোনো দার্শনিক দিতে পারেননি, বাস্তবিক তা হল পৃথিবীর জীবনী-শক্তি। এটি সেই দুয়েন্দে যা নীটশের হৃদয় সজোরে আঁকড়ে ধরেছিল, তিনি এর বাহ্যিক অবয়ব খুঁজেছিলেন রিয়ালতো সেতুর মধ্যে অথবা বিজেটের আয়াসহীন চিরায়ত সঙ্গীতে, কিন্তু এর খোঁজ পাননি কখনোই, এমনকি তিনি জানতেও পারেননি যে তা ছুটে বেড়িয়েছে রহস্যময় গ্রীস থেকে কাদিজের নর্তকীদের মধ্যে কিংবা যা ছিল সিলভেরিওর সেগুইরিয়ার ভাঙা ডায়োনিয়াক কান্নায়।

আমি চাই না কেউ দুয়েন্দেকে লুথারের ধর্মীয় দৈত্যের সন্দেহে দেখুক, যার উদ্দেশে সুরাদেবতার মত্ততায় তিনি একটি দোয়াত ছুঁড়ে দিতে পারেন নুরেমবার্গে; ক্যাথলিক দৈত্যদের সঙ্গেও নয়, সেই বিধ্বংসী এবং বুদ্ধিহীন দৈত্যরা, যারা নিজেদের গোপন করে সন্ন্যাসীদের আখড়ায় ঢুকে পড়ে।

না। অন্ধকার এবং কল্পিত দুয়েন্দে, যা নিয়ে আমি কথা বলছি, তা সক্রেটিসের উল্লসিত দৈত্যদের বংশধর, যে হেমলক পানের দিন রাগান্বিত হয়ে সমস্ত পাথর ও লবণ ছড়িয়ে দিয়েছিল তাঁর শিক্ষকের মাথার ওপর ; দেকার্তের বিষণ্ণ দৈত্যেরও তা বংশধর, একটি সবুজ কিসমিসের মতোই যা ছিল ক্ষুদ্র, রেখা ও বৃত্তের মধ্যে ক্লান্ত হয়ে অবশেষে যে বাইরে নদীর ধারে বেরিয়ে গিয়েছিল মাতাল নাবিকদের গান শুনতে।

প্রত্যেক পদক্ষেপে একজন মানুষ, তা ছাড়াও নীটশে যেমন একজন শিল্পীকে বলেন, তাঁর যন্ত্রণার মূল্যে যখন পূর্ণতার চূড়োয় পৌঁছুতে চায়, তখন তাতে সমন্বিত হয়ে থাকে দুয়েন্দে, কোনো দেবদূতের মাধ্যমে নয় এবং বলা যায় কোনো কলাদেবীর সহযোগেও নয়। কেননা কোনো কাজের মর্মমূলে পৌঁছতে হলে প্রয়োজন হল প্রাথমিক বিন্যাস থেকে পরিসমাপ্তি পর্যন্ত এর মৌলিক পার্থক্যগুলো খুঁজে বের করা।

দেবদূত সেন্ট রাফায়েলের মতো পথনির্দেশ দেন কিংবা কোনো দৈবগুণে ভূষিত করেন, সেন্ট মাইকেলের মতো আত্মরক্ষার নিশ্চয়তা দেন কিংবা সেন্ট গ্যাব্রিয়েলের মতো সতর্ক করেন।

দেবদূত আলোময়, আর শুধু উড়ে উড়ে অবস্থান করেন মানুষের শিরোদেশে। তিনি উজ্জ্বলতা বিলিয়ে দিতে পারেন এবং মানুষ সম্পূর্ণ নির্বিকার চিত্তে তাঁর বৃত্তি, দয়া কিংবা নৃত্যের ভঙ্গিমা আত্মস্থ করে। দামেস্কের পথে কিংবা আসিসির ক্ষুদ্র জাফরিকাটা জানালার মধ্য দিয়ে যে দেবদূত এসেছিলেন অথবা হাইনরিখ সুসোর পায়ের রেখা অনুসরণ করেছিলেন যিনি, তিনি একজন দেবদূত, যিনি আদেশ দেন এবং তাঁর ঔজ্জ্বল্য কেউ প্রতিরোধ করতে পারে না। কেননা নিজস্ব পরিসীমার মধ্যে কেবল ইস্পাতের পাখায় ভর দিয়ে ভেসে বেড়ান তিনি।

আর কলাদেবী বাণী প্রেরণ এবং মাঝেমধ্যে অনুপ্রাণিত করে থাকেন। অথচ তিনি অপেক্ষাকৃত কম সক্রিয়। আর এখন তো তিনি ক্লান্ত হয়ে দূরে সরে গেছেন—কিন্তু তাঁকে আমি দু’বার দেখেছি এবং সে-সময় মার্বেলের অর্ধেক হৃদপিণ্ড দিয়ে তাঁকে আমি সক্ষম করে তুলেছিলাম। কলাদেবী-প্রাণিত কবিরা কণ্ঠস্বর শুনতে পান, কিন্তু তাঁদের কাছে অজ্ঞাত থেকে যায় কোত্থেকে এসব আসে। এসব আসে কলাদেবীর কাছ থেকে, যিনি ওদের উৎসাহিত করেন; এমনকি মাঝেমধ্যে ওদের ওপর ভরও করেন। অ্যাপোলিনেয়ারের এ-রকম এক ঘটনা ছিল, ভয়ঙ্করী কলাদেবীর হাতে তছনছ হয়ে যাওয়া এই কবিকে এঁকেছিলেন অনুরূপ দৈবী ও পরাক্রান্ত রুশো। কলাদেবী আমাদের বুদ্ধিকে জাগ্রত করেন আর আমাদের কাছে এনে দেন সমুদ্রবর্তী স্থলভাগের দৃশ্য এবং লরেলের মিথ্যে স্বাদ। প্রায় সব সময়ই বুদ্ধিবৃত্তি কবিতার জন্য শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। কেননা বুদ্ধি কবিতায় এনে দেয় খুব বেশি চাকচিক্য। ফলে বুদ্ধিবৃত্তি কবিকে নিক্ষেপ করে কাঁটার ধারালো প্রান্তরে এবং তাঁকে এমন ঘটনা বিস্মৃত করে তোলে যেন তিনি হঠাৎ পিঁপড়ে দ্বারা আক্রান্ত হন কিংবা তাঁর মাথার ওপর পতিত হয় একটি বিশাল বিষাক্ত গলদা চিংড়ি। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, এক চোখঅলা চশমাপরা বা ক্ষুদে চিত্রপ্রদর্শনীর উষ্ণ বার্নিশ করা অনুজ্জ্বল গোলাপে ঘুরে বেড়ানো কলাদেবীগণ একেবারে ক্ষমতাহীন।

দেবদূত এবং কলাদেবী শূন্যতা থেকে আসেন; যদিও দেবদূত তাঁর ঔজ্জ্বল্য বিলিয়ে দেন এবং কলাদেবী পাঠিয়ে দেন তাঁর উপলব্ধি (হেসিয়ড এসব থেকে শিক্ষা নিয়েছিলেন)। আর কবিগণ লরেলের ঝোপে সোনার পাতা অথবা ভাঁজ করা সুদৃশ্য পোশাক থেকে তাঁর ভঙ্গি গ্রহণ করেন। অপর পক্ষে দুয়েন্দে আমাদের রক্তের প্রতিটি কণা থেকে উৎসারিত।

আমরা অবশ্যই দেবদূতকে বিতাড়িত করব এবং লাথি মেরে বের করে দেব কলাদেবীকে। আর অষ্টাদশ শতাব্দীর কবিতা থেকে বিচ্ছুরিত বেগুনি বর্ণের সুরভির আশঙ্কা মুছে ফেলব। তাছাড়া উন্মুক্ত করব মহান দূরবিন, যার লেন্সগুলোয় ঘুমিয়ে আছেন বন্দী পীড়িত কলাদেবী।

প্রকৃত যন্ত্রণা দুয়েন্দেকে নিয়ে।

সকলেই জানেন কিভাবে ঈশ্বরকে খুঁজতে হয়। সেটি হোক মাথায় সেন্ট তেরেসার চূড়া নিয়ে সাধুসন্তদের মতো দুর্গম পথ পরিক্রমায়, নয়তো অতীন্দ্রিয়বাদের ধ্যানে কিংবা সেন্ট জন অব দ্য ক্রসের তিন রাস্তায় হেঁটে হেঁটে। এমনকি আমাদের যদি ইসাইয়ার ভাষায় সশব্দে বলতে হয়, ‘শিল্প সত্যিই তুমি অবগুণ্ঠিত ঈশ্বর’, তবে ঈশ্বর অনুসন্ধিৎসুর জন্য পাঠিয়ে দেন আগুনের প্রথম কণ্টকমালা।

কিন্তু দুয়েন্দেকে দেখার সহায়ক পন্থা হিশেবে, না মানচিত্র না নিয়মাবলী কোনো কিছুরই প্রয়োজন পড়ে না, সবাই জানেন তা আমাদের রক্তকে কাচের গুঁড়োর মতো পোড়ায়। তা নিঃশেষিত করে এবং বাতিল করে দেয় জ্ঞাত মিষ্টি জ্যামিতি, ভেঙে দেয় পদ্ধতি। এটি গোইয়াকে, সেরা ইংরেজি চিত্রকর্মের ধূসর, রুপোলি ও গোলাপি বর্ণের যিনি সম্রাট, তাঁকে বাধ্য করে ভয়ঙ্কর খনিজ কালো রঙে আঁকতে; অথবা তা হাসিন্ত ভের্দাগুয়েরকে উদোম করে ফেলে রাখে পিরেনিজের হিম বাতাসে কিংবা এটা সেই সত্তা যা হর্হে মানরিককে ওসানার অরণ্যে দাঁড় করিয়ে রাখে মৃত্যুর প্রতীক্ষায়। কিংবা যা র‌্যাঁবোর পেলব শরীর দড়াবাজের সবুজ পোশাকে আবৃত করে দেয়; কিংবা এটি প্রত্যুষের প্রশান্ত রাস্তায় কাউন্ট লোত্রিমোঁকে দিয়ে যায় মৃত মাছের চোখ।

দক্ষিণ স্পেনের জিপসি কিংবা ফ্ল্যামেঙ্কোর মহান শিল্পীগণ যারা গান, নাচেন, অথবা বাজান, তাঁরা জানেন প্রকৃত আবেগেও কোনো কিছু সম্ভব নয়, যদি তাতে দুয়েন্দে না থাকে। এমনকি দুয়েন্দের ভাবাচ্ছন্নতার মিথ্যে অভিব্যক্তি দেখিয়ে তাঁরা প্রতারিতও করতে পারেন দর্শকদের, যেমন অনেকেই প্রতিদিনের জীবনে প্রবঞ্চিত হন দুয়েন্দেহীন লেখক, চিত্রকর আর সাহিত্যিক প্রচলে; কিন্তু কেউ যদি গভীর আন্তরিকতার সঙ্গে এবং অমনোযোগী না হয়ে প্রত্যক্ষ করেন, তবে তাঁর কাছে এসব মিথ্যাচার সহসা ধরা পড়বে এবং প্রকাশিত হয়ে পড়বে দুয়েন্দের নামে এই ছল-চাতুরি।

আন্দালুশীয় ফ্ল্যামেঙ্কো গায়িকা প্যাস্তোরা পেভন, চিরুনিসমেত বালিকা, সেই হিস্পানি প্রতিভা, যার কল্পনা ছিল গোইয়া কিংবা ষাঁড়যোদ্ধা রাফায়েল এল গাল্লোর সমকক্ষ, এক অনুষ্ঠানে গান গাইছিলেন কাদিজের এক ছোট্ট সরাইখানায়। তিনি গাইলেন তাঁর ছায়ার কণ্ঠস্বরে, তরল ধাতুর স্বরে, তাঁর শেওলাজমা স্বর দিয়ে, তাঁর দীঘল চুলের সঙ্গে জড়িয়ে। তিনি তাঁর কণ্ঠ ভেজালেন মানজানিলা মদে এবং তা হারিয়ে ফেললেন অন্ধকার আর দূরবর্তী ঘন জঙ্গলের মধ্যে। যদিও তিনি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হলেন, কিন্তু তা কোনো কারণে নয়। তাই দর্শকরা ছিলেন একেবারে নীরব।

দর্শকদের মধ্যে ছিলেন রোমান কচ্ছপের মতো সুদর্শন ইগনাসিও এস্পেলেতা, যিনি একবার আরগান্তোনিওকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘এ কেমন কথা, তুমি কখনো কাজ কর না।’আর সুস্মিতভাবে আরগান্তোনিও প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন, ‘কেন আমি কাজ করব, আমি তো কাদিজ থেকে এসেছি।’

আরো উপস্থিত ছিল সোলেদাদ ভার্গেসের প্রত্যক্ষ বংশধর, সেভিলের সম্ভ্রান্ত অগ্নিময় বেশ্যা এলোয়সা, তার একই রক্তধারার নয় বলে ১৯৩০ সালে একজন রথচাইল্ডকে বিয়ে করতে সে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। সেখানে আরো ছিল ফ্লোরিদারা। অধিকাংশের বিশ্বাস ছিল, তারা হবে কশাই। কিন্তু বাস্তবে এখনো তারা প্রাচীন পুরোহিতদের মতো গেরিয়নকে ষাঁড় উৎসর্গ করে। এবং এক কোণায় বসেছিল ক্রেটের মুখোশের মতো দেখতে সেই জমকালো ষাঁড়ের প্রতিপালক দন পাবলো মুরুবে। প্যাস্তোরা পেভন নৈঃশব্দ্যের মধ্যে তাঁর গান শেষ করলেন। শুধু সে সময় হিজড়া নর্তকীদের মধ্য থেকে একজন ছোটখাটো লোক শাদা ব্রান্ডি বোতলের আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে এসে নিচু গলায় শ্লেষভরে বললেন: ‘ভিভা প্যারিস!’ যেন বোঝাতে চাইলেন : ‘এখানে আমরা কোনো রকম পারদর্শিতা, কৌশল কিংবা ওস্তাদিকে পরোয়া করি না, পরোয়া করি অন্য কিছুর।’

ঠিক সেই মুহূর্তে চিরুনিসমেত বালিকা ভর-করা নারীদের মতো উঠে দাঁড়ালেন। তারপর মধ্যযুগীয় বিলাপকারিণীদের মতো একটা বড় কাজেলা গ্লাসে বিরামহীন ব্রান্ডির আগ্নেয় জল পান করতে করতে ভেঙে পড়লেন। পরিশেষে তিনি গাইতে বসে পড়লেন স্বরহীন, শ্বাসহীন, কোনো কৌশল ছাড়াই। এবারে তাঁর কণ্ঠ যেন জ্বলে উঠল, কিন্তু দুয়েন্দেসহ। তিনি মুক্ত হয়ে গেলেন গানের সেই কণ্ঠরোধী অবস্থা থেকে। কিন্তু তা তিনি শুধুমাত্র পেরেছিলেন দুয়েন্দের উন্মুক্ত এবং জ্বলন্ত অনুষঙ্গে, বালিভারাক্রান্ত বাতাসের সহযোগে; আর যারা শুনছিলেন, সেন্ট বারবারার প্রতিকৃতির সামনে জড়ো হওয়া ক্যারিবিয়ার নিগ্রোদের মতো তারা তালে তালে ছিঁড়ে ফেলছিলেন পোশাক।

চিরুনিসমেত বালিকাকে চিরে ফেলতে হয়েছিল তাঁর কণ্ঠস্বর, কারণ তাঁর গান শুনছিলেন অভিজাতগণ, যারা রীতি চাননি, চেয়েছিলেন রীতির নির্যাস, কারণ সঙ্গীত উঠে যায় বিশুদ্ধ আত্মায়। এজন্য দক্ষতা এবং আনুষঙ্গিক বিষয়সমূহ তাঁকে গোপন করে রাখতে হয়েছিল এবং তাড়িয়ে দিতে হয়েছিল তাঁর কলাদেবীকে, যাতে তিনি একাকী থাকতে পারেন, যেন দুয়েন্দে এসে যেতে পারে তার সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে। আর কী চমৎকারই-না তিনি গাইলেন! তিনি আন্তরিক হয়ে গেলেন এবং তাঁর কণ্ঠস্বর হয়ে উঠল এক উচ্ছ্বসিত রক্তের ফিনকি, শুধুমাত্র দুয়েন্দের এই যন্ত্রণা আর বিশ্বস্ততার জন্যে। তখন এটি খুলে গেল ঠিক হুয়ান দে হুনিকৃত যিশুর পেরেকআঁটা পায়ের আক্ষেপে হাতের দশটি আঙুলের মতো।

দুয়েন্দের স্বরূপ হচ্ছে সব সময় পুরোনো কাঠামোর ওপর অবস্থিত পূর্বস্বীকৃত সব রীতিনীতির এক মৌলিক পরিবর্তন। এটি জাগিয়ে দেয় অজ্ঞাত সজীবতার অনুভব, যেখানে থাকে অভিনব গোলাপ সৃষ্টির গুণাগুণ, অলৌকিকের উপলব্ধি, পরিশেষে যা প্রায় এক আধ্যাত্মিক প্রাণনার সঞ্চার করে।

সমস্ত আরবি শিল্পে, গানে কিংবা নাচে দুয়েন্দের স্বরূপ ‘আল্লাহ! আল্লাহ!’ ‘ঈশ্বর! ঈশ্বর!’ ইত্যাদি বিস্ময়কর শব্দে শব্দে আলোড়িত, যা ষাঁড়লড়াইয়ের বিমুগ্ধ আওয়াজ থেকে দূরে নয়। আর দক্ষিণ স্পেনের গানে দুয়েন্দে উপস্থিত হয় ‘ভিভা দিওস’ এই মনোজ্ঞ শব্দে, যা হল পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে ঈশ্বরের নৈকট্য লাভের এক গভীর মানবীয় ও কোমল ক্রন্দন, দুয়েন্দের পবিত্র অনুষঙ্গে যা নর্তকীদের শরীর আর শব্দকে উদ্দীপিত করে, যা এ-পৃথিবী থেকে উত্থিত এক প্রকৃত এবং কাব্যিক বিমূর্ততা, এটি তেমনই বিশুদ্ধ যা সপ্তদশ শতাব্দীর পদপ্রান্তের কবি পেদ্রো দে রোহাস ধারণ করেছিলেন সপ্ত উদ্যানের মাধ্যমে কিংবা সেন্ট ক্লাইমেকাস যা অর্জন করেছেন বিলাপের কম্পিত সিঁড়িতে।

এভাবে বিমূর্ততা যখন এসে পড়ে তখন এর ফলাফল অনুভব করেন প্রত্যেকেই এবং দীক্ষিত হয়ে যাঁরা বিষয়টি অনুভব করেছেন তাঁরা জানেন, কিভাবে এর অনুসৃত পথে নিকৃষ্ট বিষয়ও সফলতা লাভ করে এবং অজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে কিভাবে প্রকৃত আবেগও প্রকাশ-অতীত থেকে যায়। বছর কয়েক আগে হেরেথ দে লা ফ্রন্তেরার নৃত্য প্রতিযোগিতায় একজন আশি বছরের বৃদ্ধা তাঁর হাত ও পায়ের চমৎকার মুদ্রা দেখিয়ে, মাথাকে পেছন দিকে সজোরে হেলিয়ে দুলিয়ে, মঞ্চে পা ঠুকে, জলের মতো কোমরবিশিষ্টা সুন্দরী মহিলা ও বালিকাদের মুখের ওপর সমস্ত পুরস্কার ছিনিয়ে নিয়েছিলেন; সেই কলাদেবী ও দেবদূতের দঙ্গলে, কাঠামো আর হাসির সৌন্দর্যরাশির হট্টগোলে, জংধরা ছুরির ডানাযুগল মাটিতে আঁচড়াতে আঁচড়াতে মুমূর্ষু দুয়েন্দে জয়ী হতে বদ্ধপরিকর ছিল আর সত্যিই হয়েছিলও তা।

সমস্ত শিল্পই দুয়েন্দেকে ধারণ করতে সক্ষম, কিন্তু স্বাভাবিকভাবে এর ক্ষেত্র সঙ্গীত, নৃত্য আর মৌখিক কবিতায় খুব বেশি প্রসারিত। কারণ এক্ষেত্রে একজন ভাষ্যকারের জীবন্ত সত্তা নিয়োজিত থাকে— তাঁরা হচ্ছেন একটি কাঠামোর মতো— যা উদ্ভাসিত আর অন্তর্হিত হয়, এবং যা যাচাই করা হয় এক নির্দিষ্ট সময়ের প্রেক্ষিতে।

প্রায়ই রচয়িতার দুয়েন্দে ভাষ্যকারের ওপর এসে ভর করে। এমনকি যদি রচয়িতা কিংবা কবি মিথ্যাচারী হন তাতেও কিছু যায় আসে না, এক্ষেত্রে ভাষ্যকারের দুয়েন্দে মূল অংশের মতোই এক নতুন বিস্ময় সৃষ্টি করতে পারে। এলিওনোরা দিউসেরও এ-রকম এক দুয়েন্দে-আক্রান্ত ব্যাপার ছিল, তিনি তাঁর সমস্ত লব্ধ নিষ্ফলতা আন্তরিকতা দিয়ে সফলতায় ফিরিয়ে এনেছিলেন। কিংবা প্যাগানিনি, গ্যেটের মতে যিনি এ-অঞ্চলের প্রচলিত গানে অসম্ভব সুললিত সুরের অবতারণা করতে পারতেন ; অথবা পুয়েরতো দে সান্তা মারিয়ার সেই উজ্জ্বলতম মেয়েটি, তাকে এক সময় আমি ইতালির জঘন্য ‘ও মারি!’ গানটি এমন লয়, ফাঁক ও অর্থসহ গেয়ে গেয়ে নাচতে দেখেছিলাম, যা এই সস্তা গানটিকে রূপান্তরিত করেছিল এক নিখাদ সোনার টানটান সাপের আকারে। এটা সত্যি যে প্রত্যেক অবস্থায় একজন ভাষ্যকারের কাজ হল মূল অংশকে পুনর্বার সৃষ্টি করা : অভিব্যক্তির শরীরী শূন্যতাকে ভরিয়ে তোলে জীবিত রক্ত আর শিল্পিত প্রতিভা।

সমস্ত শিল্প এমনকি দেশগুলোও দুয়েন্দে, দেবদূত কিংবা কলাদেবীর ক্ষমতাশ্রিত। যেখানে জার্মানীর রয়েছে একটি ব্যতিক্রমী কলাদেবী এবং ইতালির একজন চিরস্থায়ী দেবদূত, সেক্ষেত্রে প্রাচীন সঙ্গীত আর নৃত্যের দেশ স্পেন— যে-জাতি মৃত্যুর, যে-জাতি মৃত্যুর কাছে উন্মোচিত— সব সময়ই দুয়েন্দের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে; দুয়েন্দে সেখানে লেবুর মতো নিংড়ায় প্রত্যুষকে।

প্রত্যেক দেশেই মৃত্যুর আছে চূড়ান্ত মুহূর্ত। এটি এসে পৌঁছে আর টেনে আনা হয় অন্ধদের। কিন্তু স্পেনে নয়। স্পেনে তারা উঠে আসে। বেশির ভাগ হিস্পানি মৃত্যুর দিন পর্যন্ত দেয়ালের মাঝখানে বাস করে সূর্যের মুখোমুখি তাদের নিয়ে আসার আগ পর্যন্ত। স্পেনের একজন মৃত ব্যক্তি অন্যান্য যে-কোনো দেশের মৃতের চেয়ে অনেক বেশি জীবিত— তার পার্শ্বমুখ কেটে যায় নাপিতের ধারালো ক্ষুরের মতো। মৃত্যুর কৌতূহল এবং এর নীরব অনুশীলন হিস্পানিদের কাছে বেশ পরিচিত। কুয়েভেদোর ‘করোটির স্বপ্ন’ থেকে ভালদেস লীলের ‘শটিত বিশপ’পর্যন্ত এবং সপ্তদশ শতাব্দীর মারবেল্লার সময় থেকে, যিনি মহাসড়কের ওপর সন্তান প্রসবের সময় মারা গিয়েছিলেন আর বলেছিলেন,

আমার জরায়ু থেকে রক্ত

ঢেকে দিল ঘোড়াকে এখন।

তোমার ঘোড়ার খুরগুলো

ঝলসে তোলে খনিজ আগুন…

 

সালামানকার সদ্য যুবক, যাঁকে হত্যা করেছিল একটি ষাঁড়, তিনি বলেছিলেন :

 

বন্ধুরা, আমি মরতে যাচ্ছি

এগিয়ে যাচ্ছি বাজে রাস্তায়।

ভেতরে আমার তিনটি রুমাল

এবং এইটি চতুর্থখানি…

 

এখানে আছে সোরার পুষ্পবলয়, যার ওপর জেগে ওঠে একজন লোকের পরিশীলিত মৃত্যু, যিনি এর অতি নিষ্ঠুরতার মধ্যেও অনুপ্রাণিত হন হেরেমিয়ার কাব্যে কিংবা সাইপ্রেসের সুরভিময় গীতিকবিতায়। তবু এটা সেই দেশ, যেখানে সবারই আছে মৃত্যুর চরম ধাতব স্বভাব। ছোরা আর গরুর গাড়ির চাকা, খুর আর মেষপালকের কাঁটাময় দাড়ি, অনাবৃত চাঁদ, মাছি, স্যাঁতসেতে আলমারি, ইতস্তত বিক্ষিপ্ত পাথর, ঝালরে আবৃত ধর্মীয় প্রতিকৃতি, কলিচুন, ঘড়িস্তম্ভ এবং ঘরের কার্নিশের বিক্ষত বহিঃরেখা, স্পেনে ঠিক এগুলোর মধ্যেই আছে মৃত্যুর অতিসূক্ষ্ম সবুজফলক, এও সচেতন মনে অনুভূত পরোক্ষ ইশারা ও স্বরগুলোর মতোই, যা আমাদের অন্তর্গত শূন্যে বয়ে যাওয়া স্মৃতিকে সজীব করে তোলে। হিস্পানি শিল্পের সঙ্গে তার মাটির যোগ কোনো আপতন নয়। এটি তেমন শিল্প, যা অরণ্য আর স্পর্শনীয় পাথরে ঘেরা ; প্লেবারিওর বিলাপ কিংবা ওস্তাদ জোসেফ মারিয়া দে ভালদিভিয়েলসোর নৃত্য বিচ্ছিন্ন উদাহরণ নয়; এটি কোনো দৈবী ঘটনা নয় যে সমগ্র ইউরোপীয় গাথা থেকে হিস্পানি এই প্রেমগান ভিন্ন পথে চলে এসেছে :

‘প্রণয়ী আমার হও যদি তুমি

দ্যাখো না কেন এ-মুখ?’

‘ছায়াকে তো আমি দিয়েছি সে-চোখ

তোমাকে দেখব যাতে।’

‘প্রণয়ী আমার হও যদি তুমি

খাও না কেন গো চুমু?’

‘পৃথিবীকে আমি দিয়েছি সে-ঠোঁট

চুমু খাব যাতে আমি।’

‘প্রণয়ী আমার হও যদি তুমি

জড়িয়ে নাও না কেন?’

‘কেন্নোকেঁচোতে আবৃত করেছি

জড়াব যে-বাহু দিয়ে।’

 

আদি হিস্পানি গীতিকবিতায় এ-গানটিকে দেখতে পাওয়াও অপ্রত্যাশিত নয় :

 

ফুলবাগানে মৃত্যু আমার,

গোলাপবনে,

খুন হব ঠিক আমি।

যাচ্ছি তখন, ও মামনি,

তুলতে কিছু গোলাপ,

মৃত্যু দেখি ফুলবাগানে

রয়েছে ওৎ পেতে।

যাচ্ছি তখন, ও মামনি,

ছিঁড়তে কিছু গোলাপ,

মৃত্যু দেখি গোলাপবনে

রয়েছে ওৎ পেতে।

ফুলবাগানে মৃত্যু আমার।

গোলাপবনে

খুন হব ঠিক আমি।

 

সুর্বারানের আঁকা চাঁদ হিমায়িত মাথাগুলো, এল গ্রেকোর উজ্জ্বল হলুদ আর মাখন হলুদ, এল শিগুয়েনথার গদ্য, গোইয়ার শিল্পকর্মের সমগ্রতা, এল এস্কোরিয়ালের গির্জার সমাধিচত্বর, আমাদের বহুবর্ণ ভাস্কর্যগুলো, ওসানার ডিউকদের ভূগর্ভ সমাধিকক্ষ, মেদিনা দে রিওসেকোর বেনভেন্তেসের প্রতিষ্ঠানসংলগ্ন প্রার্থনাঘরের মৃত্যুসমেত গিটার;— এর সবই হচ্ছে সেন্ট অ্যান্দ্রেস দে তেক্সিদোগামী তীর্থযাত্রীদের সংস্কৃতির প্রতিরূপ, যেখানে মিছিলের মধ্যে মৃতের জন্যে একটি জায়গা আছে; এর সবই হচ্ছে নভেম্বরের রাতে লণ্ঠনের আলোয় আস্তুরিয়ার মহিলাদের গাওয়া শোকগীতির প্রতিরূপ; সিবিলের মাহোর্কা আর তোলেদোর ক্যাথিড্রালের নৃত্যের প্রতিরূপ, তর্তোসার রহস্যময় ‘ইন রেকর্ত’-এর প্রতিরূপ; এবং অজস্র গুড ফ্রাইডে উৎসবের প্রতিরূপ, যা, ষাঁড়লড়াইয়ের সুসভ্য দর্শকদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করে হিস্পানি মৃত্যুর লোকনন্দিত বিজয়। পৃথিবীর সমস্ত দেশের মধ্যে কেবলমাত্র মেক্সিকোই এ-বিষয়ে সমকক্ষ হতে পারে স্পেনের।

যখনই কলাদেবী মৃত্যু সম্পর্কে সতর্ক হন, তখনই তিনি বন্ধ করে দেন তাঁর দরজা, কিংবা প্রাচীর তুলে দেন, কিংবা শোভাযাত্রা নিয়ে সমাধির দিকে এগিয়ে যান কিংবা মোমের তৈরি হাতে লেখেন সমাধিলিপি। এবং তিনি সঙ্গে সঙ্গে কোনো নিস্তব্ধতার মধ্যে তাঁর মালা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেন, যা কেঁপে কেঁপে ওঠে দুটি বায়ুস্রোতের মধ্যে। গীতিকবিতার ছেঁটে ফেলা খিলানের নিচে তিনি শোকার্ত হাতে জুড়ে দেন যথার্থ পুষ্পরাশি, যা পঞ্চদশ শতাব্দীতে এঁকেছিলেন ইতালীয়রা এবং লুক্রেশিয়াসের সক্ষম মোরগকে নিয়ে আসেন তার সন্দেহাতীত ছায়াকে ভয় দেখাতে।

মৃত্যু সম্পর্কে সতর্ক হলে দেবদূত ধীরে ধীরে বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকেন আর তরঙ্গায়িত হন হিম অশ্র“তে এবং আÍরতিতে ভোগেন শোকগাথা নিয়ে, যা আমরা কাঁপতে দেখেছি কীটস, ভিল্লাসান্দিনো, হেরেরা, বেকুয়ার কিংবা হুয়ান র‌্যামন হিমেনেথের হাতে।

অপর পক্ষে দুয়েন্দে দৃষ্টিগোচর হয় না, যদি না তা মৃত্যুর সম্ভাবনা দেখে, যদি তা না জানে যে এটি ঘন ঘন মৃত্যুর বাড়িতে যাতায়াত করবে, যদি তা নিশ্চিত না হয় যে এটি ওই শাখাপ্রশাখায় চলতে পারবে যা আমরা সবাই বয়ে বেড়াই, যা কোনো আনন্দ নয় কিংবা কখনো ভোগ করবে না সান্ত্বনা।

কুয়োর কিনারে সৃষ্টিকারীর সঙ্গে ভাবনায়, শব্দে কিংবা ইঙ্গিতের মাধ্যমে দুয়েন্দে সরাসরি সংঘর্ষে আসতে ভালোবাসে। দেবদূত এবং কলাদেবী যখন বেহালা বা পরিমিত তালে পরিতৃপ্ত, দুয়েন্দে তখন বিক্ষত করে, এবং এই ক্ষতের চিকিৎসায় যা অন্তর্হিত হয় না, তা-ই বিশালতা, তা-ই মানুষের কর্মের মৌলিকতা।

কবিতার মায়াবী গুণ তার ভেতরে সব সময় দুয়েন্দের ভর থাকায়। তাই অনেকেই মনে করেন এটি অন্ধকার জল দিয়ে দীক্ষিত। কারণ দুয়েন্দের সহযোগে একে ভালোবাসা এবং হৃদয়ঙ্গম করা সহজ, আর নিশ্চয়ই যে- কোনো লোকই ভালোবাসা ও হৃদয়ঙ্গমে সক্ষম। এবং এই প্রকাশের যন্ত্রণা ও প্রকাশের সংযোগ কবিতায় ঘটে দৈবাৎ, আর তা-ই হচ্ছে মৃত্যুর বিরুদ্ধে এক সংগ্রামের চরিত্র।

সেই গোড়ার দিকের ফ্ল্যামেঙ্কা— এবং দুয়েন্দে-আক্রান্ত সেন্ট তেরেসার প্রসঙ্গ স্মরণ করুন, চমৎকারভাবে তিনবার হাত বুলিয়ে ফ্ল্যামেঙ্কার মাধ্যমে একটি ক্ষ্যাপা ষাঁড়কে দমন করার জন্য নয়, যা তিনি করতেন; কিংবা হুয়ান দে লা মিসেরিয়ার সামনে তাঁর সুন্দর দৃষ্টির অহংবোধের জন্য নয়, নয় পাপাল নানসিওকে চাপড় মারার জন্য ; বরং সেই স্বল্পসংখ্যক জীবসত্তার একজন হয়ে ওঠার জন্য, যাদের দুয়েন্দে (তাদের দেবদূত নয়, কেননা দেবদূত কখনো আক্রান্ত করেন না) তাঁকে একটা ছোট্টো বর্শায় এ-ফোঁড় ও-ফোঁড় করে দেয়, আর এর অন্তিম গোপনীয়তা চুরির জন্য তাঁর মৃত্যু-কামনা করে— এই সুন্দর সেতু পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে সেই অন্তস্থলকে সংযুক্ত করে যা কালমুক্ত ভালোবাসার জীবন্ত শরীর, জীবন্ত মেঘ, জীবন্ত সমুদ্র নির্মাণ করে।

তিনি ছিলেন দুয়েন্দের মহান বলি, অস্ট্রেলিয়ার ফিলিপের তুলনায় ধর্মীয় কলাদেবী ও দেবদূতের প্রতি লালায়িত এই লোভাতুরা এল এস্কোরিয়ালের প্রাসাদে নিজেকে আবিষ্কার করেছিলেন নীরস উৎসাহের দুয়েন্দের হাতে বন্দিনী অবস্থায়, যেখানে স্বপ্নের ওপর সীমারেখা টানে জ্যামিতি, এবং যেখানে মহান রাজার শাশ্বত শাস্তির জন্য দুয়েন্দে পরিধান করে এক কলাদেবীর মুখোশ।

আমরা বলেছি যে দুয়েন্দে বস্তুর ধারালো প্রান্ত আর ক্ষতের মতো, এবং আরো বলেছি যে রীতি যেখানে নিজেকে দীর্ঘস্থায়ী মহত্ত্বের বদলে দৃশ্যগত অভিব্যক্তির মধ্যে মজে যায়, তাকে নিয়ে আসা হয় সেখানে।

স্পেনে (যেমন প্রাচ্যে, যেখানে নৃত্য হচ্ছে ধর্মীয় অভিব্যক্তি) দুয়েন্দের অসীম সম্ভাবনা রয়েছে কাদিজের কিশোরী নর্তকীদের শরীরে, মার্শাল যার প্রশংসা করেছেন, হুভেনাল প্রশংসিত গায়কদের ফুসফুসে এবং ষাঁড়লড়াইয়ের সমগ্র রীতিতে ; এগুলো ঠিক এক ধর্মীয় নাটক, যেমন তা রয়েছে ম্যাসেও, যেখানে আছে স্বাভাবিক ভক্তি, আর ঈশ্বর যেখানে উৎসর্গিত।

এটি যেন চিরায়ত বিশ্বের সমগ্র দুয়েন্দে যা এই যথার্থ দৃশ্যের একই বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত, সংস্কৃতির প্রতীক এবং একজন লোকের মহান সংবেদন— যিনি উদ্ঘাটন করেন মানুষের সুন্দরতম ক্রোধ, তার সুন্দরতম বিষণ্ণতা এবং যন্ত্রণা। স্পেনের নাচ কিংবা ষাঁড়লড়াইয়ে কারো কোনো আনন্দ নেই; কেননা জ্যান্ত কাঠামোয় এই নাটকের মাধ্যমে দুয়েন্দে চায় প্রত্যেককে যন্ত্রণা দিতে এবং চারপাশের বাস্তবতা থেকে তৈরি করে পালানোর পথ।

দুয়েন্দে একজন নর্তকীর শরীরে বালির ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের মতো কাজ করে। এর মায়াবী শক্তি দিয়ে এটি যে-কোনো মেয়েকে চাঁদে-পাওয়া তরুণীতে রূপান্তরিত করে কিংবা শহরের জরাজীর্ণ ভিখিরিকে সদ্য যুবতীর রক্তিম আভায় পরিপূর্ণ করতে পারে কিংবা রাতে কোনো সৈকতের দীর্ঘ চুলের বেণীগুচ্ছের গন্ধ বয়ে আনে এবং প্রত্যেক মুহূর্তে এটি সশস্ত্র যুদ্ধে সক্রিয় থাকে, যা সৃষ্টি করে প্রতিটি সময়ের নৃত্য।

কিন্তু এটি হচ্ছে যোগ্যতার দৃঢ়তা ; দুয়েন্দে কখনো তার পুনরাবৃত্তি করতে পারে না, সমুদ্রের গড়নগুলো যেমন ঝড়ের ভেতরে পুনর্বিন্যস্ত করে না নিজেদের।

ষাঁড়লড়াইয়ে দুয়েন্দে প্রয়োগ করে তার গভীর প্রভাব বিস্তারী চরিত্র, কেননা একদিকে একে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে হয়, যা তার ধ্বংস নিয়ে আসতে পারে, এবং অন্যদিকে তাকে লড়তে হয় দৃশ্যের মৌলিক ভিত্তির পরিমাপক জ্যামিতির সঙ্গে।

ষাঁড়ের আছে নিজ কক্ষপথ আর ষাঁড়যোদ্ধার তাঁর নিজের ; এবং দুই কক্ষপথের মাঝখানে থাকে বিপদের এক কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে শুয়ে থাকে ভয়ঙ্কর খেলার এক গিরিশৃঙ্গ।

কলাদেবীর মুলেতা এবং দেবদূতের বান্দেরিল্লাস নিয়ে ভালো ষাঁড়যোদ্ধা হওয়া সম্ভব, কিন্তু ষাঁড় যখন আঘাতের হাত থেকে মুক্ত, কিংবা যখন ঘনিয়ে আসে হত্যার চূড়ান্ত মুহূর্ত, তখন প্রয়োজন হয় রঙিন কাপড়ের কৌশলে দুয়েন্দের শিল্পিত সত্যের নখের আঘাত।

ষাঁড়যোদ্ধা তাঁর হঠকারিতা দিয়ে দর্শকদের চমকিত করলেই ষাঁড়লড়াই হয় না, তিনি তাঁর জীবন নিয়ে অবাস্তব মাটির ওপর খেলেন, যা যে কেউ খেলতে পারে; অন্যদিকে যে-ষাঁড়যোদ্ধা দুয়েন্দে-আক্রান্ত তিনি পীথাগোরীয় সঙ্গীতের এক পাঠ দিয়ে যান এবং তখন আমরা বিস্মৃত হয়ে পড়ি যে তিনি প্রতিনিয়ত তাঁর হৃদপিণ্ডকে ছুঁড়ে দিচ্ছেন শিঙের চূড়ায়।

লাগার্তিহো তাঁর রোমান দুয়েন্দে দিয়ে, হোসেলিতো তাঁর ইহুদি দুয়েন্দে দিয়ে, বেলমোন্তে তাঁর বারোক দুয়েন্দে দিয়ে, এবং ক্যাগানশো তাঁর জিপসি দুয়েন্দে দিয়ে এরেনার গোধূলি থেকে কবি, চিত্রকর এবং শিল্পীদের হিস্পানি ঐতিহ্যের চারটি মহান পথ দেখিয়েছেন।

স্পেন হচ্ছে একমাত্র দেশ যেখানে মৃত্যু একটি স্বাভাবিক দৃশ্য, যেখানে প্রত্যেক বসন্তের আগমনে ভেরীর দীর্ঘ নিনাদে বয়ে যায় মৃত্যু; এবং হিস্পানি শিল্প সব সময় চতুর দুয়েন্দে দিয়ে চালিত, যা তাকে দিয়েছে এর তীক্ষ চরিত্র এবং অনুসন্ধিৎসু গুণাগুণ।

ভাস্কর্যে দুয়েন্দে এই প্রথম কম্পোস্তেলার সাধুশ্রেষ্ঠ মাতেওর চিবুক ভরিয়ে তুলল লাল রক্তে, একইভাবে তা বিলাপ জাগিয়ে দিল সেন্ট জন অব দ্য ক্রসের, আর ভস্মীভূত করে দিল লোপে দে ভেগার ধর্মীয় সনেটের নগ্ন বনদেবীদের।

দুয়েন্দে শাহাগুনের মিনার উত্তোলিত করেছিল, আর কালতাইউদ কিংবা তেরুয়েলের মধ্যে ভূমিকা নিয়েছিল উষ্ণ ইটের, একইভাবে দুয়েন্দে এল গ্রেকোর মেঘমালাকে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে আর এক পদাঘাতে কুয়েভেদোর ভূ-সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ককে পাঠিয়ে দিয়েছে ঘূর্ণাবর্তে, এবং গোইয়ার দৃষ্টি ঝলসে দিয়েছে আগুনে।

যখন বৃষ্টি নামে, তখন তা গোপনে দুয়েন্দে-আক্রান্ত ভেলাস্কেথকে নিয়ে আসে তাঁর অধিকর্তার ধূসরতার অন্তরালে, এটি তুষারের মধ্যে হুয়ান দে হেরেরাকে১০ নগ্ন বের করে আনে এটা প্রমাণ করতে যে শীতে কারো মৃত্যু হয় না; যখন দুয়েন্দে আগুন ধরায়, বেরুগুয়েতেকে তখন তা টেনে আনে আগুনের শিখার মধ্যে এবং ভাস্কর্যের নতুন আবিষ্কারের জন্য তাঁকে প্রস্তুত করে।

গঙ্গোরার কলাদেবী এবং গার্সিলাসের দেবদূতকে লরেলের মালা পরিত্যাগ করতে হয়, যখন আবির্ভূত হয় সেন্ট জন অব দ্য ক্রসের দুয়েন্দে, যখন—

রক্তাক্ত হরিণ আসে

পাহাড়ের মাথার ওপর।

গনসালো দে বের্সিওর কলাদেবী এবং হিতার যাজকের দেবদূত হর্হে মানরিককে সফলতার কাছে টেনে আনে, যখন তিনি মারাÍক আহত হয়ে বেলমোন্তে দুর্গের তোরণে হাজির হন। গ্রেগোরিও হার্নান্দেথের কলাদেবী এবং হোসে দে মোরার দেবদূতকে মেনার রক্তকান্নার পর অনুমতি প্রত্যাহার করে দুয়েন্দের সফলতাকে গ্রহণ করতে হয়। একইভাবে কাতালোনিয়ার বিষণ্ণ কলাদেবী এবং গ্যালিসিয়ার বৃষ্টিসিক্ত দেবদূতকে কাস্তিলের দুয়েন্দের দিকে তাকাতে হয় প্রেমের বিস্ময় নিয়ে, তাই উষ্ণ রুটি আর শান্ত গোচারণভূমি থেকে শুষ্ক পৃথিবী এবং হাওয়ায় খসে যাওয়া আকাশের এক দিকযন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করে।

কুয়েভেদোর দুয়েন্দে এবং সেরভান্তেসের দুয়েন্দে, একজন উজ্জ্বল সবুজ আনেমোনে ফুল দিয়ে এবং অন্যজন রুইদেরার কঠিন আনেমোনে ফুল দিয়ে হিস্পানি দুয়েন্দের বেদীকে সুশোভিত করেছে।

এটা পরিষ্কার যে প্রত্যেক শিল্পের বিভিন্ন স্বভাবের এবং গড়নের দুয়েন্দে রয়েছে, কিন্তু তাদের মূলগুলো একই বিন্দুতে প্রোথিত, শেষ পর্যন্ত, ম্যানুয়েল তোরেসের ‘অন্ধকার ধ্বনিরা’যেখান থেকে বের করে আনে কাঠ, ধ্বনি, ক্যানভাস আর শব্দের নিয়ন্ত্রণ অযোগ্য এবং কম্পিত সাধারণ ভিত্তি।

‘অন্ধকার ধ্বনিমালার’অন্তরাল থেকে শুভ্র আন্তরিকতায় আমরা আবিষ্কার করি আগ্নেয়গিরি, পিঁপড়ে, ফুরফুরে হাওয়া আর বিশাল রাত্রি কোমরে জড়িয়ে ধরা ছায়াপথ।

ভদ্রমহিলা এবং ভদ্রমহোদয়গণ: আমি তিনটি খিলান উত্থাপন করেছি এবং এলোমেলো হাতে এদের মধ্যে স্থাপন করেছি কলাদেবী, দেবদূত আর দুয়েন্দেকে। কলাদেবী এখন নিঃস্তব্ধ; তিনি গ্রহণ করতে পারেন রোমানদের আঁটসাঁট ভাঁজ করা পোশাক, পম্পেইয়ের গাভীদের নির্নিমেষ চোখগুলো, অথবা চার মুখঅলা বিশাল নাক— যেটি তাঁর বন্ধু পিকাসো তাঁকে দিয়েছিলেন। দেবদূত জাগ্রত হতে পারেন মেশিনার আন্তোনেল্লার আঁকা বেণীগুচ্ছের মধ্যে, লিপ্পির পোশাকে কিংবা মাসোলিনো আর রুশোর বেহালায়।

দুয়েন্দে— কোথায় দুয়েন্দে? শূন্য খিলানের ভেতর দিয়ে বয়ে যায় এক মানসিক হাওয়া, মৃতের মাথার মধ্যে দিয়েও অবিরল তা প্রবাহিত হয় নতুন দৃশ্য আর সন্দেহাতীত উচ্চারণের খোঁজে; শিশুর লালা, বিচূর্ণ ঘাস আর অশুভ নেকাব শুঁকতে শুঁকতে এ-হাওয়া ঘোষণা করে অভিনব সৃষ্টিকর্মের ধ্রুব দীক্ষার কথা।

 

 

বুয়েনোস এয়ারস ও হাভানায় লোরকাপ্রদত্ত অভিভাষণের জে. এল. গিলিকৃত ইংরেজি অনুবাদ থেকে পুনরানুবাদিত।

 

১.    দেবলা : আন্দালুশীয় ‘কান্তে হোন্দো’র (গভীর গান) একটি রূপ।

২.    সিলভেরিও ফ্রাঙ্কোনেত্তিকে ইঙ্গিত করা হচ্ছে। আন্দালুশিয়াতে এই ইতালীয় গায়ক ‘কান্তে হোন্দো’র ব্যাপক চর্চা করেছিলেন। সেগুইরিয়া তারই এক উচ্চতর রূপ।

৩.    হাসিন্ত ভের্দাগুয়ের : কাতালীয় এই কবি ‘কাতালান রেনেজেনকা’বা ঊনবিংশ শতকের সাহিত্যিক পুনর্জাগরণের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব। অসংখ্য গীতিকবিতা এবং ‘লাতলান্তিদা’ও ‘কানিগো’এ-দুটো মহাকাব্যের স্রষ্টা, বর্তমান প্রেক্ষিতে তাঁকে ইঙ্গিত করা হচ্ছে পিরেনীয় উদাহরণ হিশেবে।

৪.    হর্হে মানরিক: পঞ্চদশ শতকের হিস্পানি কবি, পিতার মৃত্যু নিয়ে লেখা ‘কপলাস’-এর জন্য তিনি বিখ্যাত।

৫.    এল গাল্লো: খ্যাতনামা ষাঁড়যোদ্ধা।

৬.    লোরকা এখানে ইঙ্গিত করছেন পেদ্রো দে রোহাসের গ্রানাদার বাগানের স্মৃতিবাহী ‘পারাইসো সেরাদো পারা মাচোস, হার্দিনেস আবিয়ের্তোস তোদোস’বইটির দিকে।

৭.    সেন্ট জন ক্লাইমেকাস: ষোড়শ শতকের ঋষি, ‘স্কালা স্পিরিতুয়ালিস’-এর রচয়িতা।

৮.   মুলেতা: লাল কাপড় জড়ানো কাঠের হাতলঅলা এক ধরনের বর্শা।

৯.    বান্দেরিল্লাস: রঙিন কাপড় বা কাগজ জড়ানো এক ধরনের সরু বর্শা, ষাঁড়কে উত্তেজিত করার জন্য এটি তার দুদিকে স্থাপন করা হয়।

১০.   হুয়ান দে হেরেরা : এল এস্কোরিয়ালের স্থপতি।