Home নির্বাচিত লেখা রক্তে যতো চিহ্ন । সেলিম মোরশেদ ।। গল্প

রক্তে যতো চিহ্ন । সেলিম মোরশেদ ।। গল্প

রক্তে যতো চিহ্ন  ।  সেলিম মোরশেদ ।। গল্প
0
0

বই: শ্রেষ্ঠ গল্প – সেলিম মোরশেদ / গল্প /  ২০১৬, উলুখড়।।

আকস্মিক এক প্রবল ধাক্কায় সামনে ছিটকে পড়ে জানোয়ারের মতো হাঁপাচ্ছিলো বিশু। তার হাতের হাতকড়ায় আর কোমরে বাঁধা দড়ির টানে, এইমুহূর্তে, সে আর নিজেকে একেবারে মানুষ ভাবতে পারছিলো না, এমনকি মৃদু নিশ্বাস নিতে গিয়ে তার জিভ বের হয়ে আসছিলো বারবার অমানবিক অভিব্যক্তিতে। অবলীলায় বুঝতে পারছিলো তার আসন্ন ভবিতব্যের গতিপ্রকৃতি আর তৃতীয়বারের মতো রিমান্ডে নিয়ে যাবার পর শেষ ইচ্ছাশক্তির পরিণতি কিংবা চোখের পাপড়িতে ধীরে সুচ ফোঁটানো বা আঙুল থেকে নখ উপড়ানোর মুখোমুখি— এ-সবকিছুই, নিজেকে বিষম এক পরিস্থিতির শঙ্কাযুক্ত ভাবনায় অস্থির করে তুললেও অবিরত স্থৈর্যের ঘোরে মাথা নাড়ছিলো তুলোর পুতুলের মতো; বিশুর সামনে আরও তিনজন আসামি, পেছনেও কয়েকজন— এবং একদড়িতে সব বাঁধা কিনা সেটা বিশু বুঝতে পারছিলো না, কারণ তার মাথা ঘোরানোর সচেতন শক্তি ছিলো না আর দুই কাঁধের ভেতর গলা ঢুকে পড়েছিলো ধীরে ধীরে; মণিদুটো নাড়াতে গিয়ে ব্যথায় বুঁজে আসছিলো পাপড়ি দুটো; গাল নাড়িয়ে বিশু কান্নার ভঙ্গিতে কিছুক্ষণ হু-হু করলো যেন-বা সে কোনও স্নেহজনিত পরিপার্শ্বে নিজেকে সামান্যক্ষণের জন্য স্থাপন করতে যাবার কল্পনা করলো। কোর্ট-হাজতের ভেতর বিশু আর অন্যান্য আসামিদের ভরে লক-আপ করলো দু’জন সেপাই। বিশুর নামে তিনটে কেস ছিলো বলে কয়েকদিন আগেও তার পায়ে ডাণ্ডাবেড়ি দেয়া হয়েছিলো, গত ডেটে দুটো কেস ডিসমিস হওয়ায় সেটা খুলে দেয়া হয়েছে; ঘায়ের মতোন হয়ে আছে ওই জায়গায়। সামনের একজনের সিগারেট খাওয়া দেখে বিশুরও ইচ্ছে হলো, কিন্তু আবারও তাকে রিমান্ডে যেতে হবে কথাটা ভেবে ইচ্ছেটা মুহূর্তে নিভে গেলো। তো বিকেল নাগাদ বিশু জানলো থানা আবেদন করেছিলো সাত দিনের রিমান্ডে নেয়ার জন্যে; ম্যাজিস্ট্রেট বিশুর অবস্থা দেখে তিন দিনের রিমান্ডের অনুমতি দিয়েছে। এখন দাঁড়িয়ে আছে একটা কেসের ওপরে—অস্ত্রগুলো পুলিশকে হস্তান্তর করা আর সতীর্থদের দেয়া। দু’বার নানাবিধ টর্চারেও বিশু মুখ খোলেনি; ফলে তার শরীরের বহু অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ইতোমধ্যে কার্যহীন হয়ে গেছে, এটা বিশুর বিশ্বাস। পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সভ্যরা চরমবাদী। সিদ্ধান্ত বলতে একটাই : বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক— তা যে-কোনও জায়গা থেকে শুরু হতে পারে। কোনও ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনেই প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে না। ’৫২-পরবর্তী তারা বললো, দুনিয়ার মজদুর এক হও, আমার ভাষা বাংলা ভাষা; দুনিয়ার সমস্ত মজদুরের মাতৃভাষা কোথায় যাবে এটুকু লক্ষ করে না। পর্যায়ে গিয়ে সমগ্র বিষয়টা এসে দাঁড়ালো মুসলমানদের অস্তিত্বে। তখন বলা হলো উর্দু উইল বি দি স্টেট ল্যাঙ্গুয়েজ। বাঙালিরা বললো, না, বাংলা হবে বাঙালিদের রাষ্ট্রীয় ভাষা। এই তো! পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সভ্যরা এটাই শেষমেশ নিলো। ’৭১-এ পার্টি বললো, পাকিস্তানের হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে ভারতের আগ্রাসনবাদ মেনে নেয়া স্বাধীনতায় আমাদের আস্থা নেই। দুই কুকুরের লড়াই; অথচ স্বাধীন রাষ্ট্রের যতোটুকু সুফল গ্রহণ করতে বাধছে না। লাইনের ভুলগুলো নিয়ে বিশুরা কখনও আলোচনা করার অবকাশই পায়নি। সংশোধনবাদী বা প্রতিক্রিয়াশীল বলা হবে তখন— এটা বিশুরা জানে। শ্রেণিশত্রু খতমের লাইনটা শেষমেশ গ্রাম আর মফস্বলেই চলছে। কই, নগরে তো এই লাইনের হিসেবে বহু শ্রেণিশত্রু। এখানে তো কোনও অ্যাকশন নেই। পার্টির ভূমিকা কোথায়? বিশুর ভাবনার মূলে কখনও-বা এমন কিছু বাস্তবতা কাজ করে তা দিয়ে পার্টিকে নতুনভাবে গড়াও সম্ভব না। নেতৃত্ব দিচ্ছে অধিকাংশই সামন্তশ্রেণি থেকে আসা, ফলে মার্কসবাদ লেনিনবাদের মতো তাদের নিজস্ব ইমেজ তৈরি আর ক্যাডার বাহিনী বানানোটাই লক্ষ্য। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় বিপ্লবের নীতি এবং কৌশল কেমন হবে যতোক্ষণ না তুলে ধরা হচ্ছে ততোদিন সমাজের কাছে এই বিপ্লব সন্ত্রাস হিসেবে চিহ্নিত। প্রজন্মরাও অবশেষে পুরোবুর্জোয়া দলগুলোতে যুক্ত হবার জন্য আগ্রহী হয়ে উঠবে, কিন্তু এ-ভাবনার ফুরসত বিশুদের নেই। বিষয়টা এমনভাবে দাঁড়িয়ে গেছে যে, পার্টির অস্তিত্বের প্রশ্নেই অস্ত্রবাজি; অন্যথায় মরে যেতে হবে। এ-সময় আসামিদের একজন একটা বনরুটি বিশুর হাতকড়া পরা হাতে দিলো। হাতদুটো কাঁপলো। হাতটা মুখের কাছে এনে দাঁত দিয়ে বনরুটি ছিঁড়ে খেতে লাগলো বিশু। ‘কীভাবে মুখ খোলাতে হয় আমরা জানি, এমন সব যন্ত্রপাতি এবার ওর ওপর প্রয়োগ করা হবে যাতে কথাগুলো পেট থেকে বের হতে বাধ্য আর অস্ত্রগুলো জমা দেবে যতো তাড়াতাড়ি পারে।’— তারা বললো এবং প্রস্তুতি নিচ্ছিলো ভয়ানক সংঘবদ্ধ হয়ে এক নির্মম পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে। বিশু কিংবা বিশুর মতো কয়েকজনকে শ্রেণিশত্রু খতমের রাজনীতি থেকে সরাতে পারলে কিছু কিছু এলাকার পরিস্থিতি যথেষ্ট স্বাভাবিক হবে বলে তাদের ধারণা এবং এই মর্মে তারা তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলো। নেতৃস্থানীয় কয়েকজনকে তারা শুরুতেই লিস্টে রেখেছে— কেউ কেউ সরকারি দলের ছত্রছায়ায় রয়েছে বলে ধরতে পারছে না তারা, যদিও নিরলস চেষ্টা রয়েছে চিরুনি অপারেশন প্রয়োগের ভেতর, এমনকি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহে নিত্য তাদের পারদর্শিতা তাদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিলো। সিদ্ধান্ত নেয়া বাদে সবকিছুই তাদের হাতের ভেতর ছিলো। সন্ধ্যায় বিশুদের নিয়ে আসা হলো প্রিজন-ভ্যানে। ইন্টারোগেশন সেলে পরদিন তাকে নিয়ে যাওয়া হলো। তারা নিজেরা বললো, ‘দেখি বাছাধন কতোটা শক্ত তুমি, আজ প্রমাণ দেবে।’ বিশু ধরা পড়েছিলো মাস দেড়েক আগে। তখন ভাত খাচ্ছিলো। বিশুর বউ কুমকুমীর চোখের ভেতর একটা তিল আছে। বিশু প্রায়ই সেটা দ্যাখে। যখন তার মন ভালো থাকে সে বলে, চোখে তিল কান্দে/ হাতে তিল রান্ধে। কুমকুমীর হাতটা ধরার আগেই তার বাড়িটা ঘিরে ফেললো শাদা পোশাকের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজন। বিশু বুঝলো তাকে ধরতে এসেছে। মুহূর্তের ভেতর সে এ-ও বুঝেছিলো পালানোর সমস্ত পথগুলোই রুদ্ধ। শান্তিকামী একজন মানুষের মতো তাদের নির্দেশে গাড়িতে উঠলো। এ যাবৎ বিশু যা-যা করেছে পার্টির নির্দেশেই। প্রতিবিপ্লবী, সংশোধনবাদী কিংবা সাম্রাজ্যবাদীর দালাল হতে চায়নি বলেই এগুলো করেছে; বিশুর মনে নানা সময় প্রশ্ন যে আসেনি তা নয়, কিন্তু প্রশ্নগুলো নিয়ে সভায় উত্থাপন করা যেন-বা একটা কাঠামো ভেঙে দেয়া। বিশুর বারবার মনে হয় এই প্রশ্নগুলো পার্টির বর্তমান কাঠামোকে ভেঙে চুরমার করে। তাকে হয়তো সুবিধাবাদী বা প্রতিবিপ্লবী বানিয়ে দেবে বা হত্যাও করতে পারে। বিশুর অতীত সামন্তশ্রেণির প্রতিনিধিত্বই করে। দাদা ছিলেন জমির মালিক। অট্টালিকা ছিলো বিশুর দাদার। ভয়ে তটস্থ থাকতো সবাই। দাদী জিজ্ঞেস করতেন কখন খাবেন— ক’জনার খাবার দেবো? বিশুর দাদা শুধু বলতেন ‘আট’ — আটটায় খাবেন এবং আটজন নিয়ে খাবেন। এসব দাদীর কাছ থেকে শোনা। বিশুর মা সুখী ছিলেন না। গান শুনতেন, গুনগুন করে গাইতেন : দুঃখ যে মনের মাঝে আনিলো আমার/তারে-নি ভালো রাখিবেন খোদায়। বিশুর চোখ পানিতে ভরে যেতো। বাবাও দাদার চেয়ে কম কিসে? বিশুদের নিয়ে বেড়াতে গেলেন বাগানবাড়িতে—সেদিনের কথা—সবকিছু যখন ক্ষয়িষ্ণু—বিশুর বয়স বছর দশেক—হুট করে এক বাদামঅলা সামনে পড়লো—বিশুর বাবা সব বাদাম কিনে নিলেন—বাদাম-বিক্রেতা ছিলো একটা ছেলে। সে গেয়ে উঠলো : ও আমার ছোট্ট পাখি চন্দনা (পরবর্তীকালে বিশু দেখলো চন্দনা ছোটো না, শিল্পে কতোকিছু)! ছেলেটার চেহারায় সে সুখ দেখেছিলো। এইসব পাতিবুর্জোয়া রোমান্টিকতা ভেঙে বিশুকে এখানে আসতে হয়েছে। হত্যা—পাল্টা হত্যা—ওয়ান ইজটু টু। শত্রু একটা মারলে দুটো মারবো। ইন্টারমিডিয়েট পাশ বিশুর ইচ্ছা ছিলো সমাজবিজ্ঞানে অনার্স করা, সেটা হয়ে ওঠেনি, বুর্জোয়া শিক্ষার মুখে সে লাথি মেরেছে, তবু তার সমাজবিজ্ঞানী মন বেশ কিছু প্রশ্ন জমা রেখেছে— বিশুর প্রশ্ন : সাতচল্লিশের ভাগাভাগি ভুল-সঠিক যাই হোক না কেন পূর্ববাংলার মুসলমানদের অন্তত হীনমন্যতার মুখে দাঁড়াতে দেয়নি, কিন্তু একাত্তর-পরবর্তী সময়ে এখানকার বাঙালি মুসলমানদের নতুন ডিসকোর্স অনুসন্ধানে যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে তার জবাব কে দেবে? তাদের আপন উৎস? তার ভাষা আর সূত্রমুখ—ঊষালগ্ন—এ-সবকিছুর অবয়ব কোথায়? প্রশ্নটা পার্টির কাছে কতোটা গুরুত্ব বহন করবে ভেবে বিশু কখনও আলাপ করেনি। ভেতরে রক্তক্ষরণে বিস্তর সত্য উন্মোচিত হলে তাকে পার্টি থেকে বহিষ্কার করে সাম্রাজ্যবাদীর দালাল আর প্রতিক্রিয়াশীল মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করবে তার দল। বিরোধী দল তো তক্কে-তক্কে রয়েছে, সুযোগ পেলেই গুলি করবে। দলের ভেতর থেকেও তার বিরুদ্ধে কঠিন কার্যক্রম তৈরি হবে। মাঝে মাঝে বিশুর মনে হয়, এ-তো শালা ওয়ান ওয়ে। এগোতে এগোতে মরবে, পেছাতে পারবে না।

শিরদাঁড়ার এ-পাশেই একটা আস্ত পিন ঢুকিয়ে দিলো একজন— আর এরপরেই ডান পায়ের দ্বিতীয় নখটা সরু সাঁড়াশি দিয়ে দুইজন উপড়াতে এগিয়ে এলো। বুক-পেট চিরে আর্তচিৎকার বেরিয়ে এলো বিশুর। না, সে বলবে না। অস্ত্রগুলো কোথায় আছে জানাবে না। একজন কমরেডের নামও তার কাছ থেকে শুনতে পারবে না তারা। পাপড়ি উঁচু করে মণিতে আলো ফেলা হলো। গরম পানি নাকের ভেতর দেয়া—সেটা তো প্রথম থেকেই শুরু। এই তিনবার রিমান্ডে এ-হেন নির্যাতন নেই যা তারা করেনি; পায়ুপথে গরম ডিম দেয়া থেকে শুরু করে সিলিংয়ে উল্টো করে ঝুলানো পর্যন্ত। এবার যেগুলো স্রেফ যন্ত্র দিয়ে হাতে-পায়ে ঘাড়ে আর মাথার বিভিন্ন শিরা সনাক্ত করে আঘাত করছে। যন্ত্রণায় পাগল হয়ে যাবার মতো অবস্থা বিশুর। তার মুখ ব্যথায় নীল হয়ে উঠলো! সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছিলো না। কুঁজো হয়ে ঝুঁকে গেলো সামনে। মাথা অনিয়ন্ত্রিতভাবে নড়ছিলো। শরীরের বিভিন্ন জায়গা থেকে বের হচ্ছিলো রক্ত; কখনও গলগল করে কখনও-বা ফোঁটা ফোঁটা! স্রষ্টায় অবিশ্বাসী বিশুর আর্তচিৎকার যেন স্রষ্টার উপস্থিতি চাইলো! বিশুর মুখ বিকট চেহারায় ফুলে উঠে ঘাড়-মাথা এলিয়ে পড়লো ডান কাঁধের ওপর। না, তবু সে বলবে না।— এ-কথা ভাবতে ভাবতে বিশু অবশ্য বুঝতে পারছিলো শেষ রক্ষা করা আদৌ সম্ভব কিনা? তার অনুভবের অধিকাংশ বিন্দুই অক্ষম। আর কিছুক্ষণ; তারা সব প্রয়োগ করে বিরতি দেবে অন্তত অল্পক্ষণের জন্যে। সময়টুকুতে বিশু তার ইচ্ছাশক্তি বাড়িয়ে ফেলবে। না, তা হলো না। তারা দ্বিগুণ উৎসাহে বিশুর ওপর একটার পর একটা নির্যাতন চালিয়ে গেলো— বিশু, কী লাভ বলো? এখন একপ্রকার মৃত! তোমার কমরেডরা কেউই পরিষ্কার না যে, যুদ্ধটা কোথায়? এখান থেকে ছাড়া পেলেও ভেতরে তোমার অনেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পঙ্গু হওয়ায় কোনও কাজে গতিশীল একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে নিয়োজিত করতে পারবে না। জানিয়ে দাও। নিজের কাছে ক্ষীণ উত্তর দিলো বিশু। হ্যাঁ, মনে হয় এবার আমাকে বলতেই হবে। তারা নতুন যন্ত্র নিয়ে আবারও এলো। ঠোঁটে মুচকি হাসি। বিশু কেমন যেন তন্দ্রাচ্ছন্ন এখন। উদগ্র যন্ত্রণায় সে আর জ্ঞানের ভেতরে নেই। তিন ঘণ্টা পর ইন্টারোগেশন সেল থেকে স্ট্রেচারে বিশুকে নিয়ে আসা হলো হাসপাতালে। ওদিকে চোখ বড়ো করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একজন কর্মকর্তা আরেকজন ঊর্ধ্বতনকে জানালেন যে, অবাক হবার মতো কাণ্ড, এতো নির্যাতনের পরেও বিশুর কাছ থেকে তারা কোনও নাম জানতে পারেনি। অস্ত্র কোথায় আছে সেগুলোও সে স্বীকার করেনি। তিনদিন পরে বিশুর জ্ঞান ফিরলো। সে কথা বলতে চাচ্ছিলো কিন্তু পারলো না। জিভ ছিলো ফোলা। শরীরে রক্ত সঞ্চালন হচ্ছিলো মন্থরে। পুলিশ প্রহরায় বিশুর চিকিৎসা মনোযোগ দিয়ে করানো হচ্ছিলো। দূর থেকে বিশুর আত্মীয়-স্বজনরা বিশুকে দেখতে পাবার অনুমতি পেলো। তবে বিশুর কাছে কেউ যেতে পারবে না, এমনকি কুমকুমীও। বিশুর মাথার গোড়ায় ছিলো জানালা, পাশে কদমগাছ, সেখানে বসন্তের কোকিল ডাকে! কতো বসন্ত পার করলো? চল্লিশ, কিংবা আরেকটু কম-বেশি। হাসপাতালে সে যে নিরাপদ চিকিৎসায় আছে এটা একসময় বুঝতে পারলো। জ্ঞান স্মৃতিশক্তিকে ফেরত আনছিলো। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছিলো ব্যান্ডেজ। ডাক্তার ব্যথা কমানোর ওষুধ দিয়েছে। কয়েকদিন পরে সিকিভাগ সুস্থ হলো বিশু। মনের শক্তি বলে কোনোকিছুই যেন অবশিষ্ট ছিলো না; অতি ধীরে সেটা চেষ্টা করছিলো পুনরুদ্ধারের। কীভাবে তার ইচ্ছাশক্তি এতোদূর তাকে টেনে এনেছে সে তা ভেবে পাচ্ছিলো না। তার সন্দেহ হচ্ছিলো চতুর্থবারের মতো তাকে রিমান্ডে নিয়ে যাওয়া হবে কি না। সেক্ষেত্রে তাকে ঝুঁকি নিতে হবে অন্যকিছুর; এখন যেটা দরকার—দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠা। অন্তত নিজেকে চালানোর মতো সুস্থ; মাথার ভেতর কোনও পরিকল্পনা তৈরি হবার মতো সুস্থতা, বিশু ভাবছিলো; বসন্তের কোকিলটা আবার ডেকে ওঠে কদমের ডালে; কিছু কিছু বিষয় বিশু ভাবতে চাইলো, তার জীবন-বাস্তবতায়, তার ভবিতব্যে যে কাঁটার ধার, বারবার তাকে সীমাহীন যন্ত্রণায় বৃত্তবন্দি করে, অবিরাম আঁচড়ে রক্তাক্ত বিশুর আদৌ করার কিছু থাকে কিনা সেটাও তার প্রশ্নের আওতায়। বালিশের থেকে এক ইঞ্চি মাথা উঁচু করার চেষ্টা করলো বিশু। পারলো। ভালো লাগলো এটা ভেবে তার ক্ষমতা সামান্য হলেও ফেরে। দিন পনেরো পরেই জিভের ফোলাটা কমে গেলো। ঘাগুলো শুকিয়ে যাবার পথে। বিশু বুঝতে পারছিলো তার শক্তি এখনও ইচ্ছা-নিরপেক্ষ, এখনও তা সাপেক্ষে আসেনি। এটুকুতেই আশাবাদী হয়ে উঠতে চাচ্ছিলো। বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছাটা এতো জাগতিক যে, সে এর আগে কখনও বুঝতে পারেনি। তার হাতে মারা গেছে কয়েকজন! মৃত্যুমুহূর্তে তাদের প্রতি কোনও করুণা হয়নি বিশুর। এখনও তার কোনও গ্লানি নেই। কারণ সে যা-যা করেছে পার্টির নির্দেশেই করেছে, কিন্তু পার্টির কাছে তার প্রশ্নগুলো যা-যা বিশুর বিবেচনায় রয়েছে সেগুলো উত্থাপন করাটা ইদানিং এতো জরুরি মনে হচ্ছে কেন বিশু তা বুঝতে পারে না। এমনকি এ অসুস্থ দেহে বিশুর মনে হয় চিৎকার করে সে যেন  এ-সবকিছুই জানিয়ে দেবে। এ-লড়াই বিশুর সঙ্গে বিশুর পার্টির লড়াই। তা কি শুধুই ব্যক্তিগত নাকি এখানে সামষ্টিক স্বার্থের মূল সত্যটা উন্মোচনের লড়াই? নার্স এসে বিশুকে একগ্লাস দুধ দিয়ে গেলো। স্যালাইনের সুচটা ঠিক করে দিয়ে গেলো।

হাতকড়াটা খুলে দেয়া হয়েছে। নখের ব্যান্ডেজগুলো বেশ যত্নের সাথে পাল্টিয়ে দিচ্ছে। বিশুর মনে হচ্ছিলো এইমুহূর্তে যদি ছুটে যেতে পারতো তার পার্টির কেন্দ্রীয় দপ্তরে; প্রশ্নগুলোর উত্তর যেন সে না নিয়ে ফিরবে না এমন একটা দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে।

মাস পুরে গেলো। বিশু এখন বেশ সুস্থ। কদমগাছের ডালে কোকিলটা। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তাদের ভেতর এক ধরনের নিরাশা জেঁকে বসে। চতুর্থবারের জন্য রিমান্ডে নেয়া আর সম্ভব না, কোর্ট অনুমতি দেবে না। তারা হেরে গেলো কিংবা বলা যেতে পারে বিশুর অস্বাভাবিক জীবনীশক্তি সমস্তকিছুকে হারিয়ে দিলো। মাঝে মাঝে তাদের ব্যবহারের রুক্ষতায় তারা প্রমাণ দেয়, যেন একহাত দেখে নেয়ার জন্যে সুযোগ খুঁজছে। বিশু থাকে ভিন্ন জগতে, তার ভাবনার মূল এরকম : সক্রেটিসকে হেমলক দিলে পান করেছিলো, সক্রেটিসের সুযোগ ছিলো পালিয়ে যাবার। কিন্তু সিস্টেমের প্রতি আনুগত্য রেখেছিলো সক্রেটিস, তাই সে পালাতে চায়নি। সক্রেটিস সঠিক ছিলো, ফলে তার সমর্পণও যদি ভুলের কাছে হয় তাহলে সঠিকটাই জেতে; সক্রেটিস স্মরণীয়, কিন্তু বিশুর ক্ষেত্রে তার উল্টো। বিশুর ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিশু পার্টির সামষ্টিকতায় একটা বড়ো ভুল সনাক্ত করেছে শক্তে; এমতাবস্থায় পার্টির সঙ্গে তার কোনও বোঝাপড়া হয়নি, সে কেন অস্ত্র জমা দেবে? সতীর্থদের নাম কেন বলবে; পার্টি যেহেতু ভুল, চলমান সমাজ-বাস্তবতা তো আরও ভুল, ফলে ভুলের থেকে আরেকটা ভুলে যাবার মতো স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক কেন হবে? শুধুই নিজের সুখ-শান্তি?

না, বিশু মরে গেলেও তা করবে না। রণনীতি ও রণকৌশল এই দুটো কথার ভেতর অনেক বড়ো বড়ো ফাঁক রয়েছে। ধরি মাছ না ছুঁই পানি মার্কা বিপ্লব যারা করে তাদের জন্যে এসব কথা উপযুক্ত। বিশুরা নিজের নিয়তি বানিয়েছে কেবল প্রকৃত বিপ্লবের জন্যে, আর এইজন্যে এখন তার প্রধান কাজ পার্টির নেতৃস্থানীয়দের সাথে বোঝাপড়া করা। অস্থির হয়ে উঠেছে বিশু। তাকে কোনও একটা পথ বের করতে হবে, কীভাবে সেটা সম্ভব হয়ে উঠবে বিশু বুঝতে পারছিলো না। রিমান্ডে অবশ্য আর নিতে পারবে না কিন্তু বিচারে বেশ কয়েক বছর জেল হবে বিশুর। একটা কেস মারাত্মক, অনুষঙ্গ আরও! জানালার বাইরে কোকিলটা সুর করে ডাকে; এক স্তব্ধতার হাওয়া জানালা গলিয়ে ভেতরে ঢুকে বিশুর সারা শরীর ও মনে ব্যাপক দোলা দিলো! দূর থেকে বাস-ট্রাকের হর্ন মিহিস্বরে হাসপাতালের ভেতরে ঢোকে। কী করবে এখন বিশু? পাহারায় রয়েছে দু’জন পুলিশ। বাইরে প্রতিরক্ষার দ্রুতবাহিনীর সদস্যরা থাকতে পারে। বিশু খাটে শুয়ে একজন নার্সকে বললো তার বেডটা জানালার একটু কাছাকাছি দেয়ার জন্যে। আবেদনটা খুব দৃঢ় স্বরে করেছিলো বিশু, ফলে পুলিশ দুটো মন্তব্য করার আগেই নার্স ঠ্যালা দিয়ে চাকাওয়ালা বেডটাকে খোলা জানালার পাশে এনে দিলো। বাইরে বসন্তের হাওয়া, শাদা ধবধবে আকাশ, তারা উঠবে; অরুন্ধতী, স্বাতী, সপ্তর্ষির আলোকোজ্জ্বল্যের ভেতর বিশু যেন ঢুকে পড়ে— পৃথিবী তোমার বুকে ঘুমানোর অধিকার আমার আছে! এ-বিস্তৃত আকাশ, তারকারাজি, কদমগাছ আর কোকিলের কণ্ঠে যে রক্ত সে-তো আমারই! বিশু সুস্থ হয়ে উঠলো আরও পনেরো দিনের মাথায়। আত্মবিশ্বাসী হলো কিছুটা। তার মনে হতে লাগলো যাদের হত্যা করেছে— হত্যা-পরবর্তী তার মনোজগৎ কী ধরনের আচরণের জন্ম দিয়েছে, কোথাও কখনও বলেনি, কিন্তু ভোলেনি। হত্যা করেছে যাদের, ওই পরিবারের খুব দূরবর্তী স্বজনকে দেখলেও সেখান দিয়ে সে বারবার ঘুরতো, বিশু বিশ্বাস করতো তারা এমন কোনও আচরণ নিশ্চয় করছে যা প্রতিরোধ করা দরকার, অথচ দেখা যেতো তারা স্বাভাবিক, সেটা বিশু পরে বুঝতো, কতো নিরীহ লোককে বিশু তার প্রতিপক্ষ বানিয়েছে, তার গায়ে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে, কাল্পনিক ধারণা নিয়ে অপেক্ষা করেছে, তাদের কাছ থেকে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া পাবার জন্যে। না-পেলে বিশু হিংস্র হয়ে উঠতো। দলের একজন ডাক্তার তাকে রিলাক্স হবার জন্যে ট্যাবলেট দিয়েছিলো। পুলিশ দু’জন গল্প করছিলো নির্বিকার। কোকিলটা ডেকে উঠলো। বিশু পেশাব করতে চাইলে একজন পুলিশ তাকে ইউরিনালে নিলো। ফিরে এসে বিশু বেডে না গিয়ে চলে এলো জানালার কাছে।

বিশু বিশ্বাস। চোখের নিচে কাটা। চল্লিশ। খুনের সংখ্যা ডজনখানি। বিপদজনক লোক! স্থির, ধূর্ত মুখ। তাকে ধরতে যৌথ ব্যাটেলিয়ান এক বছরের চেষ্টায় সফল। উন্নত একাধিক অস্ত্র, গুলি-বারুদ যার আওতায় রয়েছে, যদিও সে মুখ খোলেনি। মাজার দড়িটা একটু বেশি ফাঁক হওয়ায় একজন পুলিশ ঠিক করতে আসার আগেই বিশু উপরদিকে লাফ দিয়ে দড়ি থেকে বেরিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে লাফ দিলো। পুলিশ দু’জন বিস্মিত এবং এতোটা হতভম্ব হলো যে, কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো, সময়টুকুকে কাজে লাগাতে চাইলো বিশু। হাসপাতালের এরিয়া থেকে বেরোনোর ক্ষেত্র বলতে পেছনে কিছু নেই, শুধু দেয়াল ছাড়া, সামনেই দুটো গেট। পুবে একটা, পশ্চিমে দ্বিতীয়। বিশুর হাতকড়া লাগানোর কথা ছিলো কিন্তু দেরি হয়ে যাওয়ায় বিশু সুযোগটা নিয়েছে। পুলিশ দু’জন ওই জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে বিশু কোথায় কোথায় অবস্থান নিতে পারে বা কোন্ পথ দিয়ে যেতে পারে এরকম অনুমানে দুইশো পঞ্চাশ বেডের হাসপাতালে সম্ভাব্য কেউ লুকিয়ে থাকতে পারে এমন জায়গা তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগলো। থানায় খবর দিলো। অতি অল্প সময়ের ভেতর এক ব্যাটেলিয়ন পুলিশ পুরো হাসপাতালটা ঘিরে ফেললো। বিশু ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডের ভেতর দিয়ে দৌড়তে লাগলো। দোতলার সিঁড়িটা যেদিক থেকে উঠেছে তার নিচে রয়েছে চারিদিকে ঢাকা টিনের ছোটো একটা ঘর, চতুর্থ শ্রেণির কোনও কর্মচারী হয়তো এখানে থাকে। বিশু ঘরটার ভেতরে ঢুকলো। দরোজা ভেজানো—ঘরে কেউ ছিলো না। বিশু ঘরে ঢুকে কোন্ পথ ধরে এগোবে ভাবছিলো। সারা হাসপাতালে মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে গেলো বিশুর পালানোর খবর। পেছনের দেয়ালগুলোর সঙ্গে বড়ো বড়ো ফুলবাগানের গাছ যেখানে লাগানো আছে তার ভেতর দিয়ে একটা জায়গা করে দেয়ালের দিকে পিঠ দিয়ে বিশু সামনের দিকে তাকাতে লাগলো। খাকি পোশাকের কয়েকজন জোরে জোরে ছোটাছুটি করছে। বিশু একটা গাছের ঝোপের ভেতর দ্রুত বসে পড়লো। এখান থেকে—এই পেছনের দেয়াল থেকে বিশু পুবের গেট ধরবে—এরকম একটা অনুমান করে আবার মাথা উঁচু করলো। সামনে আরেকটা ঘর। ছোটো জানালাটা খোলা—ঘোর অন্ধকার। সম্ভবত লাশকাটা ঘর। বিশু ঘরটার সামনে এসে দাঁড়ালো। এতোক্ষণে কিছুটা হাঁপিয়ে উঠেছে। সামনের নতুন বিল্ডিংয়ের ভেতরে একটা প্যাসেজ, এর কোনও একটা ফাঁকে যদি বিশু যেতে পারে, তাহলে স্বাভাবিকভাবে পুবের গেট দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারবে। হুইসেলের শব্দ! বিশুর পরনে পাজামা আর ফুলহাতা শার্ট, বিশু ভাঁজ করে শার্টটাকে হাফ-হাতা বানালো, তারপর দ্রুতগতিতে নতুন বিল্ডিংয়ের বারান্দায় গিয়ে পৌঁছলো। পাঁচশো গজ দূরে পুলিশের ছোটাছুটি। না, পরিচিত পুলিশ দু’জন না-থাকায় বিশুকে কেউ সন্দেহ করলো না। স্পষ্টত বিশু পুবের গেটটা দেখতে পাচ্ছিলো। সামনে গ্রিল, সমস্যাটা হলো দরোজাটা রয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমে, বিশু সেইমুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিলো দক্ষিণ-পশ্চিমের গেটটা দিয়ে সে বাইরে বের হবে। বিশুর হঠাৎ মনে হলো পার্টির কেউ যদি মটরসাইকেল নিয়ে আসতো, সেক্ষেত্রে তার বেরিয়ে যাওয়াটা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও ইতিবাচক দিকটা থাকতো। বিষয়টা বেশি রোমাঞ্চকর! সামান্য ঘামলো। বেরিয়ে যাবার আগেই বিশুর চিন্তার মধ্যে প্রবলভাবে একটা বিষয় নাড়া দিলো, সেটা এরকম : আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা আর পার্টির কেন্দ্রীয়  কমিটির সভ্যরা—দুপক্ষই অন্ধ! কিছু যুক্তি হয়তো-বা আছে কিন্তু উপলব্ধির জায়গাটা? এই ভয়ানক বিপদের মধ্যে এই চিন্তাগুলো সামঞ্জস্য রাখতে পারছে না, শুধু বিশু এইটুকুই বুঝলো, কোনো কিছুর ভিত্তিতে তাকে পুবের গেট দিয়ে বেরিয়ে যেতে হবে। বিশু আপ্রাণ চেষ্টায় নিজেকে শান্ত রাখছিলো, সে জানে, তার শান্ত থাকার অর্থ প্রতিপক্ষ স্নায়বিক চাপে এলোমেলো হবে, সুযোগটা বিশু তখনই নেবে। আবারও হুইসেলের শব্দ! বিশু সতর্কতায় টান টান হয়ে দাঁড়ালো। নিজেকে আর স্থির রাখতে পারছিলো না। অবশেষে বিশু বেরিয়ে গেলো। সামনেই পুবের গেট, নিরিবিলি, এই সামান্য ঝুঁকিটুকু নিলে ওই গেট পর্যন্ত গেলেই তারপর তাকে আর পায় কে? ভুলটা হলো বিশুর এখানেই! কালো এবং খাকি পোশাকের সদস্যরা বারবার ঘুরেফিরে পুবের গেটেই জড়ো হচ্ছিলো, আবার এখান থেকে হাসপাতালের ভেতর যাচ্ছিলো। প্রথমে বিশু এটা বুঝতে পারেনি। এরপরে দুটো বড়ো গাছের পেছন থেকে পাহারায় থাকা সেই দু’জন পুলিশের একজন বিশুকে দেখতে পেয়ে চিৎকার করে উঠলো : ওই তো, ওই যে কুত্তার বাচ্চাটা! বিশু খুব জোরে দৌড় দিলো—গেট পার করবে প্রায়, সেই দুর্বহ মুহূর্তে কোকিলের তীব্র ডাক শুনলো বিশু। এ-স্বরে ছিলো ইঙ্গিত, বিশু বুঝেও ছিলো! লাগলো ঠিক কানের নিচে।

কালো পোশাকের একজন গুলিটা করলো। কদম গাছের ওপর কোকিলটা ডেকে উঠলো!