Home নির্বাচিত লেখা দ্রষ্টব্য, ২০০৮ । কামরুল হুদা পথিক ।।সম্পাদকীয়

দ্রষ্টব্য, ২০০৮ । কামরুল হুদা পথিক ।।সম্পাদকীয়

দ্রষ্টব্য, ২০০৮ । কামরুল হুদা পথিক ।।সম্পাদকীয়
0
0

বই : স্বপ্নের সারসেরা [ছোটকাগজ আন্দোলনের ২৫ বছর] / ২০১০, উলুখড়।।

 

ওরা যাবে আকাশ অবধি তবে আমরা তো জানিই

 যে আকাশটা কতোখানি উঁচু হতে পারে

                                –  শামীম কবীর

মধ্যবিত্ত মধ্যমানের মধ্যমনস্করাই শিল্প-সাহিত্যের মধ্যমণি আজ… আফ্রিকান মাগুরের সাথে পালা দিয়ে বাড়ছে এদের বিস্তার…  পত্র-পত্রিকা-মিডিয়া-ম্যাগাজিনের সর্বত্রই এদের হাতুড়ে দাপট… গড়গ্রস্ত এসব সাহিত্যকেরানিরা আজকের সাহিত্যবিপণীর হ্যাঙারে হ্যাঙারে ভূতগ্রস্ত টি-শার্ট হয়ে ঝুলে থাকে দুমুঠো খুঁদকুড়োর আশায়… আর তাই নিয়মিত চলছে থান ইট সাইজের ‘ঈদ সংখ্যা’র অত্যাচার কিম্বা বইমেলায় সাহিত্যের শ্লীলতাহানিকর নানা পুস্তক…  লিটল ম্যাগাজিন বলতে তাই গড়পড়তা চালু ধারণা হলো কিছু ইচ্ছুক সাহিত্যকেরানিদের উদ্দেশ্যমূলক শাহবাগবাজি… চাকরি অথবা কবিখ্যাতির আশায় ঘুরতে থাকা এসব গড়মনস্ক তরুণেরা (এসব গড়মনস্ক তরুণেরা নিজেরা নিজেদেরকে কবি-সাহিত্যিক বলে মনে করেন) স্বপ্রতিভায় প্রকাশিত হওয়া কিছু সংকলনকেই লিটল ম্যাগাজিন বলে মনে করেন…  এসব লিটল ম্যাগাজিন ও লিটল ম্যাগাজিনবাজদের মেধাহীনতা এবং কল্লা ও নিতম্বের সংযোগ রক্ষাকারী দণ্ডটির উপস্থিতিহীনতার কারণে তাদের চিন্তা ভাবনা ও উপস্থাপনার মধ্যেও পাওয়া যায় হাস্যরসের নানা উপাদান…  তালেবান যোদ্ধাদের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা আবিষ্কার করে পুলকিত হওয়ার পাশাপাশি এ সমস্ত গড়গ্রস্তগণ বড়/ মিডি ম্যাগাজিনের ‘ভালো’/‘লড়িয়ে’ লেখকদের মধ্যেই আবিষ্কার করেন প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার নানা উপাদান…মিডি/ বড় কাগজের ‘চিন্তাশীল’  লেখকদের মধ্যেই তারা খুঁজে পান নতুন সাহিত্য সৃষ্টির রসদ… ‘লোক’ দেখানো নানা পদের ভুড়িঅলা মিডি ম্যাগাজিনগুলোকে (মিডি ম্যাগাজিনগুলো নিজেরা নিজেদেরকে লিটল ম্যাগাজিন বলে মনে করেন) লিটল ম্যাগাজিন ভেবে জড়িয়ে ধরে আহ্লাদিত হওয়া যে শুধুমাত্র মফস্বলীয় মানসিকতার প্রকাশ, তা নয়—ক্ষেত্রবিশেষে এমন চিন্তার মধ্যে নিহিত থাকে এক ধরনের পিচ্ছিল সুবিধাবাদ… ইত্যাদি ইত্যাদি বহু বিচিত্র প্রেক্ষাপট ও করুণ খরাবস্থা দ্রষ্টব্যের ক্রমপ্রকাশকে অনিবার্য করে তুলেছে…

যে গল্পের শেষ নেই

দুনিয়ার কোনো কিছুই সরলরৈখিক নয়…  এক মাত্রা দিয়ে তেমন কিছুই আসলে ব্যাখ্যাযোগ্য নয়…  প্রকৃতির এই সরলসিধে ব্যাপারটা বুঝতে গেলে যে পোস্টমডার্ন কি উত্তরাধুনিক খণ্ডবাদী পুকুরগুলোতে ডুব দিয়ে আসতেই হবে-তা-ও নয়… সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান জারি করেও এসব টের পাওয়া যায়…  এমনকি খোলা মাঠে মুতলে সে মুতও সামনে সরাসরি এগোয় না… খানিকটা এঁকেবেঁকে যায়… আর তাই মধ্যযুগ মানে শুধু মধ্যযুগ না… শুধু অন্ধকার না… শুধু মানুষ পুড়িয়ে মারা না বা শুধু চার্চের দাপট না বা জ্ঞানবিজ্ঞানশিল্পসাহিত্যকে কবরস্থ করার প্রবলব্যাপক আয়োজন না… মধ্যযুগেও থাকেন দান্তে… মধ্যযুগেও থাকে পাল্টা নানা আয়োজন আর কাউন্টার অ্যাক্টিভিজমের নানান বীরগাঁথা… আর এভাবেই মানবসভ্যতার সব ইতিবাচক অর্জন ট্রান্সমিটেড হয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে… কাল থেকে কালান্তরে… তাই… আজকের দিন কেবল জলপাই রঙের অন্ধকারের নয়… আজকের দিন কেবল সাম্রাজ্যবাদ কি মৌলবাদ কি এনজিওতান্ত্রিক সুশীল উন্নয়নবাদের নয়… আজকের দিন কেবল টকশো উপদ্রুত প্রাইভেট চ্যানেল কি দৈনিকের তারকাখচিত কবি সাহিত্যিকদের নয়… এমনকি আজকের দিন কেবল শাহবাগবাজ মিডি-ম্যাগাজিনজীবীদের লক্ষ্যহীন—অক্ষম—লালা ঝরানো তৎপরতাও নয়… আজকের দিনেও আছে তেভাগা আন্দোলনের দাবানল বুকে লালন করা কানসাট কি ফুলবাড়িয়ার বীর কৃষকদের হার না-মানা লড়াকু অভ্যুত্থান… আজকের দিনেও আছে গার্মেন্টস শ্রমিকদের জানবাজি রাখা লাগাতার যুদ্ধ… আজকের দিনেও আছে জলপাই রঙা রাষ্ট্রযন্ত্রের উদ্যত ফণা মটকে দেয়া ছাত্র-শিক্ষকদের নির্ভীক লড়াই… আজকের দিনেও আছে জঙ্গীবাদ-মৌলবাদ রুখে দেয়ার এক নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম… আজকের দিনেও আছে দ্রষ্টব্য অনিন্দ্য চালচিত্র শিরদাঁড়া প্রতিশিল্প দুয়েন্দে কফিন টেক্সট এবং টানটান প্রস্তুতিরত আরো অনেক অনাগত যোদ্ধা ও যুদ্ধের আলামত…

সম্পাদক: কামরুল হুদা পথিক / দ্রষ্টব্য, সংখ্যা ৮, ফেব্রুয়ারি ২০০৮।।