Home নির্বাচিত লেখা প্রতিশিল্প, ২০০৩ । মারুফুল আলম ।।সম্পাদকীয়

প্রতিশিল্প, ২০০৩ । মারুফুল আলম ।।সম্পাদকীয়

প্রতিশিল্প, ২০০৩ । মারুফুল আলম ।।সম্পাদকীয়
0
0

বই : স্বপ্নের সারসেরা [ছোটকাগজ আন্দোলনের ২৫ বছর] / ২০১০, উলুখড়।।

 

কবি, কবিতা লেখেন আর মানুষই শেষ পর্যন্ত কবিতা পড়ে, গর্দভ ও পণ্ডিতেরা কবিতা পড়ে না— কেন না গর্দভের বিশেষত্ব কিংবা আঁতলামী এর কোনোটাই কবিতার জন্য আদৌ স্বাস্থ্যকর নয়।

কবিতার ইতিহাস ভাষার ইতিহাস— এই কথা সত্য জেনেও বাজারি সাহিত্যের ধুরন্ধর পদ্যবাজেরা তদুপরি মাঝেমাঝেই অকারণে ঘোষণা করেন যে, মানুষের জন্য শেষ পর্যন্ত মানুষের ভাষাতেই কবিতা লেখা উচিত। বাংলা কবিতা-পাঠকদের কেউ কেউ কাব্যভাষা বিষয়ক এমত উটকো ডামাডোলে যদি ভাষাকেই কবিতা মনে করেন তবে নিঃসন্দেহে বাংলা কবিতা ক্রমশ তার পাঠক হারাবে। আর কে না জানে, বাংলা কবিতার পাঠক ক্রমশ কমে যাচ্ছে— এই হা-হুতাশও যথেষ্ট পুরনো। তদুপরি, এটাওতো বটে যে, কবিতা এক অদ্ভুত কাণ্ড! কাগজ আর কলম থাকলেই কেল্লা ফতে! আর কিছুই যেন দরকার নেই তার। হ্যাঁ, অনেকানেক দিন আগে গুরু সক্রেটিস নাকি বলেছিলেন, ঈশ্বর ইচ্ছে করেই কবিকে যুক্তিবুদ্ধির কণামাত্র দেননি— যাতে তারা মত্তাবস্থায় ঈশ্বরের বাণীকে পরিবেশন ও ব্যাখ্যা করতে পারেন। আর জানেন তো, সংস্কৃতে কবি বলতেও এককালে ঋষিদেরই বোঝানো হতো— সত্য দর্শনের শক্তি যাদের আছে। বাংলা ভাষায় সেই অর্থে শুধু একজন রবি ঠাকুরই কবি হিসেবে শ্রদ্ধার অধিকার অর্জন করেছিলেন— তাঁর কথা বাদ দিলে বঙ্গ সাহিত্যের শতসহস্র কবির চেহারা আদৌ ঋষিসুলভ নয়।

সম্ভবত জলপাইরঙা উর্দির দীর্ঘ ও ধারাবাহিক প্রাধান্যের অনিবার্যতায় ফলত আমাদের দেশের প্রায় সর্বত্রই মৌলবাদী প্রবণতার ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে। সম্প্রতি তাদের উত্থানও আমরা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছি। কিন্তু এই ব্যাপকতা, সর্বনাশের এই দীর্ঘ আয়োজন সে তো আর একদিনে হয়নি, হয়েছে ধীরে ধীরে, দশকের পর দশক ধরে অব্যাহতভাবে এই প্রক্রিয়া চালু রয়েছে এবং ইতোমধ্যে তা প্রবেশ করেছে অনেক গভীরে। কঠিন, দিশেহারা, পারস্পরিক অবিশ্বাস আর সংশয়াচ্ছন্ন ও ভয়াবহ আর পশ্চাদপদতার অন্ধ-চোরাগলিতে অজান্তে আমরা অনেকেই আটকে গেছি। তো মৌলবাদী এই প্রতিক্রিয়াশীল প্রবণতার বৃদ্ধি শুধুমাত্র রাজনীতিতেই নয়, অর্থনীতিসহ সব, সবকিছুই গ্রাস করে চলেছে এবং এক্ষণে এই মৌলবাদী শক্তি ও তাদের বল্গাহীন কার্যক্রম নিঃসন্দেহে বিপদজনক আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তদুপরি এটাও ভুললে চলবে না যে, এদেশের মানুষেরা ঐতিহাসিকভাবেই অসাম্প্রদায়িক। তবে মজার বিষয় হচ্ছে; ইদানিং আমাদের সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রেও মৌলবাদী শক্তির নানান অপতৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে কেউ কেউ তো সাহিত্য সংকলন প্রকাশ করে স্রেফ গর্দভের মতো লিটলম্যাগাজিনের এ্যাডভানটেজ নিতে উপর্যুপরি ব্যর্থ হৈচৈ করে চলেছেন— প্রকটভাবে যা হাস্যকর আর দুঃখজনকও বটে! কেননা লিটলম্যাগাজিন শিল্পসাহিত্যে নিঃসন্দেহে সব ধরনের প্রতিক্রিয়াশীলতা, দার্শনিকতা, প্রাতিষ্ঠানিকতা যাবতীয় আধিপত্যবাদ ও মৌলবাদ বিরোধিতারই অপর নাম।

…এদের কেউ কেউ তো আরো বিপদজনক, বলা যায় যে ঘরের শত্রু বিভীষণ! এরা শ্যাম ও কুল সব, সবকিছুই ঠিক রেখে শুধুমাত্র নিজেরই ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সক্ষমতা প্রদর্শন করলেও লিটলম্যাগাজিন, লিটলম্যাগাজিন মুভমেন্ট সর্বোপরি যূথবদ্ধতার প্রশ্নে থাকে ভয়াবহ নিষ্ক্রিয় আর নির্বিকার। মূলত এভাবেই সুচতুর অপকৌশলে তারা ছোটকাগজ আর ছোট কাগজ আন্দোলনকে দিনের পর দিন শুধুমাত্র স্বীয় স্বার্থে ব্যবহার করে চলেছে। এদের বিষয়ে আরো সতর্কতা এক্ষণে সত্যিই ভীষণ জরুরি। তবে প্রথমেই তাদের চিহ্নিত করতে হবে, তা না হলে লিটলম্যাগাজিন আন্দোলন কিংবা যূথবদ্ধতা সবকিছুই দারুণ ক্ষতির মুখে পড়বে, পড়বেই। তো যাই হোক, এটা সত্যি যে লিটলম্যাগাজিন আন্দোলন লেখক তৈরির ক্ষেত্রে সবসময়েই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। পাশাপাশি এটাও বলা যায় যে, লিটলম্যাগাজিন ইতোমধ্যে প্রতিবাদী, নিরীক্ষাধর্মী আর তেজোদীপ্ত ভিন্নধারার লেখকগণের পূর্ণ আশ্রয়স্থল রূপে বিশ্বস্ততা অর্জনে সক্ষমতা লাভ করছে। সুতরাং লিটলম্যাগাজিনকে এক্ষণে শুধুমাত্র সাহিত্যের বীজতলা বা সূতিকাগার হিসেবে দেখার কোনো অবকাশ নেই— কেন না আমাদের এই বাংলাদেশে এরই মধ্যে সংখ্যায় কম হলেও একদল লেখক প্রতিষ্ঠান আর বাজার চলতি মিডিয়াকে প্রত্যাখ্যানের বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে শুধুমাত্র লিটলম্যাগাজিনেরই তাদের ক্ষুরধার ও দুর্বিনীত লেখালেখি অব্যাহত রেখেছেন— হ্যাঁ আপাতভাবে এটিই সত্যি। তদুপরি দুর্জনের কি ছলের অভাব হয়? লক্ষ্য করলেই দেখবেন লিটল ম্যাগাজিনের নাম ভাঙিয়ে সব সময় কিছু কিছু সাহিত্য সংকলন নির্লজ্জ স্ববিরোধিতায় ক্লিশে পণ্য সাহিত্যের লেজুড়বৃত্তি করে চলছে। এই ক্যারিয়ার সচেতন কূপমণ্ডুক ধান্দাবাজ বিভীষণেরা মূলত লিটলম্যাগাজিন ও তার মুভমেন্টের অর্জনকে সুকৌশলে আত্মপ্রতিষ্ঠার সিঁড়ি হিসেবেই ব্যবহার করে থাকে— ফলত ঐ সাহিত্য সংকলনসমূহ নানান প্রতিষ্ঠান ও দৈনিক তথা পণ্য সাহিত্যেরই লেজুড়বৃত্তিতে ব্যস্ত থাকে। মজার বিষয় হচ্ছে যিনি দৈনিকের সাহিত্য সম্পাদক তিনিই আবার লিটল সাইজ সাহিত্য সংকলনের সম্পাদকও বটে! হ্যাঁ, ধান্দাবাজিটা পরিষ্কার বুঝতে আদৌ অসুবিধে হয় না।

পণ্য সাহিত্যের মিডিয়া বিরোধিতার পেছনে প্রতিশিল্পের একটা সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দর্শন এবং সাংস্কৃতিক বিশ্বাস আছে। কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তির আওতাভুক্ত হওয়া বা কারো ইচ্ছা সাপেক্ষে প্রতিশিল্প চালিত হয় না। কিঞ্চিৎ অপপ্রচারটা আমরা শুনি। এর পেছনে কারণটাও আমরা লক্ষ করেছি। আশির সৃজনশীল প্রতিবাদী আত্মনিমগ্ন একজন বিশ্বাসী লেখকের নিরবচ্ছিন্ন অধ্যবসায়কে কেন্দ্র করে বড় কাগজ ও তথাকথিত ছোটকাগজের ভেতরে যে আত্মগত সংকটের রূপ আমরা দেখছি তাতে অবাক হতে হয় যে তাদের চিন্তা ও শিল্পপ্রতিভার দীনতা কতখানি নিচে। ছোটকাগজের ভেতর দিয়ে রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ঐক্যের জায়গাটা তৈরি করা ও কর্পোরেট ক্যাপিটালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা যেখানে রীতিমতো মৃত্যুর সামনে দাঁড়ানো সেখানে কোনো ব্যক্তির বিরোধিতা নিয়ে থুথু ওঠানোর সময় কি আছে? আসলে ভাঁড়ারে মাল নেই তার প্রমাণ আমরা পাচ্ছি। দিনভর চাকরি করে দাম্পত্য জীবন সুখের করা কিংবা স্টুডেন্ট ক্যারিয়ার বিল্ডআপ নিয়ে ব্যস্ত থাকা কিংবা এমফিলের প্রশ্নে লিটলম্যাগাজিন করা আর কবি-লেখক হওয়ার রোমান্টিক সংকট থেকে দুটো বই পড়ে উত্তেজিত হওয়া— এই মধ্যবিত্তীয় আত্মগ্লানির বিষ গ্রহণ করতে আমরা অভ্যস্ত না। আমরা সমালোচনা গ্রহণ করবো সেই ব্যক্তির যার প্রকৃত সমাজভাবনা আছে, যোগ্য হয়ে আত্মত্যাগ আছে আর অবশ্যই সেই ব্যক্তির পেশাগত ও অর্থনৈতিক যাপন দেখে— তত্ত্ব, জ্ঞান বা বুর্জোয়া শিল্পকর্ম দিয়ে না। আর আমরা তো জানি জ্ঞান দিয়ে শিল্পকর্ম হয় না।

পাঠক, নানাবিধ সাহায্যকারী ও শুভানুধ্যায়ীদের শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন।

সম্পাদক: মারুফুল আলম / প্রতিশিল্প, সংখ্যা ৫, এপ্রিল ২০০৩।।