Home নির্বাচিত লেখা বেদে-নির্বেদে করেন দেবতা বসবাস । শান্তনু চৌধুরী ।। ভূমিকা (মিথ)

বেদে-নির্বেদে করেন দেবতা বসবাস । শান্তনু চৌধুরী ।। ভূমিকা (মিথ)

বেদে-নির্বেদে করেন দেবতা বসবাস  ।  শান্তনু চৌধুরী ।। ভূমিকা (মিথ)
0
0

বই: পূষা – শান্তনু চৌধুরী / কাব্যনাটক / ২০১৩, উলুখড়।।

 

সময় এমন এক বহতা পুরাণ মহাকালে, কোটি মন্বন্তরায় তার মাঝে লীন হয়েছে মানুষের কত কত নতুন প্রতীতি, নতুনতর ধারণা, সমাদৃত কত নওল বিশ্বাস! সেই ঊষাকাল থেকে মানুষের চেতনায় প্রবহমান এই কাল চূড়ান্ত সত্য সম্পর্কে তাকে বরাবরই একটা ধাঁধার মধ্যে রেখেছে; সময়ের একমুখি এই ধারা বার বার অতিক্রম করতে চেয়ে মানুষ বুঝেছে এই নদী অনতিক্রম্য। হয়তো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে, তবু প্রতিদিন আগের ধারণাগত নিরালোক ছেড়ে আপাত সুস্থির কোনও নিকটবর্তী ধারণালোকে বেরিয়ে এসেছে সে; কিন্তু দিনের শেষে আবারও আলোর চিহ্নের সঙ্গে তার ধারণার পুরনো পথের রেখাও মুছে গেছে দূর নিরালোকে।

প্রাচীন মানুষের মনে সময়ের এই চিরায়ত ধারণার জন্ম দিয়েছিল আকাশের ওই বিশাল ব্যাপ্তির সূর্য। মহাবিশ্বের অনন্ত বিস্তারের মাঝে দিনমান সূর্যের উজ্জ্বল প্রতাপ আর রাতভর অন্তর্ধান হয়তো গভীর এক ভেদের ভাবনা জাগিয়ে দিয়েছিল ওদের মনে। তাই দিনরাতের রূপবদলের মাঝে ওদের কাছে সূর্য হলেন এক অতিপ্রাকৃতিক ঘড়ি, সময়ের নিখুঁত সূচক। সৌরশক্তির মহা উৎস এই সূর্য এক সময় হয়ে উঠল ওদের আলোর দেবতা— সূর্যসবিতৃ।

আদি ধর্মমতগুলোর অন্তরতম শক্তিই ছিল এই সূর্য, তার থেকে ধীরে ধীরে পরম দেবতাজ্ঞান, এত ভক্তি, বৃন্দউপাসনা, সব সূর্যপুরাণ। এভাবেই প্রাচীন পৃথিবীতে এককভাবে সর্বজনীন দেবরূপ পেয়ে যায় সূর্য; পুবের চীন-ভারত থেকে সুদূর পেরু-যুকাতান সবখানে সূর্য বহু নামে, বহু রূপে, বহুল অর্থে পূজিত হতো। মানুষের অধ্যাত্ম-চেতনার ইতিহাসে ধর্মের ধারণাকে, বলতে গেলে, জোরালো করেছে এই সূর্যই। যিশুর জন্মের ঠিক প্রাক্কালে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে উপাস্য ছিল এমন অন্তত ৩০টি সূর্যদেবতার কথা জানা যায়; এদের কেউ মিশরের অসিরিস, হোরাস, সেরাপিস, তাহ্; সিরিয়ায় এটিস, আদোনিস, সাবাজিউস; আসিরিয়ায় তম্বুজ, ব্যাবিলনে মারজুক আর সারগন; আবার পারস্যে মিত্র, আহুরা-মাজদা; ভারতে ইন্দ্র-অগ্নি-বরুণ কিংবা গ্রিসে অ্যাপোলো, ডাইওনিসাস, হারকিউলিস বা প্রমিথিউস। আবার সূর্যের সম্ভ্রমেও পূজিত হতো কেউ কেউ; এদের অনেকে ছিল বীর, কেউ রাজা, কেউ-বা সম্রাট কিংবা মিকাদো, ইনকা, ফারাও; সূর্যশক্তির রূপকে শক্তিশালী মানুষের মিথ হয়ে ওঠার এই প্রবল ইচ্ছা বা থাইমস বয়ে চলেছে সেই শুরু থেকে আজ অব্দি অপ্রতিহতভাবে। এভাবে ব্যক্তিমানুষের যে শক্তি বা আলো অন্য মানুষকে আলো দেখিয়ে সামনে নিয়ে যায় তারাও হয়ে ওঠে সূর্য। ওদেরই প্রণম্য মেনেছে পুরনো পৃথিবীর মানুষ।

ভোরের আলোয় সূর্যের উদ্দেশে শত সহস্র কণ্ঠের স্তোত্রপাঠ, তার মিলিত ধ্বনির মধ্যদিয়ে এমনই ভাবে জেগে উঠেছিল ঋগ্বেদ। সর্বব্যাপী আলোর আহ্বানে জেগে ওঠা বৈদিক মানুষের আত্মার এই ধ্বনি ছিল মূলত সূর্যবন্দনা আর আলোর স্তুতির বিরামহীন এক সমস্বর। ঋগ্বেদে মূলত প্রকাশ পেয়েছে গোটা নিসর্গকে ঘিরে সূক্ষ্ম একটি বোধ; প্রকৃতির রূপ ও রহস্যের প্রতি গভীর কৌতূহল, অপার বিস্ময় আর সতেজ অনুভূতি : সূর্য ও পৃথিবী, রাত্রি ও দিন, গোধূলি ও প্রত্যুষ, বৃষ্টি ও ঝড়, মেঘ ও সূর্যালোকের কাব্যিক স্তুতির চেয়ে বৈদিক ঋষিদের সূক্তগুলো বাড়তি কিছু নয়। ঝিরঝিরে বাতাস, দিনের উজ্জ্বল আলো, নক্ষত্রশোভিত রাতের আকাশে ভাসতে থাকা কস্তুরি আভার চাঁদ কিংবা মাটিতে লুটোনো কুয়াশা আর ঝরে-পড়া শিশির, পাহাড়-পর্বত চিরে বিচিত্র ফলফুলময় সমতলের মধ্য দিয়ে নেমে আসা নদ-নদীর নিরন্তর প্রবাহ, চারণভূমির সমৃদ্ধ পশুপাল কিংবা ফসলের প্রাচুর্য, বনস্পতির ছায়ায় ঘুমিয়ে থাকা গহীন অরণ্য কিংবা অবারিত শস্যপ্রান্তর সবই বৈদিক মানুষের কাছে ছিল আনন্দবহ জীবনের পক্ষে পরম এক সত্য।

ঋগ্বেদে মর্ত্যের  জীবনকে মায়া কিংবা বন্ধনরূপে ভাবা হয়নি; বরং নির্দ্বিধায় উচ্চারিত হয়েছে জীবন আনন্দের, জীবাতবে ন মৃত্যবে, মৃত্যু নয়, বেঁচে থেকে এই আনন্দভোগই জীবের জীবন কিংবা আরও পরে বেদান্তদর্শনেও মেলে একই উপলব্ধি : আনন্দাদ্ধ্যেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে। আনন্দেন জাতানি জীবন্তি। আনন্দং প্রযন্তি অভিসংবিশন্তি (তৈত্তিরীয় উপনিষৎ)। আনন্দ থেকেই জীবের জন্ম। আনন্দের মাঝেই বেঁচে থাকে জীব। পরে আবারও আনন্দেই অভিপ্রবিষ্ট হয়।

সত্য আর আলো বৈদিক দ্রষ্টাদের ভাবনায় ছিল সমার্থক; যেমনটি ওদের কাছে অজ্ঞান আর অন্ধকার ছিল এসব শব্দের বিপরীত। ঋগ্বেদে ধর্ম, এক কথায়, সূর্যোপাসনা। কিন্তু বেদে আলোর এই দেবতাকে ঘিরে কোনও অনুশাসন বা বিধি মেনে সুশৃঙ্খল ধর্মতত্ত্ব গড়ে ওঠেনি। বৈদিক ঋষিদের কণ্ঠে উচ্চারিত স্তবস্তুতি আর গুণকীর্তনের বেশির ভাগ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ এতটাই স্পষ্ট যে তার মধ্যে বহু নামে, বহুল স্বরূপে সূর্য দেদীপ্যমান। সূর্য এদের কাছে ছিল জীবনের প্রতীক, সমস্ত আলোর উৎস বা সবিতৃ অর্থাৎ জন্মদাতা; যে জীবন চারদিকে অন্ধকারে আক্রান্ত হয়েও আলোর মধ্যে সতত জয়যুক্ত হচ্ছে সেই জীবন সূর্যের দান। জগতের কল্যাণে সাতটি দ্রুতগামী অশ্ব তাঁকে আকাশের দূরলোক থেকে প্রতিদিন বয়ে আনছে এই মর্ত্যে।

এই সূর্যই বৈদিকদের উপাস্য। তাঁর আলোর দিকেই হাত বাড়িয়েছিল আর্যপিতৃপুরুষেরা। আর্যরা যে ধর্মের বীজ নিয়ে ভারতবর্ষে এসেছিল সেখানে প্রাগার্য কৃষিচারী সভ্যতায় মিশে গিয়ে সূর্যকে পুষ্টিদাতা হিসেবেই মেনেছিল তারা। বৃষ্টিনির্ভর কৃষির জন্য দেবতা সূর্যের কাছে যথাকালে মেঘ-বৃষ্টি আর ছায়া ভিখ মেগেছে : রোগীর আরোগ্য, পশুপালের বিস্তার, সুস্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধি কিংবা দীর্ঘ জীবন আর অমরতা যাচ্ঞা করেছে চিরনবীন সূর্যের কাছে। তাদের কাছে সত্য হচ্ছে আলো, সূর্যের শরীর। তাঁর দেহ থেকেই সত্য, শক্তি আর ব্যাপ্তির জন্ম। কারণ প্রতি রাতের অন্ধকার পেরিয়ে সূর্যের নিঃসংশয় আগমনের মধ্যদিয়ে প্রত্যহ সত্য স্বতঃপ্রকাশিত হচ্ছে।

দেবতা সূর্য অসীম আলোর আধার অদিতির সন্তান। দক্ষের কন্যা অদিতি দেবর্ষি কাশ্যপের স্ত্রী, স্বর্গের দেবতাদের জননী। তাঁর ঋতম বা আলো থেকে সব দেবতার জন্ম। বেদের একটি সূক্তে বলা হচ্ছে, অসীম, অখণ্ড চেতনার দেবমাতা অদিতি হচ্ছেন সেই আলোক যিনি সব কিছুর জন্মদাত্রী। অপরপক্ষে, দিতি বা দানু হচ্ছেন দ্বিধান্বিত, খণ্ড-চেতনার দানবদের গর্ভধারিণী। আবার অদিতি ও দিতি একই পিতার সন্তান এবং দু’জনের স্বামীও একই জন।

স্বর্গ, অন্তরীক্ষ আর পৃথিবী এই ত্রিজগৎকে নিজ নিজ কব্জায় রাখতে দেব-দানবের চিরকালীন দ্বৈরথের যে রূপ আমরা বৈদিক কল্পনায় পাই তা দিন-রাত্রি, সত্য-মিথ্যা, শুভ-অশুভ, চেতন-অচেতন, সসীম-অসীম কিংবা ভেদ-অভেদ এমনই যুগল বিরোধাভাসে প্রকাশ পেয়েছে বেদের নানা সৌরসূক্তে। তাদের ধারণায় জগৎটা আলো-আঁধারের যুগলবন্দি, তারই মাঝে প্রকৃতির স্বরূপ প্রকাশ পাচ্ছে নানা রূপে নানা তলে সত্যের আলোয়। অজ্ঞানতার সুরক্ষিত নগরীর নিশ্ছিদ্র দেয়ালের মাঝে মানুষ আটকা পড়ে আছে; সেই তমসার ভিত টিকিয়ে রেখেছে যেসব অশুভ শক্তি, তাদের বিরুদ্ধে সত্য আর আলোর রক্ষক শক্তিমানদের এই লড়াই চলছেই। তাই আলো-অন্ধকার ও সত্য-মিথ্যার এই বিরোধের উৎস আসলে আলোকিত অসীম ও অনালোকিত সসীম চেতনার মহাজাগতিক এক দ্বন্দ্বই। প্রায় তিন হাজার বছর আগে আর্য-জাতির চেতনায় গড়ে ওঠা এসব শক্তিমানরাই ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন অনেকানেক দেবদেবীর মুখ।

তথাপি বেদের দেবতারা ছিলেন কিছুটা বিমূর্ত, ধারণাতীত এক ইন্দ্রজালে আবৃত, প্রকৃতির একেক শক্তির একেকটি রূপ; যেমন, আলোর দেবতা সূর্য, বৃষ্টির দেবতা ইন্দ্র, আগুনের প্রতিভূ অগ্নি কিংবা বাতাসের নিয়ন্তা পবন আর সমুদ্রের প্রতিনিধি বরুণ। আর্যরা তাদের ফসলের ওপর এসব দেবতার প্রভাব মানতো প্রবলভাবে, প্রতিদিনের প্রয়োজনে এঁদের কাছে প্রার্থনা করতো আনত ভঙ্গিতে। সারা বছরের পরিশ্রম আর উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে শেষে বিপুল ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হলে তারা এই সৌভাগ্যের জন্য মনের গভীর থেকে এসব দেবতার স্তুতি গেয়ে বেড়াতো।

এসব স্তুতি মানুষের মুখ থেকে মুখে শ্রুতির আকারে কাল থেকে কালে ছড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পুরাণ বা স্মৃতির কালে এসে বেদের এসব দেবতার রূপ যেমন ধীরে ধীরে সংহত অবয়ব পেতে থাকে, তেমনি তাঁদের ভূমিকা আর দৈবিক ক্ষমতার গুরুত্বভেদে দেবচরিত্রগুলোর ঘটে যায় অনেকান্ত বিস্তার। বেদের দেবতাদের নানা আখ্যান, কাহিনি বা কিংবদন্তী পরবর্তী সময়ে পুরাণে জায়গা পেয়েছে ইতিহাস হিসেবে। এতে এসব কাহিনির কসমোগনি এবং থিয়গনি আরও সুনির্দিষ্ট ও সম্পৃক্ত হয়ে পূর্ণতা পেল পুরাণে; পাশাপাশি এসব কাহিনির ধারাবাহিক কম্পিউটেশন ও জিনেলজিকে বিশদ পরিসরে এবং রীতি মেনে সাজানো হয় এই সময়ে। প্রকৃত অর্থে, বেদের বিক্ষিপ্ত ও নিরুদ্দিষ্ট ভাবনা, ভাসা-ভাসা ধর্মীয় বিশ্বাস আর ইতিহাস কেটে-ছেঁটে সুস্পষ্ট এক পৌরাণিক রূপ দেওয়া হয় তখন। এই সময়েই প্রথম উৎসর্গ প্রথা, যাগ-যজ্ঞ, আচার-অনুষ্ঠান আর পূজার্চনার প্রতি ঝুঁকতে শুরু করে তখনকার সমাজ।

বৈদিক যুগে কোনও পুরোহিতের উপস্থিতি ছিল না সমাজে। কিন্তু পুরাণ আর ইতিহাসের যুগে এসে ব্রাহ্মণদের গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ায় যজমানী প্রথা সমাজে জেঁকে বসে। আরও পরে একটু একটু করে ক্ষমতা ও ঔজ্জ্বল্য হারাতে থাকেন বেদের দেবতারা। তবে এসব দেবতার গুরুত্ব পুরোপুরি হারিয়ে না-গেলেও তত দিনে ওঁরা সবাই একান্তভাবে হয়ে পড়েছিলেন ব্রাহ্মণদের সর্বোচ্চ একক দেবতা ব্রহ্মার অনুগত।

সব দেবতারই ঘরবাড়ি ঊর্ধ্বলোকে, ঊর্ধ্বায়ম আয়তানাম, আবার সব সৌরদেবতার গায়ের বরণ সোনালি, তাঁদের পোশাক-আশাক স্বর্ণের আর ঘুরে বেড়ান হিরণ্ময় রথে। কিন্তু তাঁদের প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য আর কাজের ক্ষেত্র আলাদা; যেমন, দেবরাজ ইন্দ্র সর্বোচ্চ মানসকেন্দ্র স্বরের অধীশ্বর, অগ্নি থাকেন ধরায়, মরুতের আওতা অন্তরীক্ষ বা মাঝ আকাশ, পূষার অবস্থান তৃতীয় ধাপে, অর্থাৎ পৃথিবীতে ; একই ভাবে অপরাপর দেবতারাও তাঁদের দায়িত্বের স্বভূমে থাকেন সদা বিচরণশীল।

বেদান্তে যাকে বলা হয়েছে বিজ্ঞান অর্থাৎ যথার্থ জ্ঞান, বেদে তা ঋতম বা আলোকময় সত্য। অসীম আলোর আধার অদিতির দীপ্তি থেকে জাত আলোর সন্তান এই দেবতারাই সমগ্র মহাবিশ্বে আলোকময় সত্যকে টিকিয়ে রাখার চিরন্তন আনন্দযজ্ঞে নিয়োজিত। এঁরাই সত্যের অপরিমেয় আলোয় আলোয় গড়ে তুলেছেন এই মহাবিশ্ব, আলোর দেবতাদের দানে ভরে ওঠে পৃথিবীর মানুষের প্রতিটি দিন। প্রতি ভোরে সত্যের আলো ছড়িয়ে যায় অন্ধকার আকাশে, সমগ্র চরাচর স্নিগ্ধ, কোমল আর সতেজ আভায় ভরে ওঠে, সবখানে জেগে ওঠে চিরন্তন মহিমা নিয়ে আবারও নতুন প্রত্যাশা।

তাহলে সূর্য কে, কার কাছ থেকে ছুটে আসছে এত আলোকরাশি? প্রত্যুষের সেই মুহূর্ত, পুব আকাশের সেই সোনার বিন্দুটি যেখানে ভোরের দ্যুতিময় সম্ভাবনা নিহিত, যেখানে রাত্রি বা নক্ত’র অবসান, অন্ধকার আর অজ্ঞানতার নিশ্চিত পরাজয় সূচিত, সেখানেই অপেক্ষমাণ এই সূর্য, সবিতৃ বা সবিতা রূপে। তাঁর রশ্মি মানুষের মর্মমূলে ঢুকে গড়ে তোলে যে আলোকিত সর্বোচ্চ বোধের জগৎ তারই নাম স্বর, যার নিয়ন্তা দেবতা ইন্দ্র; এ যেন সূর্যেরই আরেক রূপ। সূর্যের বহুরৈখিক উপস্থিতি, বহু দশা আর বহুমাত্রিক সক্রিয়তার কারণে তাঁকে আরও নানা নামে সম্বোধন করা হয়েছে বেদের নানা সৌরসূক্তে। সূর্য সকল শক্তির উৎস বলে তিনি যেমন সবিতৃ বা স্রষ্টা, তেমনি গোটা বস্তুপ্রপঞ্চের উদ্ভাবক বলে তাঁকে বলা হচ্ছে ত্বষতৃ, কিংবা সৃষ্টিজগৎকে সতত সমৃদ্ধ করে চলেছেন বলে তিনিই আবার ঋদ্ধিদাতা পূষা। একই সূর্যের ভিন্ন ভিন্ন রূপ ও নামকরণ, বাস্তবিক, একেক সত্তার মাঝে এই আলোর দেবতার স্বতন্ত্র মহিমাই প্রকাশ করে; এমনই আরও যেসব দেবতা বেদে তাঁর নাম ও সক্রিয়তার অংশ হয়ে গিয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম চার প্রধান বৈদিক দেবতা মিত্র, বরুণ, ভগ ও অর্যমানের নামও রয়েছে।

বেদের একটি সূক্তে বলা হচ্ছে : অদিতিপুত্র দেবতা ইন্দ্রই তাঁর পিতা কাশ্যপকে পা ধরে টেনেহিঁচড়ে এনে হত্যা করেন এবং তাঁর মায়ের বৈধব্যের জন্য দায়ী। আবার অনেক স্ববিরোধী তথ্যও আমরা পাই বেদে; কোথাও বলা হচ্ছে, দেবতা সূর্য তাঁর বোন ভোরের দেবী ঊষার প্রেমিক, আবার কোথাও নিজেরই মা অদিতির দ্বিতীয় স্বামী হিসেবেও মিলছে তাঁর নাম। অপর এক সূক্তে ইন্দ্রের সহোদর সর্বজ্ঞ দেবতা বিষ্ণুর স্ত্রী হিসেবেও উল্লেখ আছে অদিতির। ইনি সেই একই ইন্দ্র যিনি সূর্যকে সত্যের আলো বিলিয়ে দিয়ে অন্ধকার দূর করবার জন্য জাগিয়ে তুলছেন স্বর্গে।

বেদ-পুরাণের ঘন অরণ্যে লুকোনো এসব কাহিনির জট খুলতে গিয়ে ধর্মতত্ত্ব কিংবা স্বর্গের বদলে এই মর্ত্যে প্রতি সূর্যোদয়ে যাঁর সুচির উপস্থিতি আমরা টের পাই তিনি ভোরের দেবী ঊষা। বৈদিক কাহিনির সবচেয়ে সমুজ্জ্বল চরিত্র অনিন্দ্যসুন্দরী এই দেবী। গ্রিক পুরাণে ভোরের এই দেবীর নাম এয়স; তাঁর প্রেমিক মর্ত্যমানব তিথোনাস অমরত্ব পেলেও যৌবন পেরিয়ে বয়সের ভারে ন্যুব্জ ও স্থবির। অমর অথচ চিরযৌবন-বঞ্চিত গুহাবাসী তিথোনাসকে প্রতি ভোরে দেখতে আসেন দেবী এয়স। অন্যদিকে, ইন্দো-ইউরোপীয় এই ভোরের দেবীর নাম রোমান পুরাণে অরোরা। পৃথিবীতে রাত্রিশেষে সর্বোচ্চ আলোর দুয়ার খুলে যে মূর্তি সামনে এসে দাঁড়ান তিনি ঊষা। প্রতি ভোরে তাঁর আগমনের মধ্যদিয়ে সক্রিয় হন সূর্য।

ঊষা স্বর্গের মেয়ে, দেবদুহিতা, অদিতির মুখশ্রী দিয়ে গড়া তাঁর জ্যোতির্ময়ী রূপ; অন্যদিকে, দিতির কন্যা রাত্রি বা নক্ত তাঁর বোন। এঁরা দু’জন একই চিরন্তন আবর্তনের এপিঠ-ওপিঠ, পরিপূরক দেবী। ঊষা-নক্ত একই আলোর সন্তান, দিনরাত্রির এই ছন্দ ও পালাবদলের চিররূপকার, অনিঃশেষ আলো-অন্ধকারের খেলায় নিয়োজিত সাথী। বেদের কুৎসা শ্লোকে এই দুই সহোদরাকে নিয়ে বলা হচ্ছে : একই প্রেমিকের জন্য স্বর্গ-মর্ত্যে এই দুই অমর দেবীর নিয়মিত গমনাগমনে আলোর রঙ ফুটে ওঠে; তাদের রূপ ভিন্ন হলেও পথটি অভিন্ন ও অনিঃশেষ।

রাত্রির মাঝে বিরাজমান যে জগৎ তা অচেতনতারই রূপ; সে জগৎ এক অচেতন সমুদ্র, অন্ধকারের গভীরে লুকোনো অন্ধকার, তারই গর্ভে আলোর বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে জন্ম নেন দেবী ঊষা। এই দেবদুহিতা তাঁর সত্যের আভায়, তাঁর আলোর ঐশ্বর্য নিয়ে প্রতি ভোরে জেগে ওঠেন পৃথিবীর দিগন্তরেখায়; তাঁর নবীন আলোর ছোঁয়ায় খুলে পড়ে অন্ধকারের গাঢ় যবনিকা : আলোর পোশাক পরা চিরতরুণী এই দেবকন্যা ধীরে ধীরে তার বুকের আবরণ সরিয়ে উন্মুক্ত করেন আলোকছটা, তাঁর দীপ্তিময় তনু থেকে ঠিকরে পড়ে আলো। তাঁর আগমনের মধ্যদিয়ে শুরু হয় পৃথিবীতে সূর্যের তিন লাফের প্রোজ্জ্বল পরিক্রমা। সাধারণভাবে সূর্যের প্রাতঃ, মধ্যাহ্ন ও অস্তগামী রূপ বা দশায় আকাশের তিনটি স্থান ও তিন পর্বে কাল অধিক্রমণের জন্য তাঁর ত্রিপাদবিক্রম বা তিন লাফের কল্পনা।

ঋগ্বেদের বর্ণনায় : সূর্যের সুন্দরী বধূ ঊষা, ঊষো যাতি স্বসরস্য পত্নী। ভোরে যখন কৃষক গরু নিয়ে মাঠে যায় তখন প্রেমিকা ঊষার পেছনে অনুধাবন করেন ভালোবাসার কাঙাল সূর্য, যেভাবে সুন্দরী নারীর পিছু নেয় পুরুষ, সূর্যো দেবীমুষসং রোচমানাং মর্ষো ন যোষ্যামভ্যেতি পশ্চাৎ, যত্রা নরো দেবয়ন্তো যুগানি বিতন্বতে প্রতি ভদ্রায় ভদ্রম্। মর্ত্যের এই সূর্যই হলেন অদিতিপুত্র পূষা, বোন ঊষার প্রেমিক। দেবী ঊষার দেখানো পথই এই আদিত্যজনের অনুগমনের পথ।

মহাবিশ্বের এই আলোর যজ্ঞ আকস্মিক কোনও আয়োজন নয়, ক্রমাগত ভোরের পর ভোরের অনুবর্তনে, বিকিরণশীল সূর্যের নিয়মিত পুনরাগমনের মধ্যদিয়ে এসেছে এই উজ্জ্বল অগ্রগতি; আর তারই ধারাবাহিকতায় উন্মোচিত হচ্ছে এই পরমা প্রকৃতি। তাই সৌরশক্তির উৎস সূর্যের স্বরূপ এই মর্ত্যে ঋদ্ধিদাতা দেবতা পূষা রূপেই প্রকাশ। পূষার নামের সঙ্গে ভাষাতাত্ত্বিকভাবে হয়তো পশুর যোগ আছে; সংস্কৃত পূষ্যতি শব্দ থেকে এসেছে পূষা, যার অর্থ পরিপালক, যিনি সমৃদ্ধি দেন, পালন করেন, এক কথায় দৈহিক ও মানসিক পুষ্টির যোগানদাতা। এই দেবতা পশুর সুরক্ষা ও পুষ্টির সঙ্গেই জড়িয়ে আছেন প্রত্যক্ষভাবে। পথেরও দেবতা পূষা, তিনি পথস্পতি, ইহলোকে এবং পরলোকে।

বেদের কবির ভাষায় : পূষার সোনার নৌকা আকাশের নীল সমুদ্রে চলাচল করে, যাস্তে পুষন্নাবোঃ অন্তঃ সমুদ্রে হিরণ্যয়ীরন্তরীক্ষে চরন্তি। প্রাচীন মিশরের সূর্যদেবতা ‘রা’যেমন আকাশে সোনার নৌকায় চলাচল করেন, তেমনি দেবতা পূষাও ভোরে প্রথম আলোর সোনালি বিন্দুটি ফুটে-ওঠা মাত্র শূন্যে নৌকা ভাসান। পূষারূপী সূর্য তাঁর বোন ঊষার সান্নিধ্যে পৃথিবীর মানুষকে আলো আর শক্তির যোগান দিয়ে চলেন।

আমরা জানি সব দেবতাই ঊর্ধ্বলোকের বাসিন্দা। কিন্তু পূষা এমন এক দেবতা যেন কর্মসূত্রেই তাঁর ঠাঁই হলো আমাদের এই মর্ত্যে মাটি ও মানুষের কাছাকাছি, এই গ্রহেই তাঁর বসবাস, মাতা ধরিত্রীর জল-হ্ওায়ায় তিনি আছেন মিশে, তাঁর সব চিন্তা, সমস্ত উদ্যম মর্ত্যবাসীর উত্তরোত্তর ঋদ্ধি আর কল্যাণেই সদা ন্যস্ত; মানুষের দেখ-ভালের দেবতা তিনি, প্রাচুর্য ও বৈভবের প্রতিভূ, মানুষের প্রতিদিনের কর্মধারার বিনিময়ে দান করেন সমৃদ্ধি ও উচ্চতর মানবিক জীবন। বৈদিক ঋষিদের প্রার্থনার অন্যতম উদ্দেশ্যও এই ঋদ্ধি বা অধ্যাত্মপুষ্টি। তাঁদের প্রার্থিত অধ্যাত্মসম্পদ সূর্যের প্রতিদিনের আগমনের মধ্য দিয়ে ঋদ্ধ হয়; পূষা এই ধারণারই রূপ দিয়ে চলেছেন।

ঊষার হাত ধরে পূষার মাধ্যমে মর্ত্যে আসে সমৃদ্ধি, অতীন্দ্রিয় আলো, অপরিমেয় প্রাণশক্তি, নতুন এক সম্ভাবনা। এই ভোরের দেবী তাঁর বিশালতা, তাঁর প্রেম আর স্বর্গের সোনালি বিভা বিলিয়ে চলেছেন প্রেমিক পূষার চেতনায়। কোনও সূক্তে দেবী ঊষাকে বলা হচ্ছে সূর্যের বধূ, কোথাও প্রেমিকা, মা, বোন, আবার কোথাও কন্যা। যেমন, সূর্যা নামে একজন দেবীর উল্লেখ আছে বেদে যিনি সবিতার মেয়ে। আবার এই সূর্যাকেই বলা হচ্ছে ভোরের দেবী, অশ্বিনীকুমারদ্বয় নামে যুগল দেবতার স্ত্রী। জীবনের নিঃসঙ্গতা কাটাতে সূর্যা বিয়ের জন্য বেছে নেন তাঁদের। কিন্তু তাঁর পিতা দেবতা সোমের কাছে মেয়েকে বিয়ে দিতে আগ্রহী; অন্যদিকে, সুন্দরী কনে সূর্যাকে পেতে অন্য দেবতারাও ছিলেন সমান উদগ্রীব। তাই শেষপর্যন্ত সাব্যস্ত হয় সূর্যাকে পেতে হলে দেবতাদের মধ্যে আয়োজন করা হবে স্বয়ম্বর-দৌড়। প্রতিযোগিতায় জিতে যান অশ্বিনীদ্বয়।

পৃথিবীতে দিনের সূচনায় ঊষার আগমনের আগে ভোরের বার্তা নিয়ে আসেন চিরতরুণ দুই উজ্জ্বল দেবতা অশ্বিনীকুমারদ্বয়। সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তে এঁরা ঊষার অনিবার্য সঙ্গী। এই যুগল দেবতা যেন গ্রিক পুরাণের সর্বোচ্চ দেবতা জিউস ও লেডার যমজ ছেলেদের মতো। বেদে অশ্বিনীকুমারদের উদ্দেশে নিবেদিত সূক্ত থেকে এঁরা কে বা কারা সে সম্পর্কে জানা মোটেই সহজ নয়। বেদের ভাষ্যকার যক্ষ নামটির মূলগত অর্থ করেছেন যা ‘শূন্য ভরে দেয়’। তাঁর ভাষ্য : এই যুগলদেবতা সর্বত্রগামী, এঁদের একজন আলো এবং অন্যজন কুয়াশার আকার নিয়ে সবখানে অনুগমন করতে পারেন। অপর একজন ভাষ্যকার বলছেন, এঁরা অশ্বারূঢ় বলে এঁদের নাম অশ্বিন। কোনও কোনও সুক্তে ওঁদের বলা হচ্ছে সূর্যের সন্তান, অন্যরা বলেন, আকাশের ছেলে; কারও ভাষ্যে ওরা সমুদ্রপুত্র। কারও মতে, ওঁরা পৃথিবী ও স্বর্গের মিলনের দ্যোতক, দিন-রাত্রির প্রকৃত সূচক।

তবে আলোর দেবতাদের মধ্যে অশ্বিনীদের অবস্থান, ক্ষমতা ও কর্মপরিধি পুরোপুরি স্বতন্ত্র। এঁরা স্বর্গের দেবতাদের চিকিৎসক; দেবলোকে ওঁদের এমন সুখ্যাতি যে, ভগ্নস্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার, অন্ধের দৃষ্টিদান কিংবা পঙ্গুত্ব নিরাময়ের ধন্বন্তরী চিকিৎসা-ক্ষমতার বহু কাহিনি জড়িয়ে আছে এই দুই দেবতার নামে। অশ্বারূঢ় অশ্বিনীদ্বয়ের সঙ্গে প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় পুরাণের ক্যাস্টর ও পলিডিউসেস চরিত্রেরও রয়েছে কিছু কিছু মিল। পুরাতাত্ত্বিকদের ধারণা, আকাশের তারকামণ্ডলীর মধ্যে এই যমজ নক্ষত্র কোনও অজ্ঞাত কারণে আর্যদের বিশেষ কদর পেয়েছে। গ্রেকো-রোমান পুরাণে সমুদ্রে নাবিকদের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করেন ক্যাস্টর ও পোলাক্স এবং ঝড়ের কবল থেকে জাহাজডুবির সময় তাদের দেন সর্বতোভাবে সুরক্ষা। একইভাবে ঋগ্বেদেও অশ্বিনীদের পাওয়া যায় একই ধরনের ভূমিকায় : জলডুবি থেকে ঋষিদের রক্ষায় এই যমজ দেবতা বরাবরই এগিয়ে আসছেন।

এছাড়া বেদের তিনটি সূক্তে মনোজগতের ওপর তাঁদের অসম্ভব নিয়ন্ত্রণের কথাও আমরা জানতে পাই : এঁরা মায়া বিস্তারকারী, মায়ার ইন্দ্রজাল ছড়িয়ে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম। এঁরা পাখির মতো, বাতাসের মতো এমনকি মনের চেয়েও দ্রুতগামী। পৃথিবীতে দেবী ঊষার গমনাগমনের মধ্য দিয়ে এঁদের দৃশ্যমান রূপ প্রকাশ পায়। ভোরের আকাশে ওঁরাই প্রথম আলোর উদ্গাতা; রাত থেকে ভোরের পানে যাত্রায় ঊষার অন্তর্বর্তী সহগামী অশ্বিনীরা। ঊষার আগমনের আগে ওঁরা মেঘের ভেতর থেকে আলোর সূচনা করে ঊষার গমনপথ উন্মুক্ত করেন। তবে এঁরা রাত থেকে ভোর আর দিন থেকে সন্ধ্যামুখে দাঁড়ানো স্বর্গের যুগল প্রতিনিধি।

অশ্বিনীদ্বয় ঊষাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করার পর সুজলা-সুফলা পৃথিবীর শ্রীবৃদ্ধির শ্রমে পুরোপুরি নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে পূষা হয়ে ওঠেন জগৎসংসারের খাঁটি অভিভাবক। যে-জীবন পৃথিবীর সে-জীবনের সুরক্ষা দেন পূষা। অথচ মর্ত্যবাসী এই দেবতার একটি দাঁতও নেই। তাঁর দাঁত হারানোর কাহিনিটি আছে তৈত্তিরীয় সংহিতায় : একবার দেবতাদের জন্য ভোজসভার আয়োজন করেছিলেন শিবরূপী রুদ্রের শ্বশুর দক্ষ। ভোজের আমন্ত্রণ সব দেবতা পেলেও বাদ পড়েন কেবল দেবতা রুদ্র। এতে তিনি যারপরনাই ক্ষুব্ধ হন। দেবতাদের জন্য উৎসর্গ করা খাবারে প্রচণ্ড ক্রোধে মন্ত্রপূত শর নিক্ষেপ করেন রুদ্র। দেবতা পূষা কিছু না-জেনে সে খাবার মুখে দিলে তাঁর সব দাঁত পড়ে যায়। আবার মহাভারতে পূষার দন্তহীন দশার জন্য রুদ্রকে দায়ী করে বলা হচ্ছে : ভোজসভায় হাজির হয়ে দেবতাদের মধ্যদিয়ে সরোষে ছুটে চললেন রুদ্র, খাবার খেতে দেখে প্রথমেই প্রচণ্ড আঘাতে চোখ তুলে নিলেন দেবতা ভগের, তারপর পদাঘাতে সব দাঁত ভেঙে দিলেন পূষার।

প্রতিদিন ঊষার সূচনামুহূর্ত থেকে দন্তহীন এই দেবতার কর্মব্যস্ততা শুরু; ষাঁড় তাড়ানোর লাঠি হাতে, ছাগলে-টানা শকটে চেপে তিনি বেরিয়ে পড়েন পথে, তাঁর পথচলার মধ্যদিয়ে সমগ্র সৃষ্টির মাঝে ঘটে ঊষার উজ্জ্বল বিস্তার, তখন সবকিছুই সবার দৃষ্টির সামনে হয়ে পড়ে সমান উন্মুক্ত, জীবের গোচরে আসে বহু বর্ণের জগৎ-চরাচর, এভাবে আলোর বৈভবে পুষ্ট হয় পৃথিবীর প্রাণ, সমৃদ্ধি আসে মানুষের ভেতর ও বাইরের বিশ্বে। তাই এই মর্ত্যে প্রকৃত ঋদ্ধি নির্ভর করে ভোরের দেবী ঊষা ও দেবতা পূষার চির অনিঃশেষ প্রেমে, দু’জনের চিরকালীন সম্পৃক্তির ওপর; পূষার চোখ দিয়েই যেন সবকিছুর প্রকাশ ঘটান ঊষা, আবার ঊষা নিজেও বিকিরণশীল আয়ত এক চোখ, প্রেমিক পূষার দিকে প্রতিদিন বাড়িয়ে দেন তাঁর সম্প্রীতির আলোকিত হাত, সকল আলোর সর্বোচ্চ আলো– অনিবার প্রেম।

ঋগ্বেদের যুগে ভাইবোনের নিষিদ্ধ সম্পর্ক বা প্রণয় নিয়ে কড়াকড়ি বা তেমন একটা কুণ্ঠা ছিল না। ঊষাকালের ইন্দো-ইউরোপীয় আদি ধর্মমতগুলো যৌনতা, যৌনাচার বা মানুষের স্বাভাবিক সম্পর্কের বিকৃতি নিয়ে ততটা আড়ষ্ট হয়ে পড়েনি, সমাজদেহে তখনও শুরু হয়নি ধর্মীয় প্রলেপে নৈতিকতার ঠুলি পরানো। যেমন, মৈত্রায়ণী সংহিতায় যম-যমী সূক্তে ভাই-বোন ও নাভানেদিষ্ঠ সূক্তে পিতা-কন্যার আসক্তি ও মিলনের কাহিনি আছে। যম-যমী ভাই-বোন, আবার প্রণয়ী-প্রণয়িনী, যমের মৃত্যু মেনে নিতে না-পারায় যমীর শোকবিলাপ অবসানে দেবতাদের রাত্রি সৃষ্টির কাহিনি যেন ওই সময়ের সর্বজনস্বীকৃত একটি সামাজিক তথ্য।

বাইবেলের ‘সঙস অব সলোমন’-এর কাহিনিও ভাই-বোনের প্রণয়ের উপাখ্যান ; এতেও প্রণয়িনীর বিরহের আকুতি রূপ পেয়েছে অমর শোকগাথায়। এই কাহিনির অতি প্রাচীন এক সংস্করণ রয়েছে সুমেরীয় দেবকল্পনায় : ইনান্না দেবীর প্রেমিক ছিলেন দুমুজি। দুমুজির মৃত্যুর পর দেবী ইনান্না কেঁদে কেঁদে তাঁর খোঁজ করে বেড়ালেন, দুমুজির সন্ধানে পরলোকে দেবসভায় উপস্থিত হয়ে দেবী তাঁর জীবনভিক্ষা করলেন : দুমুজি জীবন ফিরে পেলেন। আসিরীয় কাহিনিতে এই দেবীর নাম ইশতার আর তাঁর প্রেমিক হচ্ছেন তম্বুজ। কিন্তু এরও পেছনের অতীতে ভাই-বোনের প্রেমের কাহিনি আছে মিশরীয় দেবকথায়, ‘বুক অব ডেড’-এ। অসিরিস-আইসিস উপাখ্যানে সেই একই ভাই-বোনের প্রেম। স্বার্থান্ধ ভাই সেথের চক্রান্তে প্রাণ হারান অসিরিস। যিশুর জন্মেরও দেড় হাজার বছর আগের আমেনমোসের গাথায় আছে : শোকার্ত আইসিস চিলচিৎকারে কেঁদে কেঁদে ফিরলেন মৃত অসিরেসের পুনরুজ্জীবনের আশায় গোটা মিশরে।

একজন প্রেমিক যেভাবে তার প্রেয়সীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের জন্য বা মিলন-আকাক্সক্ষায় সারাক্ষণ থাকে স্বপ্নে বিভোর, পূষাও তেমনি ভোরে ঊষার উষ্ণ সান্নিধ্য পাবার আশায় থাকেন গভীর নিমগ্ন। রাতের অন্ধকারে বহু দূরে পৃথিবীর ছায়ায় বসে পূষা থাকেন তাঁর দীপ্তিময়ী বোনটিকে সাদরে বরণের অপেক্ষায়; ঘন তমসায় খোলা আকাশের নিচে বুকের ভেতরে তাঁর জ্বলে প্রেমের চিরঞ্জীব একটি শিখা; নক্ষত্রের ঝিলমিল আর চাঁদের উজ্জ্বল পদক্ষেপ ভোরের আগে তাঁর প্রত্যাশায় দিয়ে যায় আলোর ইশারা, রাতের গভীরে তাঁর জাগরণ যেন সত্য আর প্রেমের সম্ভাবনায় পূর্ণ। কেননা তাঁর সত্যের ধারণা সতত আলোর দেবী ঊষার সঙ্গেই যে জড়িয়ে আছে। সত্যের আসন থেকেই ঊষার উত্থান। সোনার আলোয় জেগে-ওঠা এই দেবী সত্যের সমুজ্জ্বল এক রূপ, খুলে দেন সর্বোচ্চ আলোর দুয়ার।

তাই দিবা-রাত্রির এই ছন্দ, ঊষা-নক্ত’র এই পালাবদল চিরন্তন—আলো-অন্ধকারের খেলা চলছেই; এভাবে মানুষের চেতনায় নিরালোকের শুরু, আবার আঁধার পেরিয়ে এসে ওরা চোখ মেলছে নবীন আলোয়, যত দিন পুনরাবির্ভূত হচ্ছে প্রতি ভোরে দেবদুহিতা ঊষা। বেদের কবিরা প্রত্যুষের এই দেবীর রূপ বর্ণনা করেছেন : সুসংকাশা মাতৃমুষ্টেব যোষাবিস্তন্বং কৃণুষে দৃশে কম্, যেন মায়ের নিজের হাতে সাজিয়ে-গুছিয়ে দেওয়া সুরূপা কন্যাটি, সবার দৃষ্টির সামনে নিজের তনু প্রকাশ করছে। তখন মনে হয় অদিতিকন্যা ঊষা যেন রাতের আকাশে অবগাহন শেষে তাঁর সমস্ত শুভ্র উজ্জ্বলতা নিয়ে নেমে আসছেন ধরায়।

একটি ভোর থেকে পরবর্তী ভোরের আগমনের মাঝে যেটুকু সময় জুড়ে অন্ধকার আর অজ্ঞানতার ব্যাপ্তি তা বেদে সূর্যের অন্তর্ধানকাল হিসেবে চিহ্নিত। এছাড়া সূর্য বা ঊষাকে পণী নামে দানবদের চুরি বা অপহরণের ঘটনার বহু উল্লেখ আছে বেদে ও পুরাণে। পণিরা সুযোগ পেলেই পৃথিবীর মানুষের গবাদিপশু বা আলোকসম্পদ চুরি করে নিয়ে গিয়ে তাদের অন্ধকার গুহার মধ্যে লুকিয়ে রাখতো। পুরাণে ঊষাকে দানবদের চুরি করে নিয়ে যাওয়ার এমনই এক কাহিনিতে দেখা যায় ঊষার উদ্ধার-অভিযানে দেবরাজ ইন্দ্রের সহযোদ্ধা ছিলেন তাঁরই ভাই দেবতা পূষা। পণিদের গুহার আঁধারে লুকোনো আলোর দেবীকে পূষাই উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। একই ভাবে নিরাপত্তা ও পশুসম্পদ রক্ষায় পূষাই মর্ত্যবাসীর নিয়ত ভরসা।

আলো-আঁধারের এই পুনরাবৃত্তি, নিরন্তর চলমান সৌরতার এই চাকা, পথের এই ভাবরূপটি ঊষা-পূষার প্রেমের সঙ্গেই যুক্ত। এই প্রেমই তাঁদের বেঁধেছে মহাকালে, মহাপৃথিবীর অনিঃশেষ পথে। বেদে এই পথটি সদাসর্বদাই সত্যেরই পথ, পূর্ণ সত্যের দিকে আনন্দময় এক অভিযাত্রা। তাই বেদের ঋষিরা তাঁদের অন্তর্গত আলোকময় পথে রথী হবার জন্য দেবতা পূষার প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান ভোরে। বেদে জ্ঞানমার্গের সঙ্গে পথের ধারণাকে তাই এক করে দেখা হয়েছে। পূষা পথের প্রভু, বেদের ঋষিরা তাঁদের ভাবনারথের চালক হিসেবে জুড়ে দিয়েছেন তাঁকে; পূষা মানুষের পথ বাতলে দেন যাতে তাদের ভাবনা সঠিক পথে এগিয়ে পূর্ণতা পায়।

অন্যদিকে, প্রেমিক পূষার মতো ঊষাও পথের সব অন্ধকার ও শত্রুকে তাড়িয়ে দিয়ে মানুষের জন্য সুখী ও সহজ যাতায়াতের পথ নিশ্চিত করেন। তাঁর পথ আলোকময় পথ, সত্যের জোয়ালে বাঁধা অশ্বরথে চড়ে সে পথে গমন করেন তিনি; সত্যের আলোয় উদ্ভাসিত এই দেবী সত্যের ধারক, নিজেও নিখুঁতভাবে অনুসরণ করেন সত্যের পথ। কারণ তিনি আলোকিত পথের বৃহত্তর এক সত্য, প্রকাশিত হন তাঁর প্রেমময় উজ্জ্বল জগতে।

কিন্তু এই অনিন্দ্যসুন্দরী ঊষার অসম্ভব নির্লিপ্তি ও নিষ্ঠুর একটি দিক চোখ এড়ায়নি ঋগ্বেদের কবিদের। তাঁরা বারবার এই ভোরের দেবীর সৌন্দর্য ও নিষ্ঠুর সত্তার বিপরীত ও দ্বান্দ্বিক রূপেরও আভাস দিয়েছেন। যে দেবী জীবজগৎকে আলোর পুষ্টি দিয়ে পালন করেন, প্রতিদিন যাঁর আগমনে, যাঁর আলোর পরশে মর্ত্যরে মানুষের এত সমৃদ্ধি, সেই অপরূপা দেবীই প্রতিদিন মানুষের আয়ু নিঃশেষ করে চলেছেন; মানুষের সবকিছুকে জীর্ণ ও পুরনো করে তুলছেন। একটি নতুন দিনের মধ্যদিয়ে বিগত দিনের অবসান ঘটিয়ে প্রতি ভোরে ঊষা পরমায়ুর ক্ষয় সূচিত করছেন; ঝরে পড়ছে জীবনগাছের শুকিয়ে হলদে হয়ে-ওঠা আয়ুর পাতা। একটি ঊষস্-সূক্তে কী প্রবলভাবেই-না ঊষার এই নিষ্ঠুরতাকে, মানুষের দুঃখান্ত পরিণতির রূপকে সামনে এনেছেন কবি। কবি বলতে চান ঊষা নিজে চিরতরুণী অথচ মানুষকে সুন্দরী এই দেবী প্রতিদিন জরা, অক্ষমতা আর অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, কান্তিমতী শুভ্রবসনা এই দেবী একদিকে যেমন মনোলোভা, তেমনি অন্যদিকে অনায়াস নির্লিপ্ততায় তিনি মানুষকে একদিন একদিন করে মৃত্যুর পথে এগিয়ে দেন, আ ঘা যোষেব সুনর্যুষা যাতি প্রভুঞ্জতী জরয়ন্তী বৃজনম্। পুনঃ পুনঃ উদিত হয়ে পুরাতনী ঊষা একই রূপমাধুর্য নিয়ে প্রতিদিন প্রকাশিত হচ্ছেন কিন্তু যেমন করে ব্যাধের স্ত্রী শিকার করা পাখির ডানা দুটি ছিঁড়ে দেয়, তেমনি এই সুন্দরী ঊষা মর্ত্যবাসীর আয়ু ক্ষয় করছেন, পুনঃপুনর্জায়মানা পুরাণী সমানং বর্ণমভিশুম্ভমানা, শ্বঘ্নীব কৃতুর্বিজ আমিমানা মর্তষ্য দেবী জরয়ন্ত্যায়ুঃ। ঊষার চিরযৌবনের সঙ্গে মানুষের অনিবার্য পরিণতির এই উপলব্ধি বৈদিক কবিকল্পনায় যোগ করেছে এক ভিন্ন মাত্রা।

সূর্যের মধ্যে আর্যরা দেখেছিল এক পরম আশ্বাস, নির্ভরতা, স্থিতি ও ঋদ্ধি। তাদের কাছে স্থাবর ও জঙ্গমের আত্মা ছিল সূর্য, সমস্ত আলোর সর্বোচ্চ আলো। তাই সূর্যরূপী দীপ্যমান পূষার কাছে ওরা যেমন চেয়েছে প্রাচুর্য, বিত্তবৈভব আর তাদের যুদ্ধাশ্বের সুরক্ষা, তেমনি আসন্ন প্রতিটি ভোরে সূর্যস্নানে দেহ ও আত্মার শুচির জন্য ওরা চেয়েছে উজ্জ্বল আলোর নিশ্চয়তা। তাদের প্রার্থনার অন্যতম উদ্দেশ্যই ছিল অধ্যাত্ম-আলোর পুষ্টি, জীবনে প্রকৃত আনন্দের উচ্চতর মনোভূমিতে নিয়ত প্রবেশাধিকার; যে আলোয় পার হয়ে আসা যায় অন্ধকারের অপর তীরে।

 

সহায়সূত্র : দ্য সিক্রেট অব দ্য বেদ, শ্রীঅরবিন্দ। প্রাচীন ভারত : সমাজ ও সাহিত্য, দ্য ইন্ডিয়ান থীয়গন, লিটেরেচার ইন দ্য বেদিক এইজ, সুকুমারী ভট্টাচার্ । ক্ল্যাসিক্যাল ডিকশনারি অব হিন্দু মিথোলজি, প্রফেসর ডাউসন। হিন্দু প্যান্থিয়ন, স্যার উইলিয়াম জোন্স।