Home নির্বাচিত লেখা নিঃসঙ্গতায় বুটের আওয়াজ । রবিউল ইসলাম ।। গল্প

নিঃসঙ্গতায় বুটের আওয়াজ । রবিউল ইসলাম ।। গল্প

নিঃসঙ্গতায় বুটের আওয়াজ  ।  রবিউল ইসলাম ।। গল্প
0
0

বই : তথাগত কোথায় থাকেন – রবিউল ইসলাম / গল্প / ২০১৭, উলুখড়।।

এক.

‘কার্তিকের মিঠে রোদ’- কথাটা কেমন পুতুপুতু পাড়ার মেয়েপটানো সস্তা পদ্যের মতো শোনালেও হঠাৎ এ কথাটাই তার মনে পড়ে। কোনো কারণ ছাড়াই তানভীরের হাসি পায়। একলা বিছানায় শুয়ে শুয়ে ১০৩ ডিগ্রি জ্বরের ঘোরে অসম্ভব রকম ভালোলাগা নিয়ে তানভীর জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে- যেখানে মিঠে রোদ হালকা দুলকিচালে নড়তে থাকা ঘন সবুজের উপর বালির আস্তরপড়া নারকেলের লম্বা চিরল পাতায় পড়ে পিছলে যেতে থাকে আর তার উপর বিরল একটি ফিঙে হয়তো তারই মতো একা কিন্তু চকিতে একবার কি দুইবার ডেকে ওঠে, সেইসঙ্গে চিরিক চিরিক লেজ নাড়তে থাকে। তানভীর গভীর মনোযোগে কিংবা অমনোযোগে সেই দৃশ্য দেখে নিয়ে জ্বরতপ্ত উন্মনা চোখে নারকেলপাতার ফাঁক দিয়ে কিছুদূরের নিঃসঙ্গ উলম্ব দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদের মিনারটি দেখে। লম্বা মিনারের মাথায় গম্বুজটির মধ্যে তিন দিকে তিনটি মাইকের চোঙা বসানো। একেবারে শীর্ষে বজ্ররোধক ত্রিশূলের মতো লোহার ফলা। মিনারটি দেখতে দেখতে, আগাগোড়া চোখ বোলাতে বোলাতে তানভীর শুনতে পায় প্রতিদিনকার ভাঙা শ্লেষ্মাজড়ানো বৃদ্ধ কণ্ঠের ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি, যা আদৌ তার কাছে কোনো অর্থ বহন করে কি-না সে ভাবনায় না গিয়েই হয়তো জ্বরের ঘোরের মধ্যেই সে শুনতে পায় মসজিদের মাইক থেকে ভেসে আসা ধ্বনি-

একটি শোক সংবাদ…! মিরপুর একনম্বর সেক্টরের… নিবাসী… তালুকদার ফরিদউদ্দিনের বাবা… বিশিষ্ট সমাজ… তালুকদার মুসলিম উদ্দিন হৃদরোগে… ইন্নলিল্লাহে…! মরহুমের নামাজে জানাজা… সকল মুসল্লি…!

১০৩ ডিগ্রি জ্বরের ঘোরেই হয়তো কিছুক্ষণ পর কিংবা একদিন কি দুইদিন পর সে শুনতে পায়-

একটি নিখোঁজ সংবাদ! ১৪ বছরের… কাজের মেয়ে… হারাইয়া…! তার পরনে লাল রংয়ের ফ্রক…!

না কি অন্য কোনো পোশাকের কথা বলে তা বোঝা যায় না কারণ তখন মাইকটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিকট জোরে শব্দ করে উঠে। ফের সে শুনতে পায়- যদি কোনো সহৃদয়বান…

প্রতিদনকার হৃদরোগ, নিখোঁজ সংবাদ, সমাজসেবক, সুরা-কেরাত আর দরুদ শরীফের শব্দ জটপাকিয়ে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলে তানভীর দেখে-  চকিতে ফিঙে পাখিটি কী মনে করে যেন উড়ে যায়। তখন তার মধ্যে আবারো নিঃসঙ্গতাবোধ ফিরে আসে। ভরদুপুরের রাস্তার কোলাহল-হাকডাক-চিৎকার-গাড়ির শব্দ-খিস্তিখেউর-রিকশার টুনঠুন যূথবদ্ধ দূরাগত সংগীতের আবহের মতো জ্বরের ঘোরের সঙ্গে মিলেমিশে গেলে তেষ্টা পায় তানভীরের। সে পাশের মগ তুলে ঢকঢক করে পানি খায়। তার কণ্ঠ থেকে হাহ্-সূচক ধ্বনি নির্গত হলে সেটা কি তার তৃষ্ণা মেটানোর পরিতৃপ্তির ধ্বনি; না কি তার জ্বরতপ্ত নিঃসঙ্গতাবোধের আর্ত কোমলগান্ধার স্বরের হাহাকার- তা বোঝার কোনো অবকাশ না দিয়েই তানভীর ভাবে-  আজ কি একজন মানুষ মারা গেছে? আজ কি একটি ১৪ বছর বয়সী কাজের মেয়ে নিখোঁজ হয়েছে? তখন মৃত্যু ও নিখোঁজ হওয়ার মধ্যে অথবা হারানো ও মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য বা মিল খুঁজতে গিয়ে ১০৩ ডিগ্রি জ্বরে ঘোরে থাকা নিঃসঙ্গ যুবক তানভীর ভাবে-  মৃত্যু মানে কি চিরতরে হারিয়ে যাওয়া? তাহলে স্মৃতিতে আমরা তাকে ধারণ করি কেন? শুধু কি হারানো বস্তুই আমরা খুঁজে ফিরি? মৃতদেরও কি আমরা চেতনে-অবচেতনে খুঁজে ফিরি না? তখন তার মনে হয়, ফিঙেটি এভাবে উড়ে গেল কেন? তালুকদার মুসলিম উদ্দিনের হৃদপিণ্ড আজ বন্ধ হল কেন? কিংবা ১৪ বছর বয়সী কাজের মেয়েটি তার ১০৩ ডিগ্রি জ্বরের ঘোরের মধ্যে হারিয়ে গেল কেন? এ নিয়ে ক্রমশ সে একটি গোলকধাঁধায় আটকে যায় কি যায় না নিঃসংশয় হওয়ার কোনো অবকাশ পায় না তানভীর। কারণ অনেকগুলো দৃশ্য, ঘটনাপঞ্জি পূর্বাপর কোনো সামঞ্জস্য না রেখে কিংবা আপাত অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হলেও কোথাও অলক্ষে কোনো গভীর পারম্পর্য রেখে অতিকায় এক্সপ্রেস ট্রেনের মতো তার মস্তিষ্কে হাজির হতে থাকে একের পর এক ফ্রেমবন্দি হয়ে। তবে এখন সেসব ঘটনার কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়া নিয়ে তানভীরের মাঝে কিছুটা ইতস্তত ভাব থাকলেও সে একেবারে খেই না হারিয়ে এক ধরনের খেলায় মেতে ওঠে। খেলাটি যদি হয় সাপলুডু তবে তো কথাই থাকে না কারণ-  মৃত্যু মানেই হারিয়ে যাওয়া নয়, সে জানে। কোনো এক তালুকদার মুসলিম উদ্দিন মারা গেছেন; ১৪ বছর বয়সী লাল ফ্রকপরা একটি কাজের মেয়ে হারিয়ে গেছে তার মানে এই নয় যে, তাদের আর কেউ খুঁজবে না। তখন সে ভাবে একা একা সাপলুডু খেলার চেয়ে নিদেনপক্ষে একজন প্রতিদ্বন্দ্বী থাকলে মন্দ হয় না। আর যে কিনা নিখোঁজ হয়েছে সেই ১৪ বছরের মেয়েটি, যার পরনে লাল রংয়ের ফ্রক সে যদি প্রতিদ্বন্দ্বী হয় তাহলে অন্তত একটি নিখোঁজ কাজের মেয়ের সন্ধান পাওয়া যাবে। তখন সে দৃশ্যপরম্পরা সাজিয়ে নিয়ে সেই লাল ফ্রকপরা মেয়েটিকে- মাইকে যার নাম ঘোষণা করা হয়েছে জান্নাতুন-  তাকে নিয়ে সাপলুডু খেলায় মগ্ন হয়ে পড়ে।

যদিও সত্যিই মগ্ন হয়ে পড়ে কি না এ নিয়ে সে নিজেই যথেষ্ট সন্দিহান। তবে এটা নিশ্চিত যে সে সাপলুডুই খেলে। কারণ সাপলুডু খেলায় একশটি ঘরের সবগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট স্বচ্ছ মনে হয় তানভীরের। আর যেহেতু ঘরগুলোর মধ্যে বিস্তৃত লম্বমান আয়েশি ভঙ্গিতে সেইসব অজগর ও গোখরাগুলো শুয়ে থাকে আর আড়মোড়া ভাঙে ফলে এ নিয়ে আর কোনো সংশয়ের অবকাশ তার কাছে অবান্তর মনে হয়।

কিন্তু সাপলুডু খেলতে গেলে তানভীর বারবার অনেকগুলো বুটের শব্দ শুনতে পায়। তার সামনে ভেসে ওঠে সেই দৃশ্য, একা একা ভোররাতের জানালায় দাঁড়িয়ে থেকে অন্ধকারের হালকা জন্ডিস রঙয়ের আলোয় যা দেখে জ্বরের ঘোরে পড়েছিল সে। অন্ধকারের মধ্যে কালো ছায়াগুলোকে আরো চকচকে কালো মনে হলে সে দেখেছিল কিংবা শুনেছিল দ্রুত ধাবমান বুটের শব্দ, গুলির শব্দ, মৃত্যুর মর্মন্তুদ আর্তনাদ। যা দেখে মূর্চ্ছা গেলে নিঃসঙ্গ যুবক তানভীরের জ্বর ১০৪ ডিগ্রিতে ঠেকেছিল, যা শুনে প্রতি রাতে বিষণ্ন নিনাদ করতে থাকা মিরপুর চিড়িয়াখানার নিঃসঙ্গ সিংহী নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিল আর বাঘিনীর গর্জন থেমে গিয়েছিল।

তখন ১০৩ ডিগ্রি জ্বরে আক্রান্ত ঘোরগ্রস্ত যুবক তানভীর ১৪ বছর বয়সী লাল ফ্রকপরা নিখোঁজ মেয়েটির সঙ্গে সাপলুডু খেলা শুরু করে।

প্রথমে মেয়েটিই দান ফেলে-  তিন!

তারপর সে-  ছয়!

তারপর মেয়েটি-  পাঁচ!

সে-  তিন!

মেয়েটি-  দুই!

সে-  চার!

মেয়েটি-  তিন!

ততক্ষণে মেয়েটি চঞ্চল হয়ে ওঠে। টানা টানা চোখ তুলে তাকায়। হাসে। তারপর ভালোমতো লুডুর গুটি নেড়েচেড়ে বোর্ডে ছুড়ে দেয়।

আবারো-  তিন!

সে-  চার!

মেয়েটি এবার-  পাঁচ!

তখন হয়তো অজগরগুলো মোচড় দিয়ে ওঠে। আর গোখরাগুলো ফোঁস করে ফণা তোলে চেরা জিভ বের করে আর মইগুলো দিয়ে চকচকে কালো বুটগুলো আওয়াজ তুলে উপরে উঠতে থাকে। কালোবুটের শব্দ লুডুর প্রতিটি ঘরে দাপিয়ে বেড়াতে থাকলে তীব্র শীতে কাঁপতে থাকে নিঃসঙ্গ যুবক তানভীর। তখন মেয়েটি বলে, ‘ডরে কাঁপতেছেন, না জ্বরে কাঁপতেছেন?’ তখন সে আবার দান ফেললে ছয় ওঠে। তখন মেয়েটি আবারো হাসে নাকি চোখের পলক ফেলে, নাকি তার দিকে তাকিয়ে ভ্রুকুটি করে-  তানভীর এটা বুঝে উঠতে না পেরে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকলে তার প্রতিদ্বন্দ্বী –  মসজিদের মাইকে যার নাম ঘোষণা করা হয়েছিল জান্নাতুন- সেই ১৪ বছরের লালফ্রক পরা মেয়েটি বলে-

‘আপনার বুঝি শাবনূরকে খুব পছন্দ?’

তখন সে চার চারটি ডবকা উদ্ভিন্ন-যৌবনা স্থুলাঙ্গী ও স্বল্পবসনা নারীকে তার দিকে ইঙ্গিতময় হাসি নিয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে। তখন জান্নাতুন বলে-

‘দেখি তো আপনার শাবনূরে দান ফেলি।’

বলেই দান ফেলে দেখে তার পুট (এক)উঠেছে। তখন জান্নাতুন আরো রহস্যময় কিছুটা উচ্ছল হয়ে আবারো দান ফেলে আর বলে-

‘বাহ্ আপনার শাবনূরতো দেখি আমার জন্য খুব পয়া!’

এরপর সে-ও শাবনূরে দান ফেলে কিন্তু শাবনূরের হাসি অপরিবর্তিত থাকে আর জান্নাতুন দুই-পাঁচ-তিন-ছয়-এক-তিন-দুই-দুই –  এভাবে তরতর করে এগিয়ে যেতে থাকে আর হাসে। তখন শাবনূরকে বাদ দিয়ে পূর্ণিমা-মৌসুমী-প্রভার উপর একে একে দান ফেলে যেতে থাকে ঘোরগ্রস্ত যুবক তানভীর। চারদিকে বুটের শব্দ হয়, মৃত্যুর মর্মন্তুদ, জান্তব শব্দ হয়; কিন্তু তার ভাগ্য প্রসন্ন হয় না-তখন জান্নাতুন শুধু হাসে। এই হাসিতে তানভীর ক্রমেই শংকিত হয়ে ওঠে এই ভেবে নয় যে, সে জান্নাতুনের কাছে হেরে যাচ্ছে বরং এই ভেবে যে, ১৪ বছরের লাল ফ্রকপরা জান্নাতুন ক্রমেই ক্ষুধার্ত সাপের মুখের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তখন সে আবেদনময়ী ঈষৎ স্থুলাঙ্গী চার নারী শাবনূর-মৌসুমী-পূর্ণিমা-প্রভাকে দেখতে থাকে আর সংখ্যাতত্ত্বের কোনো গভীর ভাবনার সঙ্গে ওই স্বল্পবসনা চার নারীর ঈষৎ স্ফূরিত দুই ঠোঁটের টকটকে লাল ঠোটরঞ্জনী আর কপালের বড় লাল টিপের সঙ্গে জান্নাতুনের ফ্রকের রংয়ের মিল খুঁজে পেলে পর আবারো দান ফেলে। তখন তার মনে হয়, জান্নাতুনের মতোই ওই চার নারী তার দিকে ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে ওঠে আর তা দেখে প্রথমে গুটিটি তিন-দুই-পাঁচ হয়ে ঘুরতে ঘুরতে একে গিয়ে স্থির হয়। ততক্ষণে জান্নাতুন দুটি মই বেয়ে তরতর করে এগিয়ে যেতে থাকে। তার চোখ আনন্দে নেচে ওঠে আর তানভীর আরো গভীর শংকায় পতিত হতে হতে ক্রমেই আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। জান্নাতুন আগের মতোই উচ্ছল আরো প্রগলভা রহস্যময় হয়ে উঠলে পর তানভীর আচমকা বলে-

‘খেলা বাদ, সাপলুডু বাজে খেলা!’

জান্নাতুন হাসে! বলে-

‘আপনি এত ভীতু ক্যান? হারনের ডরে খেলবেন না!’

হারার ভয় না বুটের শব্দে খেলা বাদ দেয় তা বুঝতে না পারলেও যেমন করে সবকিছুতেই মাঝপথে সে থেমে পড়ে তেমনি করেই মাঝপথে খেলায় তার উৎসাহ হারিয়ে যায়। কিন্তু লাল ফ্রকপরা নিখোঁজ জান্নাতুন নাছোড়। সে খেলবেই। তখন তানভীর আচমকা ডাকে-

‘জান্নাতুন!’ –

তার ডাকে জান্নাতুন চমক খায়। কিন্তু এই চমকে যাওয়া বুঝতে না দিয়ে বিহ্বল চোখে একবার কি দুই বার পলক ফেলে বলে

‘জি, বলেন!’

‘তুমি কি নিখোঁজ?’

‘জি…’

তারপর কিছুক্ষণ নীরবতা।

‘আজ একজন লোক মারা গেছেন!’

‘জি’

‘তার নাম তালুকদার মুসলিম উদ্দিন!’

‘জি’

‘সমাজসেবক!’

‘জি’

জান্নাতুন জি-তে আটকে গেলে দুপুর গড়িয়ে গড়িয়ে বিকেল হতে থাকে। যেন কোনো রাজকীয় অতিথিকে সংবর্ধনা জানানো হবে সেজন্য লাল কার্পেটের রোল খোলা হচ্ছে। আর গাঢ় লাল কার্পেট খোলার সময় বাতাসে জান্নাতুনের লাল ফ্রকটি উড়ে যেতে থাকে। তখন জান্নাতুন সেটি ধরার চেষ্টা করে- জান্নাতুন লাল কার্পেটের পেছনে দৌড়ায়। দৌড়াতে দৌড়াতে মজা পায় আর ফ্রকটি ক্রমশ উঁচুতে উড়তে থাকে। তখন সেটি ধরার জন্য লাফায়, হাসে, কিন্তু কিছুতেই ফ্রকটির নাগাল পায় না। তখন জান্নাতুন আরো উঁচুতে লাফ দেয়। তখন চারপাশে সহস্র বুটের শব্দ, লক্ষ ঘোড়ার খুরের আওয়াজ, লাল কাপের্টের বাতাসে জান্নাতুনের লাল ফ্রক আরো দূরে সরে যায়। লাল ফ্রক আর লাল কার্পেটে প্রতিফলিত আলো সিপাহি-শান্ত্রিদের মুখে পড়লে তাদের রক্তকঠিন মুখ আরো রক্তাভ হয়ে ওঠে। কারা যেন কুচকাওয়াজ করে। বিউগল বাজে, ড্রামের দ্রিম দ্রিম শব্দ হয়, ফ্রকটি ধরতে জান্নাতুন আরো জোরে, আরো উচুতে লাফ দেয়। ফ্রকটি তার নাগালের মধ্যেই ওড়ে কিন্তু সে কিছুতেই সেটির নাগাল পায় না। লাল কার্পেট দ্রুত গড়িয়ে গড়িয়ে সমতলে ছড়িয়ে পড়তে থাকে আর জান্নাতুনের লাল ফ্রক আর জান্নাতুন নিজেও আরো উঁচুতে অনেক উঁচুতে লাফাতে থাকে। তখন দূরের আকাশে মহাজাগতিক সংঘর্ষ হয়। সৌরঝড়ের ফলে বিকিরিত লাল আলোকরশ্মি আর বর্ণচ্ছটার মধ্যেই লাল ফ্রকটি ধরতে  লাফিয়ে লাফিয়ে নভোমণ্ডলের দিকে ধাবিত হয় জান্নাতুন। দূরে মিটমিট করে জ্বলে নেভে নক্ষত্রমণ্ডলী। লাল নীল। দুয়েকটি তারা হয়তো খসে পড়ে। সেই নক্ষত্রপূঞ্জের মাঝে জান্নাতুন আর তার লাল ফ্রক ওড়ে!

দুই.

মিরপুর ১ নম্বর মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট পার হয়ে কিছুদূর এগিয়ে গলির এদিকটায় সন্ধ্যার পর কিছুটা নির্জন আর আবছা অন্ধকার। বিল্ডিংগুলো যেমনি পুরাতন তেমনি শ্রীহীন নোংরা বস্তিমতো। তো একনম্বর সেক্টরের ৯ নম্বর গলি দিয়ে ২০ কি ৪০ কদম ডাইনে গেলে হাতের বাঁ পাশের মসজিদটিতে সবসময় তাবলিগ জামাতের লোকজনে সরগরম থাকে। মসজিদের ভেতরে এতিমখানায় জনা পঞ্চাশেক এতিম সুর করে সুরা-কেরাত পড়ে। মসজিদ পার হয়ে সামনে হাতের বাঁয়ে কিছুদূর গেলে যে গলি সেটি খানাখন্দে ভরা। পাশে ড্রেনের পাশদিয়ে উঁচু দেয়ালে তারকাঁটার বেড়া। ওপাশে পিডিবি’র পাওয়ার হাউজ আর ওয়াসা’র পানির পাম্প। এর পর হাতের ডানে মোড় নিয়ে আরেকটি গলি তারপর একশগজ গেলে মোড়ে ছোট্ট একটি মুদিদোকানে ছোট্ট ঝুলানো সাইনবোর্ডে কালোর উপর সাদা রং দিয়ে লেখা-  এখানে গরুর খাঁটি দুধ পাওয়া যায়। তো সেই মোড়ের আগেই ড্রেনের পাশে পিডিবি’র দেয়াল ঘেঁষা ড্রেনের উপর একটু পাকা স্লাব বসানো। পাওয়ার হাউজের ভেতর থেকে বাগানবিলাসের ঝোপটি দেয়াল পার হয়ে ড্রেনের উপর ঝুঁকে পড়েছে। মোড়ে লাইটপোস্টে কদাচিৎ লাইট জ্বলতে দেখা যায়। বেশিরভাগই মসজিদের একটু আলোতে খানাখন্দভরা এই গলির ঝোপের কাছটায় হঠাৎ কোনও পথচারী কিংবা রিকশাওয়ালা তার যাত্রীসমেত রিকশা থামিয়ে দুই কদম এগিয়ে এদিক-ওদিক না তাকিয়েই মূত্রত্যাগ করে। পাকামতো কিছুটা উঁচু জায়গাটায় নিত্য গুলতানি মারে জনাকয় পোংটা যুবক। সকাল-দুপুর-বিকেল-সন্ধ্যা-রাতে বয়সমতো যুবকদলের বদল ঘটে শুধু। এখানেই পছন্দমতো বা সুযোগমতো তারা কারো মোবাইল-মানিব্যাগ হাতড়াইয়া লয় আর গাঁজার স্টিকে দম দেয়। গাজার ধোঁয়া কখনো কখনো বাতাস-বুঝে মসজিদের উলম্ব মিনারের দিকে উড়ে যায়। কখনো পিডিবি’র পাওয়ার হাউজের ট্রান্সমিটারগুলোর ফিউজে লাগলে পর গাঁজার গন্ধে দুয়েকটি ট্রান্সমিটারের ফিউজ পড়ে গিয়ে লোডশেডিংয়ে মদদ যোগায়। আবার কখনো ভারি ধোঁয়ার কুণ্ডলি সদ্য মরহুম তালুকদার মুসলিম উদ্দিনের পাঁচতলা বাড়ির চারতলার পশ্চিমদিকের ব্যাচেলর ভাড়াটিয়ার ফ্ল্যাটের জানালা ডিঙিয়ে পূবদিকের জানালার ফাঁক গলে বয়সের তুলনায় অস্বাভাবিক রকম বড় নিতম্ব ও স্তনের অধিকারী দুই বার ফেল করে এবার মেট্রিকপাস ও কলেজে ভর্তির অপেক্ষায় থাকা মেয়েটির ঘরে ঢুকে পড়ে। সন্ধ্যায় তখন মেয়েটি বুঝতে পারে পাশের ফ্ল্যাটের ভারি চশমাপরা আধকানা ছেলেটি গাঁজা খায়। তখন কলেজে ভর্তির অপেক্ষায় থাকা ‘লাইলা’ থেকে ‘ইলা’ হয়ে যাওয়া মেয়েটির গাঁজার গন্ধ খুব একটা খারাপ লাগে না। এমনকি বাসায় ফেরার পথে কিংবা বের হওয়ার পথে মোটা কাচের চশমার ফাঁক দিয়ে ছেলেটি যখন ইলার নিতম্বের দুলুনি কি বুকের দরদিয়া ঢেউ দেখে তখনও ইলার খারাপ লাগে না বরং ঢেউয়ে বাতাসের দোলা বেড়ে যায়। তখন সন্ধ্যার আবছায়ায় গুলতানি মারতে থাকা যুবকরা গাঁজার দম ছেড়ে হিন্দি গানের কলিতে বেসুরো টান মারে –

লাইলা আ… ওওওওও… লাইলা… আআআআ

এ্যায়সি তু লাইলা আ…

হার কোই চাহে তুঝসে…

মিলনে একেলা… আ…

তারা গাইতে গাইতে গলা খাকারি দেয়। তখন অন্ধকারের মধ্যেই হুডতোলা রিকশা টুনঠুন বেলের বাড়ি দিয়ে সওয়ারি নিয়ে যায় আর পোংটা পোলাপানগুলো সিটি বাজায়, কমেন্ট পাস করে-

‘হালায় মাল তো বালাই মনে অয়।’

‘মামু খাস দিলে কইতাছি কিন্তু কোনো বান্দির পুত আমার লগে লাগতে আইবি না কইলাম।’

‘আব্বে, হালার পুতেরা খামোশ যা কইতাছি- মাগিটা হালায় অখনো আহে না ক্যালায়।’

‘সবর কর মামু, আইবো আইবো, মাল কি মাথায় উইঠা পড়ছেনি?’

তখন চার যুবক আরো ঘন হয়ে বসে গাঁজায় শেষ টান মারতে থাকলে কিছু দূরে আরেকটা হুডতোলা রিকশার টুনঠুন টুনঠুন শব্দ শুনে তাদের মধ্যে চঞ্চলতা লক্ষ করা যায়। কার্তিকের জ্যোৎস্না আর লোডশেডিংয়ের আলো-আঁধারিতে গাঁজায় টালমাটাল যুবকদের মধ্যে সবচে খ্যাংরাকাঠি যুবকটি উঠে কিছু দূরে অপেক্ষারত রিকশার দিকে এগিয়ে যায়। তখন রিকশা থেকে টাইট জিন্সপরা শুটকামতো একটি তরুণী নেমে যুবকটির সঙ্গে আসে। তরুণীটির সামনের দাঁত দুইটা বেমক্কা রকমের উঁচু আর কার্তিকের গরমেও ঠোট দুইটা ফাটা। তো উঁচু দাঁতঅলা মেয়েটিকে নিয়ে আসলে পর অন্য যুবকরা উঠে দাঁড়িয়ে কী মনে করে আবার বসে পড়ে। যুবকটি তার সদ্যসঙ্গিনীকে নিয়ে কিছু দূরে দেয়ালের পাশে যেখানটায় পিডিবি’র বাগানবিলাসের ঝোপটা কাটাতার ও ড্রেন পার হয়ে আরো ঝুঁকে প্রায় রাস্তার কাছে এসে পড়েছে সেখানটায় গিয়ে দাঁড়ায়। তারপর খ্যাংরাকাঠি যুবকটি কোনো ইতস্তত না করেই মেয়েটির কোমর থেকে জিন্সটি নামিয়ে দেয় আর মেয়েটি দুই হাত উঁচিয়ে বাগানবিলাসের দুইটি মোটা ডাল ধরে কোমর ও দুই পা ঈষৎ সামনে ঠেলে দিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। তখন বাগানবিলাসের ঝোপটি দুলতে থাকে। কিছু দূরে তখন একটি রাতপেঁচা তার জ্বলজ্বলে চোখে এই দৃশ্য দেখতে দেখতে মসজিদের কাছে লাইটপোস্টের বাতি জ্বলার অপেক্ষা করে। তাকে বেশ ক্ষুধার্ত মনে হয়। তখন মসজিদের মাইকে ইমাম সাহেবের এশার নামাজের সালাম ফেরানোর- ‘আসসালামু আলাইকুম অরাহমাতুল্লাহ’বলে চার রাকাত ফরজ নামাজ শেষ করে দরূদ শরীফ পাঠ শোনা যায়।

পিডিবি’র দেয়াল পার হয়ে রাস্তায় এসেপড়া বাগানবিলাসের ঝোপটির দুলুনি ততক্ষণে ধীর লয় থেকে ক্রমে দ্রুত হতে থাকলে কী মনে করে যেন তালুকদার মুসলিম উদ্দিনের চারতলার ভাড়াটিয়দেরা কলেজ ভর্তির অপেক্ষায় থাকা মেয়ে ইলা তার ঘরের শেষ হয়ে আসা মোমবাতির কাঁপতে থাকা তিরতিরে আলোয় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে গুনগুন করে আর নিজের দেহসৌষ্ঠবের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। তখন হঠাৎ পাশের বাসার ভারী চশমা পরা আধকানা ছেলেটির কথা মনে হয় তার। ইলা ভাবে, ছেলেটিকে বলতে হবে- সে যেন তার দিকে এভাবে টেরা চোখে না তাকায়। তখন সে ড্রেসিংটেবিলের উপর সাজানো প্রসাধন সামগ্রীগুলো নেড়েচেড়ে দেখে। তারপর লরিয়েল কোম্পানির ঠোঁটরঞ্জনীটি নিয়ে দুই ঠোঁটে গাঢ় লাল রংয়ের প্রলেপ দিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে তারপর কী মনে হয় ইলার? মোমবাতির আলো-আঁধারিতে নিজেকে কিছুটা রহস্যময় মনে হয়? নাকি অতিপ্রাকৃত কোনো রহস্য তার ওপর ভর করে? তখন শরীর থেকে একে একে সমস্ত পোশাক খুলতে থাকে কলেজে ভর্তির অপেক্ষায় থাকা অষ্টাদশী তন্বী ইলা। সভ্যতার সমস্ত আবরণ-আভরণ মেঝেতে গড়িয়ে পড়লে পর একধরনের মুগ্ধতা আর নিবিষ্ট মনোযোগে নিপুণ ভাস্করের মতো ভঙ্গিতে নিজেকে নিয়ে খেলতে থাকে সে। দূরবর্তী প্রহেলিকাময় কোনো জগতের বাসিন্দা মনে হয় কি তার? তখন ইলা প্রাগৈতিহাসিক কোনো নগরীর নিপুণ নৃত্যকলাপটিয়সী রমণীর মতো অনির্বচনীয় সব মুদ্রা ফুটিয়ে তোলে তার অঙ্গে। কিন্তু তার গাঢ় লাল ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা হাসি হঠাৎ কেন যেন কান্নায় পরিণত হয়। সে বিছানায় আছড়ে পড়ে। সদ্যপ্রস্ফুটিত পরম পুষ্পের মতো দুই স্তন বালিশে লেপ্টে থাকলে পর ইলা নামের তরুণীটি সমগ্র অন্তরাত্মা দিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে। নিঃশব্দ কান্নার গমক তার অনাবৃত শরীর উপচে পড়ে; তার যৌবনের মতোই হয়তোবা।

তালুকদার ফরিদউদ্দিনের বাবা আলহাজ্ব তালুকদার মুসলিম উদ্দিন যেদিন মারা যায় সেদিন কী বার ছিল? হয়তো শুক্রবার, শনিবার কিংবা রোববার-এ নিয়ে কেউ আসলে ভাবে না। কারণ কী বারে তিনি মারা যাবেন প্রকৃতপক্ষে এর কোনো পূর্বঘোষণা থাকার কথা নয়। নিত্যকার অন্য সব ঘোষণার মতোই মসজিদের মাইকে তার মৃত্যুসংবাদ ঘোষিত হলে হয়তো কেউ শোনে, কেউ শোনে না। কেউ শোকসংবাদ শুনে বিমর্ষ হয়ে পড়ে। কেউ মৃত্যুর কথা মনে করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বস্তুত কর্মচঞ্চল কিংবা কর্মবিমুখ মানুষের মনে তালুকদার মুসলিম উদ্দিনের মৃত্যুর খবর কোনো রেখাপাত করতে পারে কি-না সেই তর্ক দূরে সরিয়ে রাখলেও এটা নিশ্চিত যে তালুকদার মুসলিম উদ্দিন যে সময়ে মারা গেছেন সে সময়টা ছিল ভাদ্র কি আশ্বিন মাস। আর মিরপুর এক নম্বর সেক্টরের ৯ নম্বর গলির বাসিন্দাদের এটা মনে না থাকলেও মনে ছিল তালুকদার মুসলিম উদ্দিনের ভাড়াটিয়া ইলা নামের মেয়েটির। কারণ যেদিন তালুকদার মুসলিম উদ্দিন মারা যায় সেদিন ইলা তার মায়ের সঙ্গে কেনাকাটা করে নিউমার্কেট ফিরছিল। তখন দুপুরে মুসল্লিরা কেউ জোহরের নামাজ শেষ করে ফিরছিল, কেউ মসজিদে যাচ্ছিল। তাদের কারো শরীরের জেসমিন কি মেশকে-আম্বর আতরের ম ম গন্ধ ছড়িয়ে যাচ্ছিল গলির প্রথম দোকান বদরুল আলমের মুদিখানা পর্যন্ত। মসজিদের গেট পার হওয়ার সময় সেই তীব্র গন্ধ তখন ইলা আর তার মায়ের নাকে এসে ধাক্কা মারে। তারা মসজিদের গেট পার হয়ে ভাদ্রমাসের ভ্যাপসা গরমের মধ্যে কিছুটা ঘেমে-নেয়ে আরো কিছুদূর এগিয়ে গেলে বাগানবিলাসের ঝোপটির কাছে নিত্যকার গুলতানি মারা যুবকদের কিছুটা চঞ্চল ও উত্তেজিত দেখতে পায়। তখন ওই ছেলেগুলোর সামনে সঙ্গমরত কুকুর-কুকুরী চোখে পড়লে মা-মেয়ে যুগপৎ একে অপরের দিকে তাকায়। তখন দুজনেই একটু লজ্জা পায় কি পায় না বোঝা যায় না কারণ কুকুর-কুকুরীর রমণক্রিয়া গুলতানি মারতে থাকা পোংটা পোলাপানগুলোর জন্য নির্ভেজাল বিনোদন নিয়ে আসে। তারা কেউ উদাস হয়ে পড়ে, কেউ ইঙ্গিতপূর্ণ হাসে, কিংবা কেউ হয়তো গরম খেয়ে যায়, আবার কেউ গানের কলিতে টান মারতে মারতে নানা আদিরসাত্মক মন্তব্য করে। এসব মন্তব্যে ইলা ও তার মা ভাদ্রের ভ্যাপসা গরমের সঙ্গে রাস্তার চলমান অস্বস্তিকর দৃশ্যে বেদম হাসফাঁস নিয়ে দ্রুত দূরত্বটুকু পার হয়ে যায়। ইলা ও তার মা যখন তাদের বাসায় পৌছায় তখন দুপুরের রোদে পুড়তে থাকা বাড়িটিকে প্রকৃতই শোকগ্রস্ত ও নীরব মনে হয় কিংবা এটা তাদের মনের ভুলও হতে পারে। কারণ তারা জানে যে, আজ সকালে তাদের বাড়িওয়ালা বৃদ্ধ তালুকদার মুসলিম উদ্দিন মারা গেছে। তখন সদ্যপ্রয়াত তালুকদার মুসলিম উদ্দিনের নিস্তব্ধ বাড়িটির তৃতীয় তলায় গলির পাশের জানালায় দাঁড়িয়ে তালুকদার ফরিদ উদ্দিন ঘরময় গোলাপজল, কর্পূর আর মোহিনী-দরবার আগরবাতির গন্ধ ছাড়াও মৃতের বাড়ির অতিপ্রাকৃত গন্ধের মধ্যে নির্বিকার বাইরে তাকিয়ে থাকেন। তার মনে কী ভাবনা ছিল কিংবা আদৌ কোনো ভাবনা ছিল কিনা কিংবা তিনি পিতৃশোকে কাতর কিংবা সদ্যমৃতের বাড়ির শোকসন্তপ্ত পরিবেশের কারণেই সদ্য পঞ্চাশ-পেরোনো তালুকদার ফরিদ উদ্দিন পুবদিককার জানালা দিয়ে কিছু দূরের পিডিবি’র দেয়ালের উপর দিয়ে রাস্তার কাছে ঝুকে পড়া বাগানবিলাসের ঝোপটার পাশে গুলতানি মারতে থাকা যুবকগুলোর নির্ভেজাল বিনোদন আর কুকুরের যৌনক্রিয়া দেখেন কিংবা দেখেন না। পাশের ঘরে তার প্রায় সমবয়সী পৃথুলা স্ত্রী সুর করে কোরান শরিফ পড়েন। তখন তালুকদার ফরিদ উদ্দিনের ক্ষিধে অনুভূত হলে এদিক-ওদিক তাকান। তাকে দ্বিধাগ্রস্ত মনে হয়। মৃতের বাড়িতে মৃতের সম্মানার্থে সেদিন আগুন জ্বালানো হয় না। তাই বাড়িতে কোনো খাবারের আয়োজন আছে কিনা এ নিয়ে সংশয়ের মধ্যেই উত্তরোত্তর তার ক্ষুধা বাড়তে বাড়তে সর্বগ্রাসী রূপ নেয়। সদ্য পিতৃহারা তালুকদার ফরিদ উদ্দিন প্রথমে ঢকঢক করে পানি খান। এতেও নিবৃত্ত বোধ করেন না। তখন তিনি আঁতিপাঁতি খুঁজে এটা-সেটা খেতে থাকেন যেন কোনও শিশু মায়ের আড়ালে খাবার চুরি করে খাচ্ছে। কিন্তু এসব টোটকা খাবারে প্রকৃতপ্রস্তাবে তার ক্ষুধা আরো বেসামাল হয়ে উঠলে পর ফরিদ উদ্দিন দিশেহারা হয়ে পড়েন। তিনি পায়চারি করেন, কিছুক্ষণ পরপর জানালার কাছে এসে বাইরে তাকিয়ে থাকেন আবার পায়চারি করেন। তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়। ভাদ্রের রোদ কিছুটা ঝিমিয়ে আরো ভ্যাপসা হয়ে উঠতে উঠতে সন্ধ্যা হয়। ফরিদ উদ্দিন পায়চারি করেন, জানালার বাইরে ক্রমপরিবর্তনশীল ক্রিয়াকলাপ দেখেন নিবিষ্ট মনে। বাইরে একসময় কুকুরের রমণক্রিয়া শেষ হয়।

গুলতানি মারতে থাকা ছেলেগুলোর জায়গায় নতুন একদল যুবক আসে। বাগানবিলাসের ঘন ঝোপটির ফাঁকফোকর গলিয়ে রোদ যুবকদের মুখের উপর পড়ে বিচিত্র আঁকিবুকি কাটলে গার্মেন্টসগুলোয় ছুটি হয়। আর যুবকদল চনমনে হয়ে ওঠে। তখন ক্ষুৎপিপাসায় কাতর কর্মক্লান্ত বিবর্ণ কিশোরী-তরুণী দল ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটতে থাকে নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে। তখন যুবকদলের মধ্যে একজন কিংবা দুজন কি তিনজন- রোগাটে, পুষ্টিহীন, মুখে মেছতাপড়া, কারো ঠোঁট-দাঁত পান-খয়েরে কালো কিংবা কেউ অতিশ্রমে হৃতযৌবনা তো কারো তখনো অপুষ্ট স্তনের আভাস দেখা দিতে দিতে, নিতম্ব ভারি হতে হতে চিমসে যাওয়া গতিময় তরুণীদলের ভিড়ে মিশে যায়। আলোছায়ায় তাদের ঘনিষ্ঠ হয়ে আসে। যুবকদের কারো হাত নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে চায়। কারো মুখ-চোখে ইঙ্গিতপূর্ণ কথা, হাসির ঝলকানি আর দ্রুত ছুটতে থাকা তরুণীদের কেউ ভয়ে, কেউ বিরক্তি, কেউ আনন্দে ঈষৎ হাসির মধ্যেই ছুটে চলে। ঘোরগ্রস্ত তালুকদার ফরিদ উদ্দিন জানালায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এসব দেখেন- নাকি জীবন-মৃত্যু, বিশ্ব-সংসার, পাপ-পুণ্য, ইহকাল-পরকাল, শোক-সন্তাপ, আনন্দ-উল্লাসের সারাৎসার তার মাথার ভেতরে খরস্রোতা নদীর পাহাড়ি নদীর পানির মতো ঘুরতে, পাক খেতে থাকে। সবকিছু কি অন্য এক অনন্ত ক্ষুধার সারাৎসার নিয়ে পতিত হয় তালুকদার ফরিদ উদ্দিনের মস্তিষ্কের কোষে কোষে! তিনি এসব নিয়ে খেলতে থাকেন যেন-বা। তখন রাত ঘন হয়ে আসে, নিত্যকার লোডশেডিং হয়। বাগানবিলাসের ঝোপের কাছে যুবকদলের বদল হয়। এশার নামাজের মোনাজাত শেষ হয়। হুডতোলা কয়েকটি রিকশা টুনঠুন বেল বাজিয়ে চলে যায়। গুলতানি-মারা যুবকদের গাঁজার ধোঁয়া তালুকদার ফরিদ উদ্দিনের ভাড়াটেদের মেয়ে ইলার ঘরে ঢুকে পড়ে। লোডশেডিংয়ে অন্ধকার আরো গাঢ় হয়। বাগানবিলাসের ঝোপটির দুলুনি ধীরে থেকে ক্রমে দ্রুত হয়। ল্যাম্পপোস্টের উপর বসা রাতপেঁচাটি দ্রুত নড়তে থাকা  বাগানবিলাসের ঝোপের দিকে তাকিয়ে বাতি জ্বলার অপেক্ষা করে। ঘোরগ্রস্ত ফরিদ উদ্দিন এসব ক্রিয়া দেখেন আর তার ক্ষুধা আরো সর্বগ্রাসী রূপ নেয়। তার অতিকায় জলহস্তীর মতো থলথলে কিন্তু চিররোগা স্ত্রীটিও তখন কোরআন মজিদটি রেহেলে খোলা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে। তখন সদ্যমৃত তালুকদার মুসলিম উদ্দিনের ১৪ বছর বয়সী কাজের মেয়ে জান্নাতুন জানালার কাছে দিনমান দাঁড়িয়ে থাকা তালুকদার ফরিদ উদ্দিনকে ডাক দেয়। হয়তো ভাবে, আহা বেচারা পিতৃশোকে কাতর। আর তখন জান্নাতুন তালুকদার ফরিদ উদ্দিনকে ডাকে-

‘চাচা ঘুমাইবেন না?’

তখন অন্ধকারের মধ্যেই তালুকদার ফরিদ উদ্দিন ঘুরে দাঁড়ান কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ১৪ বছরের কাজের মেয়ে জান্নাতুনের দিকে। তারপর আলতো করে জড়িয়ে ধরেন। জান্নাতুন ভাবে, আহা পিতৃশোকে কাতর লোকটি হয়তো তাকে সমব্যথী মনে করছে। কারণ সে-ই তো তার পিতার শুশ্রূষা করত। জান্নাতুন ভাবে, করুক না একটু শোকপ্রকাশ। তখন পঞ্চাশ-পেরোনো তালুকদার ফরিদ উদ্দিন আরো জোরে জান্নাতুনকে জড়িয়ে ধরেন। তার বুকে মুখ ঘষেন। তখন জান্নাতুন কিছুটা বিভ্রান্ত হয়। হয়তো-বা কিছুটা এলোমেলোও হয়ে পড়ে। তালুকদার ফরিদ উদ্দিনের মস্তিষ্কে সারাদিনের চলচ্ছবি, শরীরের সর্বগ্রাসী ক্ষুধা আর আসুরিক শক্তি একাকার হয়ে যায়। জান্নাতুন ভয় পায় কি পায় না বুঝে উঠতে পারে না কারণ ১৪ বছরের নরম ছিপছিপে কিশোরী কিছু বুঝে ওঠার আগেই সর্বগ্রাসী ক্ষুধায় উন্মাদ, দীর্ঘকালের রমণীরমণবঞ্চিত তালুকদার ফরিদ উদ্দিন জান্নাতুনকে মেঝেতে শুইয়ে দিয়ে তার মুখে হাতচাপা দেন। যদিও হাতচাপা দেওয়ার কোনো দরকার ছিল না কারণ ছিপছিপে কিশোরী জান্নাতুন আতঙ্কে না হয় বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে। প্রাণপণ চেষ্টায়ও কোনো শব্দ সে কণ্ঠনালি চিরে বের করতে পারে না। সৌর বিস্ফোরণের মতো, জ্বলন্ত উল্কাপিণ্ডের মতো তীব্র বিবশ অন্ধকার তাকে ঠেলে নিয়ে যায় আরো অন্ধকারে। আর ফরিদ উদ্দিন যেন এক মহাকালের ডিঙায় ভেসে ভেসে যান। তার কোনো বোধ থাকে না। ক্ষুধা-তৃষ্ণা, জীবন-মৃত্যু, বিশ্বসংসার, হাসি-কান্নার বাইরে তিনি ব্রহ্মাণ্ডের অতি ক্ষুদ্র একটি কণার মতো পরম একটি ভেলায় মহাশূন্যে ভাসতে থাকেন। বাইরে বাগানবিলাসের ঝোপের দুলুনি তীব্র গতি পায়। মসজিদের মাইকে ইমাম সাহেবের মোনাজাত আরো কান্নাজড়িত হয়ে পড়ে। তখন তালুকদার ফরিদ উদ্দিনের জানালার বাইরে ভাদ্রমাসের শুক্লাপঞ্চমীর চাঁদ ওঠে। সেই জ্যোৎস্নার আভা জানালা দিয়ে ভেতরে এসে মেঝেতে পড়ে থাকা ছিপছিপে কিশোরী জান্নাতুনের মুখে পড়ে। শরীরে পড়ে। তার সাদা ফ্রকটি ক্রমেই লাল থেকে গাঢ় লাল হয়। সে নিঃসাড় পড়ে থাকে। ক্রমে জ্যোৎস্না সরে যায়, মসজিদের মাইকটি নির্বাক হয়। বাগানবিলাসের ঝাঁকুনি থিতিয়ে যায়। তখন রাতপেঁচাটি দুইবার কি তিনবার ডেকে বাগানবিলাসের ঝোপে আশ্রয় নেয়। সাদা থেকে লাল হয়ে যাওয়া ফ্রক গায়ে জান্নাতুন ধীরে ধীরে উঠে পড়ে। তারপর সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে আকাশের দিকে তাকিয়ে শুক্লাপঞ্চমীর বাঁকা চাঁদটি দেখে হয়তো ভাবে আকাশে একটুকরো মেঘ থাকলে ভাল হত।

তিন.

জ্বরের ঘোরে কত অনন্ত ঐশ্বরিক বর্ষ কি আলোকবর্ষ পার করে দেয় তার কিছুই  টের পায় না তানভীর। চেতনা আর অবচেতনার মাঝখানে সে গড়িয়ে গড়িয়ে গ্লাস থেকে পানি খায়। পাশে উল্টে থাকা একটি লুডুর বোর্ডে খচিত আটষট্টি হাজার বর্গমাইলের মানচিত্র। মানচিত্রে কিছু অজগর কিছু গোখরা। কিছু মই। লুডুর বোর্ডে অসংখ্য কালো বুট দাপিয়ে বেড়ায়। তাকিয়ে থাকার আপ্রাণ চেষ্টার লড়াইয়ে না পেরে চোখের পাতা ক্রমশ মুদে আসলে বাইরে অনেকগুলো বুটের শব্দ এমনকি গুলির শব্দ শুনতে পায় নিঃসঙ্গ যুবক তানভীর। তখন হয়তো আবার কারো আর্তচিৎকার শোনা যায়। তবু আপ্রাণ চেষ্টায় চোখ আধখোলা রেখে মানচিত্রটি দেখে। গোখরা, অজগরগুলো নড়ে ওঠে। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। একেকটি সাপ ক্রমেই তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ, লাউয়াছড়া থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত দীর্ঘ হয়ে ওঠে। সাপগুলো কি ক্রমেই সচল হয়ে  অতিকায় হা করে ধেয়ে যায় কি যায় না তা বুঝতে পারে না তানভীর। কারণ তখন সে দেখতে পায় অসংখ্য বুটজুতা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সেই শব্দ তার মস্তিষ্কে তীব্র শব্দ তুলে তাকে উন্মাদ করে দেয়। তবু সে দেখে জান্নাতুন নামের মেয়েটি; যার সঙ্গে সে সাপলুডু খেলেছিল সেই লাল ফ্রকপরা মেয়েটি মই বেয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা করছে। কিন্তু মইয়ের অনন্ত সিঁড়ি আর ফুরায় না। তার পেছনে উঠে আসছে একজন কি দুই জন নয়, শত-সহস্র-অযুত-নিযুত-কোটি মানুষ। সকলেই মই বেয়ে উপরে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টায় একে অপরের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। আবার উঠছে আবার পড়ছে। তাদের পেছনে অগণন কালো বুট সশব্দে সে মই বেয়ে উঠছে। মইয়ে ওঠার চেষ্টায় লড়াইরত মানুষগুলোর মধ্যে নিজেকে খোঁজে না তানভীর। বস্তুত তখন সে আবারো বাইরে বুটের শব্দ শোনে, গুলির শব্দ শোনে। মৃত্যুর কাছাকাছি থাকা মানুষের মর্মবিদারী আর্তনাদ শোনে। সেই মর্মন্তুদ মরণচিৎকারের পর ভোর হয়। দেওয়ালের ঘুলঘুলি দিয়ে আলোকরশ্মি তানভীরের হৃদপিণ্ডে উত্তাপ ফেললে দরজার নিচে ফাঁক গলে আসা সকালবেলার খবরের কাগজটি টেনে নিয়ে চোখ বোলায় সে। নিত্যকার বড় বড় লাল হরফে লেখা ‘বন্দুকযুদ্ধে নিহত’আর ‘ধর্ষিতা কিশোরী উদ্ধার’-এর খবর পড়ে। তারপর জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে তানভীর দেখে লম্বা চিরল নারকেলপাতায় বসে থাকা ফিঙেপাখিটি চিরিক চিরিক করে লেজ নাড়ছে।