Home Uncategorized ব্যক্তিগত ইশতেহার সামষ্টিকও হতে পারে । সেলিম মোরশেদ ।। ইশতেহার

ব্যক্তিগত ইশতেহার সামষ্টিকও হতে পারে । সেলিম মোরশেদ ।। ইশতেহার

ব্যক্তিগত ইশতেহার সামষ্টিকও হতে পারে  ।  সেলিম মোরশেদ ।। ইশতেহার
0
0

বই : স্বপ্নের সারসেরা [ছোটকাগজ আন্দোলনের ২৫ বছর] / ২০১০, উলুখড়।।

ইশতেহারটি প্রকাশিত হয়েছিল:

প্রতিশিল্প / সংখ্যা ২, নভেম্বর ১৯৯৪ ।

    বই: পাল্টা কথার সূত্রমুখ অথবা বুনো শুয়োরের গোঁ

/ ডিসেম্বর ২০০২/প্রকাশনা : প্রতিশিল্প।।

 

এক : ইতোমধ্যে শিল্পী-সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী উন্নতপাঠক ও গুণী দর্শক-শ্রোতা আর সকল ক্ষেত্রের সম্মানিত শিল্পী এবং শিল্পের অনুসারীরা লিট্ল ম্যাগাজিন (ছোটোকাগজ) মুভমেন্টকে সৃজনশীলতার শক্তি হিশেবে স্বীকার করেছেন।

দুই : বাংলা ভাষায় বিশেষ করে পশ্চিম বাংলার লিট্ল ম্যাগাজিনের তীব্র গতি-প্রকৃতি বহুদিন থেকে রীতিমত বাণিজ্যিক-সাহিত্য-প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অব্যর্থ তীরের মতো লক্ষ্যভেদী হয়ে আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। একদিকে কথিত সম্ভ্রান্ত বাবুদের হাতে তৈরি হওয়া বাণিজ্যধর্মী নানা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান— অন্যদিকে, প্রগতিবাদের লেবাস পরা এক রাজনৈতিক শক্তি আর পাশাপাশি রক্ষণশীল পশ্চাৎপদ অন্য একটি দল— এই সবগুলির বিরুদ্ধে পশ্চিমবাংলার অগ্রগামী জনগণ দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ করে আসছে।

ঐতিহাসিকভাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্য-নীতি পরবর্তী নানান সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ভেতর দিয়ে পশ্চিম বাংলার মধ্যবিত্ত সমাজ তিনশ বছর পার করেছে। এই-মুহূর্তে তাদের ওপর সামাজিকভাবে প্রভাব বিস্তার করছে মাড়োয়ারী পুঁজি। এই মাড়োয়ারী পুঁজির বিরুদ্ধে আর বাবু কালচারের বিরুদ্ধে বিরামহীন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে সারা ভারতের লিটল ম্যাগাজিন।

তিন : যুগে যুগে, কালে কালে, সারা পৃথিবীতে রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তনের প্রশ্নে আর নব্যদর্শনের লক্ষ্যে সৃজনশীল অধিকাংশ লেখকই, সারা পৃথিবীর নিজেরা কাগজ বের করে স্বাধীন মতামত প্রকাশ করেছেন— তা হয়েছে কখনও-বা গোষ্ঠীবদ্ধ কখনও-বা একক।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিক থেকে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা এবং আমেরিকার দার্শনিক এবং শিল্পী-সাহিত্যিকরা নিজস্ব দর্শন আর নতুন বিষয় এবং আঙ্গিকের নিরীক্ষণ প্রয়াসে তাদের নিজস্ব মুখপত্র বের করেছেন। এ পর্যন্ত পৃথিবীতে যতোগুলি শিল্প আন্দোলন হয়েছে তাদের আন্দোলনগুলি এগিয়েছে মুনাফাবিহীন নিজস্ব মুখপত্রের মাধ্যমে।

চার : দীর্ঘদিন ধরে আমাদের শত্রু মহল যারা সংস্কৃতির সঙ্গে শাখামৃগের মতো সম্পৃক্ত হয়ে ঝুলে আছেন, না-তারা লেখক হতে পেরেছেন বা পৃষ্ঠপোষক। ফলত ক্ষতিকর হয়েছেন তারা এই কারণে যে, তাদের এই ব্যর্থতা অন্যের সৃজনশীলতা থেকে আপনকার বিস্মিত হবার ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে। এরা প্রায়শই বলে বেড়ান এই যে, তোমাদের লিটল ম্যাগাজিন যে বের হয় সেখানে তো বিজ্ঞাপন নাও, সেটা বিক্রি করো, সেটা কি মিডিয়া না? সেটা কি প্রাতিষ্ঠানিক বিষয় না?

অনুধাবন করা যায়, তারা যথেষ্ট অগভীর, অনুসন্ধিৎসাবর্জিত; তারা কি জানেন না বাণিজ্য কী? তারা কি বোঝেন না পণ্যের নৈমিত্তিক উৎপাদন (বাণিজ্য আর অবাণিজ্যের-এর প্রকৃতিসমূহ। তারা নিশ্চয়ই জানতে চান না— উদ্বৃত্ত পুঁজি ও দুর্বৃত্ত পুঁজির নির্ধারিত প্রক্রিয়া। এই পুঁজিই শোষণের জন্ম দেয়। কেননা কর্মের মুনাফা তখন মূল লক্ষ্য। ছোটো কাগজ বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী লিট্ল ম্যাগাজিন কখনোই মুনাফালোভী মাধ্যম হিশেবে প্রকাশিত হয় না। এটা ঐতিহাসিকভাবে সত্য।

পাঁচ : অবশ্যই মাল্টিন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন ছোটো কাগজে ছাপা হবে না। জাতীয় পুঁজি (টার্মটা এক অর্থে ভুল) না বলে বরং জাতীয় আয় বলি; সেই জাতীয় আয় আমাদের বৃদ্ধি হয়েছে কম্পিউটারের সফটওয়ার আর গার্মেন্টস থেকে। আমরা প্রতিটা কম্পিউটার সংস্থা এবং গার্মেন্টস সেক্টর থেকে বিজ্ঞাপন নিতে পারি সম্মিলিতভাবে।

ছয় : যা তেজোদীপ্ত, অযাচিত, উপযুক্ত অথচ মনে হয় আপাত অনাকাঙ্ক্ষিত এসবই (লেখা) ছোটো কাগজের বিষয় এবং আঙ্গিকের সাথে সম্পর্কযুক্ত। ওই অজ্ঞরা জানে না দুনিয়ায় মিথের প্রথম দুইজন আদম এবং ইভের মানসিক, শারীরিক এবং সামাজিক প্রত্যয়ের প্রথমে এবং নিগূঢ় স্পন্দন— যার সংযুক্তি লিট্ল ম্যাগাজিন ধারণা করে চলেছে।

ডারউইনে সেই কোকিল যে নিজে প্রবল সংযোগে কিংবা সঙ্গমে অন্যকে আহবান করে যে গানটি গেয়ে ওঠে তা নিশ্চিত লিট্ল সঙ্।

সাত : সৃষ্টির আদি লগ্ন থেকে পৃথিবীর দুর্ধর্ষ আর দুর্বিনীত কিম্বা পরাজিত বা শোষিত এ দু’শ্রেণীর মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে আত্মস্থ করে ছোটো কাগজ এগিয়ে যায়। মাঝামাঝি যেসব মানুষেরা, যারা সুবিধাবাদী শ্রেণী যাদের সুখ, দুঃখ, আশা, আনন্দ, ভালবাসা, কান্না, প্রেম, আত্মত্যাগ— যা ঝুমুর তালের মতো তাৎক্ষণিক তারা মধ্যবিত্ত শ্রেণী, তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মূল চরিত্রের হয় না তারা পার্শ্ব চরিত্রের। পৃথিবীর প্রথম সঙ্গীত, পৃথিবীর প্রথম চিত্রকলা যখন শুরু হয় বা সৃষ্টির সূত্রপাত ঘটে তখন তা নিরঙ্কুশ ছিল লিট্ল কিন্তু ক্রমে ক্রমে যখন তা প্রথা মুনাফালোভী ব্যক্তিস্বার্থের ব্যক্তিবিকাশের (অর্থনৈতিক) দিকে এগোতে থাকে তা শেষ পর্যন্ত লিট্ল চরিত্র হারিয়ে বৃহত্তম গণ্ডির আবর্তে বাণিজ্য বিকাশের রূপ নিয়ে সর্বগ্রাহী হয়ে মূল চরিত্র হারিয়ে ফেলে।

আট : মুনাফালোভী সংস্কৃতিবানরা দীর্ঘদিন ধরে আমাদের হাতের আঙুরের মতো অঙুলিগুলো চিবিয়ে খাচ্ছে এবং কখনও কখনও আমরা পক্ষান্তরে সময় নির্ধারণ করতে অপারগ হয়েছি; কেননা তারা আমাদের করগুলো খেয়ে নিয়েছে। এই ছোটো কাগজ যারা করেন কোনো-না-কোনোভাবে তারা চলতি সব কিছুর বিপরীত। তারা প্রথা বিরোধী। অন্তত শতকরা আশি ভাগ লেখক-কর্মীরা বড়ো বড়ো প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধ ভাঙেন। ছোটো কাগজ আন্দোলনের একজন লেখকের ব্যক্তিগত জীবনপ্রক্রিয়াও জটিল হয়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধগুলোকে ব্যক্তিজীবনেও ভাঙতে হয় তাকে। লেখক প্রতিষ্ঠানবিরোধী হয়ে ওঠেন।

‘রবীন্দ্র সাহিত্য পরবর্তী কমার্শিয়াল পোঁদ-ঘষাঘষির পাশপাশি বাংলা ভাষার লিট্ল ম্যাগাজিন মুভমেন্ট সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে।

সাতশ বছরে বাংলা ভাষার ইতিহাসে সুবিমল মিশ্রের মতো এতো ব্যাপক বেপরোয়া এবং গঠনমূলক ভাঙাচোরা আর কেউ করেননি।

বাংলাদেশে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পর জসীমউদ্দীন, ফররুখ আহমেদ, আল মাহমুদ, শোয়েব শাদাব, আহমেদ নকীব— এই ভূখণ্ডের কবিতার ভাষাশৈলী নির্মাণ করেছেন, তারা নিজস্ব অভিব্যক্তি প্রদানকারী, তাদের হাতে দিকনির্ণীত হয়েছে। যদিও ভাষার সাম্প্রদায়িকতায় আমরা বিশ্বাসী না, তথাপিও তাঁরা একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের নব্য গন্তব্য।

বিগত কয়েকশ বছরের শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান— এটা আমরা বিশ্বাস করি আর গত ৭০ বছরের শ্রেষ্ঠ সংগীতশিল্পীর মর্যাদা দিতে চাই আব্বাস উদ্দিন এবং আব্দুল আলিমকে।

নয় : সৌন্দর্যবোধ ও রসবোধ জীবনের সুগভীর অতলস্পর্শী কেবল কোনো কিছু, কিম্বা শিল্পে কেবলমাত্র এই দুটো প্রয়োজনীয় বিষয়— শুধু কী তাই? এর ভেতর কি নিহিত থাকে না মানুষের দায়ভার তৈরি হওয়ার একটা মূল্যবোধও? আর্ট ফর আর্টসেক আর লাইফসেক এই দুটি টার্মস দীর্ঘদিন ধরে এই পরস্পরের সম্পূরক বলে আমি মনে করি। আর্ট ফর আর্টসেক জীবন বাদে কতটুকুই-বা এগুতে পারে? আবার আর্ট ফর লাইফসেক আর্ট বহির্ভূত কী এমনই-বা করবে? জীবনের কোনো কোনো অংশে শিল্পীর নিগূঢ় সচেতন প্রয়াস আনবে— এইতো! আসলেই অনুসন্ধান কোথায়? লিবার্টি। প্রবল স্বাধীনতা। হ্যাঁ, ফ্রিডম চাই। কোনো ম্যানেজের ওপর শিল্প দাঁড়ায় না। অথচ বাণিজ্যধর্মী মিডিয়াতে যে আর্ট হাইলাইট হচ্ছে; লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সচেতনভাবে অসচেতনের ভূমিকা নিয়ে স্বতঃস্ফূর্ততার নামে কৌশলে তৈরি করে। বাজারী শিল্পকরণিকদের ব্যক্তিমূল্য নেই। যা আছে তাদের কাছে নিজেদের বিনিময় মূল্য।

দশ : রবিঠাকুরের কাছে আমাদের ঋণ আছে সত্য, গদগদ তেমন কিছু নয় তাই বলে, সুরস্রষ্টার চিরকালীন এক মর্যাদাবান শিল্পী তিনি। তাঁর বাণী আর তাঁর গান আর এর অন্তর্নিহিত অনুসন্ধান আমাদের নিয়ে যায় হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ এক মহান শিল্পী লালনের অভিমুখে।

এগারো : যারা নিয়মিত বাণিজ্যিক কাগজগুলোয় লেখে (অবশ্যই তাদের লেখা নান্দনিক একটা মান স্পর্শ করে), প্রতিষ্ঠান হাতের পাঁচ হিশাবে তাদের লেখা নিয়ে বলে, ভালো লেখাটাই বড়ো কথা। আর লেখকরা বলেন, আমাদের লেখার দাঁড়ি, কমা, সেমিকলন যদি হুবহু ছাপে তবে আপত্তি কেন। আমরা আমাদের ব্যাপক রিডারদেরকে বঞ্চিত করবো কেন? জনগণের কাছে সঞ্চিত থাকতে গিয়ে কী পরিমাণ লেখক নিজেই লাঞ্ছিত হন, তা বলাই বাহুল্য। এই লেখকরা সাহিত্য সম্পাদকদের মুখের দিকে তাকিয়ে লেখেন। আহসান হাবিব ছাড়া এ যাবত কোনো উপযুক্ত এবং সৎ (যদিও এই টোটাল প্রক্রিয়ায় কোনো সৎ বা উপযুক্ত সাহিত্য সম্পাদক হবার কথা নয়) কোনো সাহিত্য সম্পাদক নেই। যারাই সাহিত্য সম্পাদক কোনো-না-কোনোভাবে লেখালখির জগতে তারা ব্যর্থ।

এদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করলে আপনার লেখা তখন নিন্দনীয় হয়ে উঠবে; সমসাময়িক একজন দুর্বল লেখককে দুর্দান্ত বিশ্লেষণে শিল্পী বানিয়ে এরা বিভ্রান্ত রুচির জন্ম দিয়ে আপনাকে ছোটো করে রাখবে। আমরা জানি, বিগত বিশ বছরে মধ্যবিত্ত জ্ঞানে-বিজ্ঞানে-দর্শনে ব্যুৎপত্তি লাভ করেছে। তার জীবনপ্রক্রিয়ার ভেতর, বাস্তবতার ভেতর অনেক সপ্রতিভ অভিব্যক্তি রপ্ত করেছে— এই সব করলেও শিল্প-সাহিত্যের টেস্টের ক্ষেত্রে ওই পুতুপুতু— ধরা, বন্দি হওয়া, ঘোরে-পড়া, এমন ধরনের শিল্পর্কম পছন্দ করে; তাদের তরল রুচি বলবো আমরা। কমিউনিকেটিং লেখা পাঠকরা চায়—পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক আর মালিকরা এই কথা বলে ৮০ মিনিটে শেষ হওয়া একটা দৈনিকের সাময়িকীতে ২০ মিনিটের জন্যে কমিউনিকেটিং গদ্য, কবিতা ছাপে। অনেক সময় বিনিয়োগ হিসাবে আধা-সিরিয়াস লেখা দুই-একটা ছেপে অজস্র বস্তাপচা লেখা ছাপার যৌক্তিকতাকে জায়েজ করে। এটা মোদ্দা কথা যে আমাদের দেশে বুর্জোয়ারা কোটি কোটি টাকা দিয়ে খবরের কাগজ বের করে কেন? এক: তাদের ব্যবসা এবং কালো টাকার ঢাল হিশাবে কাগজটি ভূমিকা রাখে— দুই: এখান থেকে প্রচলিত মূল্যবোধের ওপর ভর করেই সে ব্যবসা করে। একটা বাণিজ্যিক মিডিয়া হাজারটা সিস্টেমের ভেতর দিয়ে চলে। এই সিস্টেমের বিরুদ্ধে আপনার রয়েছে ক্ষোভ। সেই ক্ষোভ আপনি লেখক হিশাবে কীভাবে প্রকাশ করবেন দৈনিকের পাতায়? প্রবীণ লেখকরা বলেন, ক্ষোভ খুব ছোটো জায়গায় থাকে। বাণিজ্যিক মিডিয়ার লেখকেরা বলেন, শিল্পিত করে ক্ষোভ প্রকাশ করলে বিরোধ কোথায়? কতোটা সুবিধাবাদী দেখুন তারা, ক্ষোভ নিয়ে সবসময় লিখতে হবে এমন কথা বলছি না। তবে ক্ষোভ শিল্পিত করে লিখতে হবে? এমন ধারা মাথায় নিয়ে তারা লিখতে বসেন। দেখুন, কারা সচেতনভাবে অচেতন এবং স্বতঃস্ফূর্ত লেখার ভান করে— এঁরা!

অনেক লেখক আছেন, বাণিজ্যধর্মী কাগজের সাহিত্য পাতায় লেখেন, যে-লেখাগুলো সাহিত্য সস্পাদক কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয় সেগুলো দিয়ে নিজেরা ম্যাগাজিন বের করে তাকে লিট্ল ম্যাগাজিন বলে দাবি করেন। এরা দুধ-তামাক দুটোই খান। এরা আমাদের বন্ধু না। বরং আমাদের গতিপথে বিভ্রান্তকারী।

অনেকদিন ধরে আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে যে, এরা সাধারণ মানুষের জন্যে লেখে না। এ কথা একদম সত্য না। আমরা ফাইট করছি মিডিয়ার বিরুদ্ধে, গলিত-পচিত সিস্টেমের বিরুদ্ধে, মানুষের বিরুদ্ধে না। জনগণের জন্যে হালকা বিনোদনসর্বস্ব বিষয়টাকে সরিয়ে মূলত জীবনে সৌন্দর্য সৃষ্টির জায়গাটা নিছক এন্টারটেইনমেন্ট না হয়ে এসথেটিক প্লেজারের মাধ্যমে জনগণের চিন্তন প্রক্রিয়াকে এ্যাডভান্সড করানোর একটু সূক্ষ্ম দায়িত্ব লেখকের থাকে বলে আমরা মনে করি।

বারো : পেশা : মানুষের ব্যক্তিত্বের ওপর পেশার ছাপ পড়ে। এটা সবাই জানে। একটা সোসাইটি যখন পলিউটেড হয় তখন একটা শিশুও তার দায়ভার থেকে বাঁচতে পারে না। সে যে কৌটোর দুধ খায় তা অনেক ক্ষেত্রে নানা দুর্নীতির ভেতর দিয়ে আসে। সেখানে পেশা নির্ধারণ করা মুশকিল। তবে যা সরাসরি ছোটো কাগজ মুভমেন্টকে ক্ষতি করে এমন পেশা থেকে দূরে সরে থাকবো। প্রশ্ন— চারপাশে চলমান যে প্রথা তার প্রতি বিরোধটা কেন? ব্যক্তিগত জীবন-যাপনে একটা পর্যায় পর্যন্ত আমরা নানামুখী প্রভাবময় এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল হয়ে জীবন ধারণ করতে পারি— যদি আমরা চলমান মূল্যবোধকে মেনে নিই। এই প্রথাকে পুরোপুরি মেনে নিই। কিন্ত একজন সচেতন লোক কেন এটাকে মেনে নেয় না? কেন? কারণ তার ব্যক্তিগত সুখগুলো সে যে প্রক্রিয়ায় অর্জন করে তা নৈতিক এবং সুন্দর না— তা এই কারণে যে, অন্যের রেশনিং কেটে সে অদ্ভুত দায়-দায়িত্বহীন মনোবৃত্তি নিয়ে একটা কথিত স্বস্তিদায়ক জীবনের পেছনে ছুটতে থাকে। এটা ক্রাইম। এক পর্যায়ে যে ক্রাইম করেছে সে নিজেও তা বিশ্বাস করতে চায় না। অধিকাংশ মূল্যবোধ যেগুলো নিয়ে চলমান প্রথা তৈরি হয়েছে তার পেছনে রয়েছে এক্সপ্লয়টেশন। কায়েমী স্বার্থান্বেষীরা তাদের প্রয়োজনে এই প্রথা টিকিয়ে রেখেছে। যার বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেলে সপাং সপাং চাবুক খেতে হচ্ছে। এই যে এক্সপ্লয়টেড হওয়ার সিস্টেম এরই জোটফল নিয়ে স্টাবলিশমেন্ট হয়। এটাই প্রতিষ্ঠান। ফলে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা একটা মনোভঙ্গি, একটা আ্যটিচ্যুড, একটা নিরন্তর কোশ্চেন, নিজেকে ভাঙ্গা, নিজের বিরুদ্ধে লড়া, নিজস্ব রুচি তৈরি করা। আর তার প্রয়োজনে নিজস্ব নন্দনের প্রয়োজনীয়তা বোঝা।

তেরো : বহুলোক মনে করেন অপেক্ষাকৃত সৎভাবে সচ্ছল থাকাটাও বোধ হয় প্রাতিষ্ঠানিক জীবন-যাপন। তারা মনে করেন, না খেয়ে থাকা, উস্কোখুস্কো চুল, আর অপরিষ্কার প্যান্ট-শার্ট পরে সারাদিনক্ষণ উঞ্ছবৃত্তি আর গাঁজা-মদ-হেরোইন আসক্ত থেকে, কোনো যূথবদ্ধ শ্রমের সাথে যুক্ত না থেকে জীবন পারাপারই বোধহয় প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা। আমাদের কাছে এগুলোকে অনেক সময় প্রতিবাদের মতো মনে হলেও এগুলো আসলে ক্রেজ। ঠিক কোথায় আঘাত করতে হবে আমরা সেই লক্ষমুখ সনাক্ত করবো ক্রিয়েটিভ এক্সপ্রেশান দিয়ে। ফলে একজন প্রতিষ্ঠানবিরোধী যথেষ্ট সচেতন। শুনে রাখুন, সচেতনতাকে প্রতিষ্ঠান একদম পছন্দ করে না। আপনাকে কম বুদ্ধির লোক করতে পারাই তার লক্ষ্য। অবোধ-আজগুবি-উদ্ভট-কথিত কল্পনাকে প্রতিষ্ঠান তারিফ করে তার ওপর লেবাস লাগায়। একজন প্রাতিষ্ঠানিক লেখক একবার আমাদের বলেছিলেন, একজন পাগল তোমাদের চেয়েও প্রতিষ্ঠানবিরোধী। কেননা সে এই সমাজে সবকিছুতে উদাসীন। বোঝা যায় পাগলের উদাসীনতা প্রাতিষ্ঠানিক লেখকটির পছন্দ অথচ এই উদাসীনতা কোনো সচেতন লোকের কাম্য নয়। সে সমাজে বাস করলেও সামাজিক ভালো-মন্দের দায়দায়িত্ব সে নেয় না। ফলে পাগল সামাজিকভাবে শিকার। তার সচেতন কোনো বিরোধিতা নেই।

চৌদ্দ : আমরা মনে করি পরিবার হলো সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান। আমাদের সমাজে মা’কে সংসারে সবচেয়ে বেশি এক্সপ্লয়েট করা হয়। ‘মায়ের এক ধার দুধের দাম কাটিয়া বুকের চাম’ এসব কথা বলে মাকে সংসারে ঠকানো হয়। আর সন্তানরা দাবির দোহাই দিয়ে দিনের পর দিন মাকে শুষে নিয়ে রক্তচোষার মতো বড় হয়েছে। মায়ের ব্যক্তিজীবন— একটু বয়সে ধর্মের কাছে নুয়ে পড়া ছাড়া আর কিছুর ভেতর নেই। এইসব যা কিছুর ভেতর দিয়ে পরিবার যে মূল্যবোধগুলো নিয়ে এগোয়, সেগুলো সামাজিক প্রথার প্রথম স্কুল। পরিবারের প্রতি বিরোধিতা আমাদের রয়েছে। পরিবার, পরিপার্শ্ব, মিডিয়া এইসব কিছুর প্রতি শুধুমাত্র বিরোধিতাই কি প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা? আগেই বলা হয়েছে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা একটা মনোভঙ্গি। পরিবার পরিপার্শ্ব-মিডিয়ার বিরোধিতা (রেডিও, টেলিভিশন, দৈনিক সাহিত্য সাময়িকীর পাতার) এই কারণে, যে মূল্যবোধের জোটফল দিয়ে তাদের এই সিস্টেম— তা যেভাবে তৈরি হয়েছে এবং তাকে টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে অজস্র মানুষের রক্তের বলির ভিতর দিয়ে। আর মিডিয়ায় ব্যক্তিলেখকের স্বাধীন বিকাশ ইচ্ছেমতো কখনই হয় না। মিডিয়া সুকৌশল নির্ধারণ করে লেখকের সত্তাকে।

তারা লেখককে মোটা অংকের টাকা দেয়। পুরস্কার দেয়। পুরস্কারগুলো খ্যাতিমান হিশাবে লেখককে সামাজিক স্বীকৃতি এনে দেয়। এই পুরস্কারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এরা প্রথাবিরোধী কোনো লেখককে সচরাচর সম্মানিত করে না। মনোরঞ্জনকারী আর ম্যাড়া লেখকদের ডেকে এনে পুরস্কৃত করে— উদ্দেশ্য —জনগণের সামনে একটা আইডিয়াল হিশাবে ওই ম্যাড়া লেখককে রাখা। বেশ কয়েকবার এই রকম চলার পর গুঞ্জন উঠলে প্রতিষ্ঠান তখন একজন সম্ভাবনাময় লেখককে হঠাৎ রাজি করিয়ে পুরস্কার দিয়ে দেয়, যাতে সবার মুখ বন্ধ থাকে।

পনেরো : পুরস্কার সস্পর্কিত : প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার অবশ্যই আমরা বর্জন করবো। পুরস্কার বহু রকমের আছে— আমরা সেগুলো বলছি না। একজন মানুষ তার বন্ধুদের দ্বারা তার পরিপার্শ্ব দ্বারা তার পাঠকদের দ্বারা নানারকম ভালোবাসা মর্যাদা নিতে পারে। সেটা ভিন্ন। যদিও সেটাও এক অর্থে পুরস্কার। কিন্তু যে পুরস্কার প্রাতিষ্ঠানিক সংজ্ঞায় পড়ে অর্থাৎ পুরস্কার যেখানে থেকে দেয়া হয় সেটা— প্রথাসম্বলিত প্রতিষ্ঠান। যারা বিচারক তারা চলমান মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়েই বিচার করে। মোটা অংকের টাকা এবং সম্মান দেয়া হয়— যা দিয়ে লেখক একটা শ্রেণীতে ওঠেন এবং সামাজিক সুযোগ সুবিধার প্রচুর সুযোগ পান। রাষ্ট্রের গণ্যমান্য মানুষ হিশাবে স্বীকৃত হন। প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার কেবল সেটাই।

অনেকেই বলেন সে-তো কোনো লবিং করেনি। একাডেমি তার বইটা পড়ে মূল্যায়ন করেছে। হ্যাঁ এই ক্ষেত্রে আমরা ভাবি, লেখক ধরা যাক তা না জানেন, তার শুভাকাক্সক্ষীরাও যদি নাও জানেন, ঘরে বা বাইরে যদি মদের পার্টি না-ও হয়ে থাকে— তারপরেও লেখক যদি পুরস্কার পান তবুও বলবো লেখক এই সিস্টেমের এগেনেস্টে তথাকথিত শিল্প ছাড়া আর কিছু করেনি। তিনি রাইটিং-এ কম্প্রোমাইজ করেছেন। একাডেমি চলছে পুরনো ক্লিশে পশ্চাৎপদ রক্ষণশীল মূলবোধের ওপর। লেখাটি তার বাইরে ছিলো না। এ-বিষয়ে আমরা প্রয়াত কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের চিঠি—হাসান আজিজুল হকের প্রতি—‘নিরন্তর’পত্রিকায়— তাতে স্পষ্ট পুরস্কার সম্পর্কিত যে মন্তব্য রয়েছে তা আমাদের চিন্তার সাথে একান্ত হয়।

ষোলো : সাহিত্য সাময়িকী সম্পাদক : সাহিত্য সাময়িকীর সম্পাদক ক্ষমতায় সর্বেসর্বা নন। তিনি পত্রিকার মূল সম্পাদকের অঙ্গুলি-নির্দেশে চলেন। তিনি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক সাহেবের রুচি আত্মস্থ করেন, প্রয়োজনে প্রকাশকেরও। এবং সেই অনুপাতে লেখক সাহিত্যিকদের নির্বাচন করেন এবং কৌশলে ব্যবহার করেন। ফলে লেখকের হাত-পা বাঁধা থাকে।

অধিকাংশ সাহিত্য সম্পাদক মদ্যপ, নারীসঙ্গলিপ্সু এবং দুর্নীতিবাজ হয়ে থাকে। তারা চিত্রকরের কাছ থেকে পেইন্টিং উপহার নেয়—বিনিময়ে তাদের ফলাও করে লেখা ছাপে। এই পেইন্টিং নেয়ার মূল উদ্দেশ্য চাকরি থেকে রিটায়ারের পর গ্যালারি করে পেইন্টিংগুলো বিক্রি করবে। ভাবুন কত নির্লজ্জ তারা! আর এই ধরনের লোকের বাড়িতে লেখকদের বাজার পর্যন্ত করে দিতে হয়। তারপরও এই সাহিত্য সম্পাদকের আওতাধীন হয়ে অনেক কিছু বিসর্জন দিয়েও লেখকরা লেখেন। এরাই প্রতিষ্ঠানের পোষমানা লেখক। খেয়াল করে দেখুন, কোথাও যেন এদের দুই একটা লেখা আপনারও ভালো লাগে। সাবধান! আপনার রুচিবোধকে সতর্ক রাখুন।

সতের : বিজ্ঞাপন নেয়া সংক্রান্ত : অবশ্যই ছোটো কাগজের কর্মীদের মাল্টিন্যাশনালের বিজ্ঞাপন নেয়ার কথা না। কেন-না ম্যাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো শোষণ করে তাদের নিজস্ব পণ্যের প্রশ্নে এবং আমাদের মৌলিক উৎপাদন ব্যাহত করে। জাতীয় আয়কে ভারসাম্যহীন করে। তাদের বিজ্ঞাপন ছাপা কখনও সংগত নয়। বরং আগে বলেছি অপেক্ষাকৃত দোষযুক্ত থাকা সত্ত্বেও এমন দুটি ক্ষেত্র থেকে আমরা বিজ্ঞাপন নিতে পারি যারা আমাদের জাতীয় আয় বৃদ্ধি করেছে ১। গার্মেন্টস বা পোষাক শিল্প ২। কম্পিটারের সফটওয়ার। প্রত্যেকটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি থেকে এবং প্রত্যেক কম্পিউটার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিজ্ঞাপন নেয়া যেতে পারে অন্তত আমরা যতগুলোকে চিনি। এদের সাথে আমরা আলাপ করতে পারি সামগ্রিক বিষয় নিয়ে। এরা সস্তায় শ্রম কিভাবে ক্রয় করে সেগুলোও লক্ষ্য করতে পারি, আলাপ করতে পারি তা নিয়েও। আমরা বিশ্বাস করি পুরো বিষয়টি নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে যদি এগোনো যায় পত্রিকা প্রকাশের বিষয়টি তখন সহজ হয়ে যেতে পারে।

আঠারো : বই প্রকাশ প্রসঙ্গে: আমরা লক্ষ্য করছি ব্যক্তিগতভাবে বই বের করা এখন অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন্ধু, শুভাকাক্সক্ষী বা পরিবারের কাছ থেকে কষ্টেসৃষ্টে বড়োজোর একটা বই করতে পারা যায়। এর পরের বই প্রকাশ করা কিভাবে সম্ভব? একটা বিষয়ে আমরা ভাবতে পারি, কমার্শিয়াল বই যারা বের করেন অবশ্যই সেখানে বই দেয়া যাবে না। সেক্ষেত্রে এমন কিছু প্রকাশক আছেন যারা প্রতিষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠান বিরোধী বিষয় নিয়ে ততটা সতর্ক নন তবে কখনই তারা সস্তা বাজারী পচা বা নিুমানের বই প্রকাশ করেন না— সেইসব প্রকাশকদের সংগে আলাপ করা যেতে পারে (এ রকম প্রকাশক সংখ্যায় কম নয় তবে তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে তরুণ লেখকদের প্রতি আগ্রহী হন না)। চেষ্টা করে রাজি করানো যেতে পারে। পুরো বিষয়টি যূথবদ্ধতার আওতাভুক্ত। নিজেরা মিলে সমবায় ভিত্তিতে প্রকাশনী করা সবচেয়ে ভালো। আর বইয়ের কস্টিং কমিয়ে আনতে হবে। এতো ঝলমল বইয়ের দরকারই-বা কি? দু-একটা হলে ভালো— না-হলে না।

উনিশ : প্রসঙ্গ জানানো এবং প্রচার : আমরা আমাদের সম্পর্কে আমাদের কার্যক্রম সম্পর্কে জানাতে চাই তথ্য অর্থে, সংবাদ অর্থে আর অবগত অর্থে— সেই জানানো মানে কেবল বলা, প্রচার কিম্বা পণ্য বেচার অর্থে নয়— ওই জানানোটুকু এ জন্যই যে, আমরা যেন কখনই এন্টি-পিপ্ল না হই—তাই সংবাদপত্রে প্রজ্ঞাপিত অর্থে নিজেদের বই পত্রিকা নিয়ে ঘোষণা দেয়া বা বক্তব্য দেয়া ইশতেহারভুক্ত। এইভাবে প্যারাগ্রাফ করে আলাদা আলাদা করে বলার কিছু নেই। অবশ্যই ছোটো কাগজ সংক্রান্ত কোনো গঠনতন্ত্র কিম্বা সংবিধান রচনা করার অভিপ্রায়ও আমাদের নেই। বিষয়টা যেহেতু বিমূর্ত না তাই এর অবয়ব দরকার। অন্তত একটা আদল দরকার। ধ্যান-ধারণা আপনারই, জ্ঞানও আপনার, এমনকি সৃষ্টিও—আমাদের কথা হলো কিসের ওপর দাঁড়িয়ে আপনি— আমি কথাগুলো বলছি— এজন্যই বিশ্লেষণ। চারিপাশে সেই ঘ্যান-ঘ্যান করা একই কথা, দেশে শক্তিশালী সাহিত্য পত্রিকা কই? দেশে শক্তিশালী স্টাবলিশমেন্ট কই? আমাদের উত্তর : শক্তি কথাটি অসীম শব্দ এর কোনো পরিমাপ নেই। দেশ বা আনন্দবাজার একমাত্র স্টাবলিশমেন্টের আদর্শ না। প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা পুরো জীবন দেখার আর জীবনপ্রক্রিয়া বোঝার একটা মনোভঙ্গি। একটা নিরন্তর প্রশ্ন আর অনুসন্ধান। দুর্বৃত্ত পুঁজির যে কোনো কার্যক্রমের বিরুদ্ধে লড়া। ছোটো কাগজের লেখায় সেই জীবন অনুসন্ধানের প্রকাশ পায়। বাংলা একাডেমী, শিল্পকলা একাডেমী, এফডিসি, টেলিভিশন, রেডিও প্রভৃতিসহ দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকীর পাতা এখন যথেষ্ট শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। আপনি যদি স্বীকার না করেন— ভাববো আপনার নিজের স্বার্থে আপনি এগুলোকে প্রতিষ্ঠান বলে স্বীকার করছেন না। বারবার আমরা বলতে চাই নিজেকে প্রশ্ন করেন, আত্মানং বৃদ্ধি, নো দাই সেলফ্— নিজেকে অনুসন্ধান করে দেখে নেয়া, তারপরে হাঁটা। আর যদি একাত্তরের মতো আরেকটা যুদ্ধ হয়, ভারত-বাংলাদেশের যদি যুদ্ধ হয় কিম্বা কোনো অভ্যন্তরীণ গণঅভ্যুত্থান দেশে যদি ঘটে সেইক্ষেত্রে আমাদের প্রথম যুদ্ধ হবে অভ্যন্তরীণ মিডিয়া কেড়ে নেয়ার জন্য— এই ছাড়া সংস্কৃতি নিয়ে বাণিজ্যিক মিডিয়াতে যাওয়ার প্রশ্ন কখনই ওঠে না।

বিশ : যুক্তির শৃংখলা দিয়ে কথার মারপ্যাঁচ দিয়ে কিম্বা অহেতুক ধোঁয়াশা কিছু বলার মতো প্রয়োজন বা অবকাশ নেই, একথা সত্য প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনোভঙ্গি এখন ঘরে ঘরে জরুরি হয়ে পড়েছে। অজস্র বিষয় নিয়ে প্রশ্ন আছে আর আছে প্রতর্ক-বিতর্ক। কিন্তু বিষয়টি এমন নয় কিম্বা সেই গল্পটার মতো : কাঠ-পেনসিলকে দেখে ইঁদুরের বাচ্চা যার নতুন দাঁত উঠেছে, সে বললো, তোমাকে আমার কামড়াতে ইচ্ছা করছে; কাঠ পেনসিল বললো, আমাকে একটু সময় দাও। আমি একটা জিনিস আঁকি। ইঁদুরের বাচ্চা লক্ষ্য করতে লাগলো। আর কাঠ-পেনসিল যা আঁকছিল তা দেখে ইঁদুরের বাচ্চা ইতস্তত কম্পিত হতে লাগল এবং এক পর্যায়ে চিৎকার করে বললো, বাব্বা এ যে বিড়াল— বলে ভোঁদৌড়। আমাদের যুক্তির পাল্টা যুক্তি ইঁদুরের সামনে বিড়াল দেখিয়ে ভয় দেখানো না। প্রচুর যুক্তি-তর্ক নিয়ে এগিয়ে আসুন। আমরা আলোচনা করবো। আরেকটা বিষয় লক্ষ্য করুন, এই টোটাল মনোভঙ্গিতে আপনার লেখা প্রথাসিদ্ধ এবং বাণিজ্যধর্মী কাগজের লেখকদের তুলনায় অবশ্যই আলাদা হবে— আমরা তা জানি, কিন্ত লেখাটা কেমন হবে তা কখনও লেখককে বলা হবে না—বুঝি শুধু পাল্টা লেখা হবে ব্যাস—লেখক নিজে প্রথমে তা জানতে পারবেন, তিনি নির্ধারণ করবেন তার নিজের লেখা। আমরা মনে করি যার যার সৃজনশীলতা তারই নিজস্ব অভিব্যক্তির প্রকাশ। তার আপন বোধ বলে দেবে তার বিষয় এবং আঙ্গিক কেমন হবে। এখানে আমাদের কিছু বলার নেই। এটা তাকে, কেবল তাকেই খুঁজে নিতে হবে।