Home নির্বাচিত লেখা বিলম্বিত বহ্নি । লাকু রাশমন।। গল্প

বিলম্বিত বহ্নি । লাকু রাশমন।। গল্প

বিলম্বিত বহ্নি  ।  লাকু রাশমন।। গল্প
0
0

বই : টুটুুকিন ও অন্যান্য গল্প – লাকু রাশমন / গল্প / ২০১৬, উলুখড়।।

কোথাও বিজ্ঞান নেই, বেশি নেই,  জ্ঞান আছে তবু;

কোথাও দর্শন নেই, বেশি, নেই, তবুও নিবিড় অন্তর্ভেদী

দৃষ্টিশক্তি র’য়ে গেছে: মানুষকে মানুষের কাছে

ভালো স্নিগ্ধ আন্তরিক হিত

মানুষের মতো এনে দাঁড় করাবার;

তোমাদের সে-রকম প্রেম ছিলো, বহ্নি ছিলো, সফলতা ছিলো।

 – জীবনানন্দ দাশ

 

নিমভাটিয়া গ্রামে বেশ কিছুদিন আগে একটি বহুজাতিক কোম্পানি তাদের পণ্যের ফ্রি স্যাম্পলিংয়ের কাজ করে গিয়েছিল। পণ্যটি একটি পানীয়, যার নাম ‘গোল্ডেন লাইফ এনার্জি ড্রিংক্স’। এটি একটি বলবর্ধক হালাল পানীয়। স্থানীয় মানুষরা এই পানীয়টির একটি সহজ নাম প্রচলন করেছে, যা ‘গোডেন পানি’ নামে অধিক পরিচিত।  তো এই গোডেন পানি খাবার ফলে গ্রামের মানুষদের মধ্যে নানাবিধ পরিবর্তন খুব নীরবে ঘটছে, যা এই আপাতদৃষ্টিতে খেটে খাওয়া মানুষেরা বুঝতে পারছে না।

এই অবস্থায় অন্য গ্রাম থেকে নামদার আলী নামে একজন খুনি নিমভাটিয়াতে এসে আশ্রয় নেয়। গ্রামের একমাত্র পরিত্যক্ত দোতলা বাড়ির মালিক তার বোনের বুড়ো শ্বশুর-শ্বাশুড়ি। এই বাড়িতে বুড়ো-বুড়ি ছাড়াও আরো আছে বেগম নামে এক যুবতী যে তাদের রান্না-বান্নার কাজ করে দেয়। বেগমের হাঁটু অব্দি  চুল নজরকাড়া। নামদার আলী একসময় দুবাই থাকতো। বেতন না পাবার কারণে সে তার মালিকের কুকুরকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলে, প্রাণের ভয়ে দেশে পালিয়ে আসে। আরব শেখের প্রিয় কুকুর হত্যার দায় নিয়ে সে পালিয়ে বেড়াচ্ছে কারণ ইতিমধ্যে সেই মালিক নামদার আলীকে খুঁজে দেবার জন্য অনেক অর্থ ব্যয় করেছে। পুলিশ হন্যে হয়ে নামদার আলীকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। গল্পের শুরু থেকেই আমরা জানবো যে নামদার আলী একজন খুনি। কিন্তু কুকুরহত্যার বিষয়টা শেষ পর্যায়ে এসে জানতে পারবো।

হঠাৎ অজ্ঞাত কারণে নিমভাটিয়ার চেয়ারম্যান তারা শেখ মারা যায়। তার স্ত্রী নূরবানুর ধারণা কোম্পানির ফ্রি গোডেন পানি অধিক মাত্রায় গ্রহণ করার জন্য তার এই মৃত্যু। আমাদের গল্পের শুরু ঠিক এখান থেকে।

দৃশ্যত গ্রামটা অভিভাবকশুন্য হওয়াতে সেখানকার মানুষেরা খানিকটা শঙ্কিত কারণ এই নিমভাটিয়া গ্রামটা গড়ে উঠেছিল তারা শেখের হাত ধরেই। বছর কুড়ি আগেও এই গ্রামের কোনো অস্তিত্ব বাংলাদেশের মানচিত্রে ছিল না। তারা শেখ তার বড় বড় নৌকা বোঝাই করে বিভিন্ন ধরনের মানুষদের এই গ্রামে নিয়ে এসে বসতি করে দেয়। চরের মধ্যে একফসলি জমিতে হাল দিয়ে কোনোমতে চাষিদের সংসার চলে। বেশি হলে তারা মাছ মারতে যায় কোনো কোনো সময়।

শ’খানেক ছেলে-বুড়ো-যুবক-যুবতী নিয়ে এই জনপদ গড়ে উঠেছে। গ্রামের একমাত্র পাঠশালায় গুটিকয়েক বাচ্চা পড়তে আসে; কিন্তু পড়ার থেকে তারা হাতে করে নিয়ে আসা খালুই বা ঝুড়ি মেরামতে সময় দেয় বেশি। পাঠশালার মাস্টার ঝইরো বিশ্বাস একইসাথে মাছের জাল বোনে এবং ছাত্র পড়ায়।

মূল দ্বন্দ্ব শুরু হয় যখন কোম্পানি থেকে আফানউল্লাহ নামে একজন অফিসার স্যাম্পলিংয়ের প্রভাব সার্ভে করার জন্য নিমভাটিয়াতে আসে। কাজের সময় থাকা-খাওয়ার জন্য সে হাজির হয় সেই বুড়োবুড়ির দোতলা বাড়িতে। যেহেতু আফানউল্লাহ টাকা দিয়ে থাকবে তাই নামদার আলীকে তার রুমটা ছেড়ে দিয়ে বারান্দায় অবস্থান করতে হয়। এতে করে তার আত্মসম্মানে খুব আঘাত লাগে কিন্তু সে নিরুপায় কারণ তার কাছে কোনো টাকাপয়সা নেই যে অন্য কোথাও চলে যাবে, তাই অপমান সহ্য করেও রয়ে যায়। বেগমকে নিয়ে নামদার আলী এবং আফানউল্লাহর মধ্যে শুরু হয় দ্বন্দ্ব। ওদের এরকম আচরণ বুড়ো টের পায়। একদিন নিজের পুরনো ড্যাগারটা বের করে। ড্যাগারটা ধার করার জন্য বিশেষ ধরনের একটা পাথরের উপর ঘষতে থাকে আর নামদার আলী এবং আফানউল্লাহকে তার অতীত ইতিহাস বলে, অতীতে তার পেশা ছিল ভাড়াটে খুনি। মাত্র ষোলটাকে ঘায়েল করেছে আর একটা অর্ধেক গলা কাটা অবস্থায় পালিয়ে গেছে। তারা শেখ তাকে হাতে-পায়ে ধরে নিমভাটিয়াতে এনেছে শুধু এই একটাই কারণে। নিমভাটিয়ার মানুষ বুড়োকে যমের মতো ভয় পায়। বুড়োর খুব আফসোস সেই সতেরো নম্বরটাকে যদি সে পেত কারণ অর্ধসমাপ্ত কাজ সে মোটেই পছন্দ করে না! তার ওস্তাদ তাকে শিখিয়েছিল সব কাজের একটা নিয়ম মানতে হয়, করতে হয় একটা পরিষ্কার হিসাব। মনে মনে হিসাবটা রেখে কাজ করতে হয়। মরার আগ পর্যন্ত সব হিসাব মিলিয়ে যেতে হবে। বুড়ো জানায় তার হিসাব এখনো কিছুটা বাকি আছে। শুধু হাতটা খানিক কাঁপে কিন্তু নিশানা একদম পরিষ্কার। এই গল্প শুনে আফানউল্লাহ ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। কিন্তু নামদার আলী মনে মনে ভাবে, বুড়ো তার মতোই কুকুর হত্যাকারী নয়তো!

নামদার আলী গ্রামটাতে এসেই একটা অদ্ভুত বিষয় লক্ষ করে, মানুষগুলোর আচরণ কেমন যেন অস্বাভাবিক। কেউ হয়তো জাল বুনছে, হঠাৎ তা ফেলে দৌড়ে ধানক্ষেতে এক চক্কর দিয়ে এসে আবার জাল বোনার কাজ করতে থাকে। অথবা কোনো কৃষক মাথায় করে ধানের বোঝা নিয়ে যাচ্ছে, হঠাৎ মাথা থেকে বোঝাটা রাস্তায় ফেলে দিয়ে উল্টোমুখো হাঁটা শুরু করে। বাড়িতে বউ যখন জিগ্যেস করে ফসলের আঁটি কোথায় তখন কৃষকের হঠাৎ মনে হয়, সেটা সে রাস্তায় ফেলে এসেছে, কেন সে এই কাজ করেছে কিছু মনে করতে পারে না। আবার সেই কৃষক হয়তো রাতে হারিকেন এবং ছেলেকে নিয়ে ধানের বোঝা বাড়িতে নিয়ে আসে।

সার্ভে করার সময় একরাতে নামদার আলী আফানউল্লাহকে জিগ্যেস করে এইযে গোডেন পানি গ্রামের মানুষ শক্তিবৃদ্ধির জন্য খাচ্ছে, এটার মধ্যে কী কী আছে? যদি সেইসব উপাদান সম্পর্কে জানা যেত তাহলে সে এটা বানানোর চেষ্টা করে অন্য একটা নাম দিয়ে ব্যবসা করতে পারতো। পানীয়ের মধ্যে কী কী আছে এ বিষয়ে আফানউল্লাহ কিছু জানে না। কারণ সে শুধু ‘পণ্য ব্যবহার পরবর্তী’ সার্ভের জন্য নিযুক্ত। তবে নামদার আলীকে বলে, কোম্পানির কর্মচারীরা এই পণ্য ব্যবহার করতে পারবে না। এটা তাদের জন্য নিষিদ্ধ-কোম্পানি কর্তৃক এরকম আইন বলবৎ রয়েছে। তবে আফানউল্লাহ চুরি করে কয়েকটা স্যাম্পল নিজে ব্যবহার করেছে। এটা অতি চমৎকার একটি পানীয় এবং কেন যে কোম্পানি এত কড়াকড়ি ব্যবস্থা করেছে তা সে বোঝে না। এটা খাবার কয়েক সপ্তাহ পরে সে তার মধ্যে এক ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করেছে। এই পরিবর্তনজনিত অনুভূতি সে দারুণ উপভোগ করে।

প্রতিবছর চান্দু মৃধা নিমভাটিয়াতে আসে তার ভাঙাচোরা পিকআপ ভ্যান নিয়ে। ভ্যানের মাথায় পরস্পর বিপরীত মুখ করা দু’টি মাইক, যেখান থেকে ক্রমাগত হিন্দি গান শোনা যায়। মূলত তার জটার কাজের ব্যবসা। নানান জায়গা থেকে সে বিভিন্ন ধরনের পণ্যের (যেমন: সিলভারের হাঁড়ি-পাতিল, পেঁয়াজ, গরম মসল্লা ইত্যাদি) বিনিময়ে চুল কেনে। সারাবছর বউ-ঝিয়েরা চুল আঁচড়ে যেসব চুল চিরুনিতে উঠে আসে সেগুলো পলিথিনের ব্যাগে সংরক্ষণ করে আর নাপিতেরা খদ্দরের কাটা চুল রেখে দেয় বিক্রির জন্য। ক্রয়কৃত চুল পরিষ্কার করে চান্দু ভারতে বিক্রি করে, এইসব চুল দিয়ে পরচুলা তৈরি হয়। চান্দুর মন খারাপ কারণ মানুষ শ্যাম্পু ব্যবহার করার ফলে চুলের কোয়ালিটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং অন্যদিকে প্লাস্টিক ফাইবারের সস্তা চুলের আগ্রাসনে নকল চুলের বাজার হুমকির মুখে।

একদিন বেগম গোসল সেরে তার দীঘল লম্বা চুল রোদে মেলে রাখে, দূর থেকে চান্দু মৃধা সেই চুল দেখে অবাক হয়ে যায়। সাহস করে বেগমের কাছে এসে চুলগুলো একবার হাত দিয়ে পরীক্ষা করার অনুমতি চায়। বেগম চান্দুর মুখের ভাব দেখে হেসে অস্থির হয়ে যায়। দূর থেকে ওদের এরকম দৃশ্য দেখে আফানউল্লাহর ভীষণ রাগ হয়। সে তখন নামদার আলীকে ডেকে আনে এবং বলে তার পালিয়ে যাবার জন্য যে টাকার দরকার ছিল, তা সে পেতে পারে সহজে। যদি রাতের আঁধারে সে বেগমের চুল কেটে নিয়ে চান্দুর কাছে বিক্রি করে দেয়। এতে নামদার আলী প্রথমে রাজি হয় না।

একসময় গ্রামে পুলিশের হাবিলদার তার বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে আসে। কিন্তু আফানউল্লাহ নামদার আলীকে বলে তাকে ধরার জন্য পুলিশ গ্রামে এসেছে। তখন উপায় না দেখে নামদার আলী ঘুমন্ত বেগমের চুল কেটে নিয়ে চান্দুর কাছে যায় বিক্রির জন্য। বেগমের চুল দেখে চান্দু ক্রোধে নামদার আলীকে খুন করে পিকআপ ভ্যানের মধ্যে লুকিয়ে রেখে রাতের অন্ধকারে গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। যাবার সময় ব্যাগভর্তি চুল বুড়োর বাড়ির কাছে একটা বটগাছের গোড়ায় রেখে যায়, যাতে সকালে বেগম সেটা খুঁজে পায়।

সকালে বেগম উঠে যখন দেখে তার চুল নেই সে অজ্ঞান হয়ে যায়। বুড়ো বেগমের অবস্থা দেখে নামদার আলী এবং আফানউল্লাহর খোঁজ করতে যায়। বুড়ো দেখে তারা দু’জনের কেউ নেই। মূলত আফানউল্লাহ সার্ভের জন্য খুব ভোরে গ্রামে চলে গেছে। বুড়ো তাদের খোঁজের জন্য বাইরে যায়। এবং সেই বটগাছের শেকড়ের মধ্যে আফানউল্লাহর ব্যাগের মধ্যে বেগমের চুলগুলো পায়। বুড়ো নীরবে বাড়ি চলে আসে। কাজ শেষে আফানউল্লাহ বাড়ি ফিরলে তাকে বাড়ির ভাঙা ছাদের উপর নিয়ে যায় বুড়ো এবং ব্যাগটা দেখায়। ব্যাগটা দেখে আফানউল্লা বুড়োকে বোঝানোর চেষ্টা করে যে নামদার আলী তার এটা চুরি করে নিয়েছে। এ বিষয়ে সে কিছুই জানে না। বুড়ো কোমর থেকে ড্যাগারটা বের করে আর তাই দেখে আফানউল্লাহ ধীরে ধীরে পিছন সরতে থাকে, একসময় পা পিছলে ছাদ থেকে পড়ে যায় আর বুড়ো বিড়বিড় করে বলে ওঠে-সতেরো।