Home নির্বাচিত লেখা যদ্যপি ধাঁধার পর ধাঁধা ও অন্যান্য । শান্তনু চৌধুরী ।। কবিতা

যদ্যপি ধাঁধার পর ধাঁধা ও অন্যান্য । শান্তনু চৌধুরী ।। কবিতা

যদ্যপি ধাঁধার পর ধাঁধা ও অন্যান্য  ।  শান্তনু চৌধুরী ।। কবিতা
0
0

বই : হাঁটো, হাঁটাবাবা / কবিতা, ২০১৩/ উলুখড়।।

 

যদ্যপি ধাঁধার পর ধাঁধা

শুনেছি গলিও অন্ধ হতে পারে, কিংবা অন্ধরাও একেকটি কানাগলি

হতে পারে, কিংবা ধাঁধা হতে পারে, ফের ধাঁধা খোলার চাবিও

মস্ত এক ধাঁধা হতে পারে, চমৎকার ধাঁধাও ভূতের গলি হতে পারে,

অথচ কিছুই আঁচ করা যায় না, শুধু আন্দাজ আর অনুমান করা

যেতে পারে, আবার আন্দাজও ভুল অনুমান হতে পারে, কিছুই সাব্যস্ত

করা যায় না, আবার মনে হতে পারে ওটা তিথোনাস, জরায় আটকে

আছে ওর মনপবনের নাও, মনে হতে পারে নিজের ভেতরে লোকে

বহু দূর হেঁটে যায়, অথচ কেউই বেশি দূর যায় না, সুদূরে যেতে

হলে তবে কিছু দূর হেঁটে যেতে হয়, কিছুটা হাঁটতে হয় খাড়ি অব্দি,

কিছু পথ দড়ির ওপর, অন্তত জানতে হয় আসলে লোকটা আর

তিথোনাস নয়, তবু নতুন বোতলে দেয়া হয় সেই একই আদিরস,

অথবা দ্বিগুণ দামে কিনছি অর্ধেক, তদুপরি ভুগছি পুরনো সেই

সন্দেহ বাতিকে, কিংবা একই পোকা সারাক্ষণ কুরে কুরে খাচ্ছে

সব কড়িকাঠ, কোথাও মনের উদ্যানের মেহগনি কাঠের সুবাস,

তাই চুপ করে থাকি, মাঝপথে তর্ক ছেড়ে দিই, কোনও বাগবিতণ্ডায়

নিজেকে পারতপক্ষে জড়াই না, হাল্কা চালে হাঁটি আর হাল্কা ঘুটি চালি,

দূরকে নিকট ভাবি, একা পেলে অগত্যা নিজের মৌনতাও খুন করি,

যেন খুন এক নান্দনিক স্বাদ, যেন সব তুচ্ছ ভুলভাল জারি রাখে

ভেতরের খুদে শয়তান, তবু সময়কে অপরাজেয় খেলনাগাড়ি

মনে হয়, আবার খেলনাটাও সময়ের দম-দেয়া ঘড়ি মনে হয়,

অথবা ইস্কাপনের টেক্কা মনে হয়, দ্বিধায় আড়ষ্ঠ কিসমিসমুখ

মনে হয়, আবার কিছুই মনে হয় না, কেবল বয়াবাতি মনে হয়,

কেবল ভাসছে, বোধে, অথচ কাজীর গরু নেই, কিতাবে পাবে না তার

লেজের সন্ধান, শুধু তল থেকে উঠে আসবে আবারও বুড়ো ফন্দিবাজ,

হাতে তার চীনাবাক্স, বাক্সের ভেতর ফের আরও বাক্স, ফের আরও খুদে

অভিজ্ঞান, বাক্সবন্দি সব, পাতা হবে পরম্পরা, ফাঁদের রেললাইন,

তাতে কারও এড়িয়ে যাবে না চোখ, এক অনুষঙ্গ ছেড়ে অন্য কোনও যৌন

অনুষঙ্গে যেতে পারবে না, এইভাবে একই গর্তে কেটে যাবে বারো মাস,

জুতো সেলাইয়ের মধ্যদিয়ে শুরু হয়ে শেষে চণ্ডীপাঠ, সব উল্টেপাল্টে

তবে জানা যাবে ওটা গর্তই, গর্তের ভেতরে পুরো জীবন সবার, বসে

কেটে যায়, শীতনিদ্রা দিব্যি পার হয়ে যায়, কিন্তু একটুও ভাতঘুম

হয় না কারোরই, সবাই নির্ভার জেগে থাকে, পরন্তু দু’কান থাকে খাড়া,

খাড়া দুটি শিং, তারা মাঠে পাড়ে ডিম, মাঠের আলাপ হেতু মনে মনে

এক ইশারার জন্ম হয়, একটু একটু বড় হয় হৃদিডালপালা,

মমতার বীজ ফেটে মৎস্যগন্ধা আসে, ক্রমে কথাও জড়িয়ে যায়,

এভাবে কবোষ্ণ থেকে সম্পর্ক নিবিড় হতে থাকে, কিংবা কথাটা জটিল

হতে থাকে, ব্যক্তি থেকে কখনও ব্যক্তিত্ব বড় হতে থাকে, কিংবা লঘু পাপে

কারও কারও কালাপানি হয়, কিংবা যাবজ্জীবন, এভাবে হতে পারে কারও

ফায়ারিং-স্কোয়াড, আমরা মজা টের পেতে থাকি, কিংবা যেন টের পাই

মৃত্যুটা ঘুমের চেয়ে ভারি, যেমন সুযোগ পেলে মনের শিশুটা সব

তুলোধুনো করে, দুমড়ে-মুচড়ে দিতে চায় সব, অঙ্কখাতা ছিঁড়ে ফেলে,

তেমনি শিশুসুলভ ভাবি মরণেরে, যেন তুঁহু মম নখের সমান,

তাই এক দানা সুযোগও ছাড়ি না, বাগে পেলে কভু ছেড়ে কথা

কই না নিজের বাবাকেও, তথাপি হজম ক্ষমতার চেয়ে খুব বেশি

খেয়ে ফেলি যারা, কিংবা ভর্তিযুদ্ধে হেরে গিয়ে ভর্তি হই যারা, সবকিছু

সমান আঁকড়ে থেকে আসলে আটকে আছি যারা, তাদের নিরিখ ছাড়া

দুনিয়া অচল, আজও ওদের সামান্য মর্জি ছাড়া কেউ পাবে না সার্ভিস,

এক চুলও নড়বে না ব্লু-ফাইল, ওদের হুকুম ছাড়া কাঁদতে সবার

মানা, অসময়ে চোদাও বারণ, সব আমজনতার ছানা, বসে থাকে

খয়রাতি গমের আশায়, আরও একটি ফেরির অপেক্ষায়, বসে থেকে

পায়ে দীর্ঘ শেকড় গজিয়ে যায়, হাড়ে ও মজ্জায় ব্যথা কি গড়িয়ে যায়,

এভাবে ঘরে-বাইরে পরিচয় সঙ্কটে নিয়ত ভোগে, তবু বেঁচে-থাকা

নাইট্রাস অক্সাইডের চেয়ে মিষ্টি মনে হয়, রাত কাটানোর সস্তা

বাবার হোটেল মনে হয়, আর তাই খুব বাজে মনে হয়, একবারও

ঘাড় থেকে ভূতটা নামে না, নাকি ভূতের দায়টা বয়ে বেড়াচ্ছি সকলে,

কালও বয়ে নিতে হবে, কালও ঠিক হতে হবে আবারও কিম্ভুত কিমাকার,

আসলে আগামী দিনই সবার ভরসা, কাল ভোরে যদি ঘাড়ের ভূতটা

নেমে যায়, যদি কাঁটাতার উঠে যায়, যদি যৌথ জিজ্ঞাসাবাদের পর

আবার ছেলেটা ফিরে আসে, আজ তাই মাটি কামড়ে সবাই পড়ে আছে,

সবাই তাকিয়ে আছে দেয়ালঘড়ির দিকে, তা সবে বোকার স্বর্গে করি

বসবাস, এভাবে আমরা আরও একটি দিনের আলো ক্রমশ ফুরাই,

ছ’মাসের পথ এক নিমিষেই করি শেষ, পা পিছলে পড়ে যাই খাদে,

কিন্তু কখনোই মনের অতলে নয়, একেবারে চুরমার হয় না কিছুই,

অন্তত ইচ্ছেটা টিকে থাকে, উঠে দাঁড়ানোর সাধ হয়, অন্তত বুকের

ব্যথা সেরে গেলে হিসাবটা টুকে রাখি, মাইনেটা অফিসে আনতে যাই,

মনে মনে বিড়ালের গলায় ঘণ্টাটা বাঁধি, কিন্তু মনের বেড়াল ব্যাটা

থলে থেকে তথাপি বেরিয়ে আসে, চুরি করে কেবল মাখন খেয়ে যায়,

কেউ তাকে ধরতে পারে না, শুধু তক্কে তক্কে থাকে, কেবল মনের ঘরে

ফাঁদ পেতে চোর ধরে ওরা, নাকি চোর পালালেই তবে বুদ্ধিশুদ্ধি বাড়ে,

সবাই প্রথম রাতে বিড়াল মারতে চায়, তলে তলে সবাই শুঁটকি

খেতে চায়, কিন্তু ফেঁসে যায় শুধু মেছোভূত, কিংবা বিড়ালতপস্যা হেতু

যদি ভাবো নজর প্রখর হয়, বিড়ালাক্ষি হয়, গভীর সন্ধিৎসা থেকে

যদি চব্য, চোষ্য, লেহ্য, পেয়, কাঁটা ও গন্ধের উৎস জানা যায়,

তবে বন থেকে বন্ধুরা বেরিয়ে এসো, অলস মস্তিষ্ক নিয়ে শেষবার

তর্কে যোগ দাও, কিংবা সজ্ঞানে শয়তানের কারখানা ফের চালু করো,

আবার রেশন চালু করো, আবার জগাখিচুড়ি সবাইকে খেতে দাও,

সবাই পঙ্ক্তিভোজে বসো, নাকি একই মুরগি জবাই হবে বার বার,

তাতে হেসে-খেলে সাত দিন, না-হেসে সপ্তাহ পার হয়ে যাবে, না খেলেই

হয়ে যাবে সেরা খেলোয়াড়, ঘুরে বসো, সবাইকে ফের হাতে তুলে নাও,

অন্তত মনের হালটুকু ধরো, আরও একবার নস্ত্রাদামুসের মতো

নিখুঁত ভবিষ্যকথা বলো, যাতে অক্ষরে অক্ষরে সবকিছু ফলে যায়,

খড় পচে গেলেও যেন-বা কথাটা না পচে, কিংবা যৎপরোনাস্তি সবাই

প্রশ্নবিদ্ধ হয়, যেন ঘুরেফিরে লোকে শুধু মিকেলেঞ্জেলোর কথা বলে,

রঙের সুবিধা আর রং-তামাশার কথা বলে, তারপরও চেপে রাখা

মনের কথাটা বলে না, মূলত পঠিত পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠার প্রসঙ্গ

উহ্য রেখে বলে, কথা দিয়ে তবু কথা রেখে দেয়, বরাবর ছেঁদোকথা

লেনদেন করে, অন্যের কথার মাঝখানে অহেতুক ঢুকে যেতে চায়,

আদার ব্যাপারি ওরা, তাই জাহাজের খোঁজ নিতে চায়, বুঝে বা না-বুঝে

মাওলার স্কুলে যায়, স্বভাবত লজ্জাকে নারীর বর্ম ভাবে, তবু ওরা

গোপনে বেশ্যার ভাত খায়, ছুটি পেলে আনবাড়ি আনন্দভ্রমণে যায়,

ভস্মকে চন্দন জ্ঞান করে, কম্বলের লোম বাছে, শিশি থেকে ছিপি খুলে

বোতলে লাগায়, নাকি চক্ষুদোষে সব হলদে দেখায়, কিংবা আগা নাই

গোড়া নাই মধ্যিখানে চৌষট্টি বুঝেছে, তবু ডুবেছে না ডুবতে বসেছে

তার ভেদবুদ্ধি নাই, তবু কিতাবের পোকা ওরা, সারাক্ষণ অফিসের

মাছি-মারা সরল কেরানি, যন্ত্রবৎ কাজ সেরে, সব কন্যাদায় সেরে

একদিন নলখাগড়ার বনে গিয়ে বসে, শিশিরের মতো স্বচ্ছ হতে চায়,

তবু আজীবন খেলে যায় কানামাছি, কিংবা তার মাঝে সবার জীবন

ভীষণ আটকে যায়, গুড়ের পাহাড়ে আত্মারাম খালি ছটফট করে,

নুনটা আনতে গিয়ে পান্তা ফুরায়, কেবল বেরোবার পথ ভুল করে,

সব রুমনম্বর গুলিয়ে ফেলে, কিংবা অবাঞ্ছিত লোকের কবলে পড়ে

হাবুডুবু খায়, কিংবা মৃত্যুমুখে কেটে যায় আরও এক নিঃসঙ্গ বছর,

এ সবই ঘটছে, সত্যি এরই মধ্যে ঘটে গেছে সব, নানা দৈবদুর্বিপাক,

সে সব বালাই-মুসিবত, আড়াই আঙুল দড়ি দিয়ে সৃষ্টি জুড়ে বেড়ি,

সম্ভাব্য প্রতিটি দরজায় কড়া নাড়া, ফিকিরে ফকির, কিংবা পথে পথে

মেগে এনে বিলিয়ে খেলাম পপকর্ন, সংকর-বাদাম, নয় দাদু হয়ে

বসে থাকি প্রতিরক্ষা বাঁধে, হাওয়া বুঝে মাথা নাড়ি, মামুলি কথায়

দিয়ে যাই সায়, কখনও কাঁদতে গিয়ে হেসে ফেলি, হাসতে হাসতে খুন,

এ সবই ঘটছে, কিংবা এভাবে ঘটবে আরও তিন কাল, আরও কিছু গুম,

যত দিন এই কানাগলি আছে, যত দিন ধাঁধার রহস্যটুকু আছে,

যত দিন ধাঁধাটা কঠিন, যত দিন সময়ের চেয়ে গলিটা পুরনো

 

 

সেলাইতামাশা

রক্তজার্সি পেয়ে গেলে সকলের সমান বিপদ;

আমরা নিঃসঙ্গক্রমে আসলে ভেতর থেকে মরে গেছি যারা,

আমরা বংশানুক্রমে যারা নতজানু, বহু রাত

হাজতে করেছি বসবাস, আমরা অস্পষ্ট যারা

শাদামাটা কাগজের বাঘ, শাদা হয়ে পড়ে থাকি,

শুধু শাদাসর্বস্ব ব্লিচিং পাউডার, ভোরের চেয়েও শাদা,

আমরা সুস্থতা হারালাম পৃথিবীর কোন বয়ঃসন্ধিক্ষণে!

 

কীসের ভেতরে যেন বাঁচি! কী যে থেকে কী যে হয়,

কেন ভাবি রেখাটা সরল নয়, কেন ঘটে এত সামাজিক

হারিকিরি, সমস্ত রক্তের ফোঁটা নীল হয়ে, কিংবা রাতারাতি

ফুল হয়ে ভোরে আজও অমন অপরাজিতা হয়, কেন ভাবি!

 

যতক্ষণ হাঁটার ক্ষমতা আছে, হাঁটবার শাদাছড়ি আছে,

যতক্ষণ চরম দারিদ্র্যরেখা বরাবর বিপদের চাকাটা যেতেছে,

তার দিকে কত দূর নেমে যেতে পারি, কত দূর!

 

তার চেয়ে উল্টো দিকে মুখ করে একবার কোথাও দাঁড়াবো,

ওইখানে, যেখানে দাঁড়াতে নেই, যেখানে সংখ্যায় বৃহন্নলা

বেশি, কিংবা দর্জিমুখ বেশি, রাতভর রক্তজার্সি সবাই সেলাই করে!

 

 

ইন্টারোগেশন সেল

আমাকে এখনই ডাকা হবে কিন্তু কোথায় তলব

করা হবে, তার বলা হয় নি কিছুই, জেনেছি সবার আগে

আমাকেই ডাকা হবে, কিন্তু কেনই-বা ডাকা হবে

তা জানায় নি ওরা, ওরা মানে কপট পাঠক,

ওরা টিকটিকি, হাওয়া, ওরা সব অবলোকিতেশ্বরের বাবা,

 

ওরা জানে আমার বাগান আছে, লাল বইয়ের পাহাড় আছে,

তবু খুলি নাই শখের দোকান, পানশালা, অর্ধেক জানালা,

কেবল সন্ধের পর দাবা খেলি, তাতে কিস্তি বাজিমাৎ, তাতে

সব অর্থ মাটি হয়ে যায়, আর খেপে যায় অন্ধ বাড়িঅলি,

কথার ভেতরে তার বাঁকানো চুম্বক, রক্তে আনে ঠাণ্ডা অনুভূতি,

 

শুনেছি ওরা কী সব জানতে চাইছে আর প্রশ্ন-প্রমাণের

সামনে জবান পাল্টে যাচ্ছে ছায়াবন্ধুদের, কবিদের;

ওরা সব সংখ্যাকে বলছে সাধু, শব্দকে আওয়াজ,

সব চিঠি আর চিরকুট করছে সন্দেহ, চিন্তাকে আঘাত;

ওরা নাম ধরে ডাকছে অথচ নামে নয়, অদ্ভুত সম্ভ্রমে