Home নির্বাচিত লেখা লব্ধস্বর । শান্তনু চেীধুরী ।। প্রবন্ধ

লব্ধস্বর । শান্তনু চেীধুরী ।। প্রবন্ধ

লব্ধস্বর ।  শান্তনু চেীধুরী  ।। প্রবন্ধ
0
0

বই: লব্ধস্বর – শান্তনু চৌধুরী / প্রবন্ধ ও অনুবাদ গ্রন্থ/ উলুখড়, ২০১০

 

লব্ধস্বর

আমারি প্রাণ হতে      মন্ত্রভরা সুধাস্রোতে

পেয়েছে অক্ষত গীতস্বর­­­

প্রথম আলোড়ন মূলত গান গেয়ে ওঠা—আদিগান। এত আততি আর টানাপড়েন, মনে হবে, এ এক উম্মাদক স্বরের উৎসার—কবির আদিম এষণা। শব্দের ফাঁদে স্বরের ভাঁজে কবির মর্মন্তুদ উন্মোচন—একমাত্র নিপুণ, অনবচ্ছিন্ন, বহুলবিস্তার কথার তিমিরে ডুবে যাওয়া।

এমন করুণ—তবু উচ্ছ্বসিত। আচ্ছন্ন অথচ তা এমন এক উদ্ভাসিত সঙ্গীতধর্মিতা যে, কবি-জীবনের ওই আলোকিত আয়োজন, তার গানের নিবিড় স্পর্শে ডুবে যাবার পর, সব অলৌকিক কল্পনাব্যাপিতা তাতে মিইয়ে আসার পর, কবির গানের ভেতর যা থাকে, যা শুধু গান নয়, যা তার অকল্পনীয় নিঃসঙ্গ চিত্তে অনুষ্ঠিত তার আর্তির, তার অভীপ্সার গভীরতম স্বর, অতি স্বচেতনে কবির গড়েপিটে তোলা কোনো ভয়াবহ উপলব্ধি— তার ঘটনাবহ সময়ের নিষ্ঠুর যন্ত্রণাবোধ; ধীর লয়, শান্ত বাঁশির সুরের মতো আমাদের শ্রুতিকে মাড়িয়ে যায়, চেতনা উস্কে দেয়— যেখানে কবি তার স্বরের অতীন্দ্রিয় সৌন্দর্যে শুধু নিরাকার। শুধু স্বর— তার নিভাঁজ প্রবাহে কবি শুধু বরণীয়, ধরা যাক, কবি কেবল আবরণ মাত্র। কেবল নিজের হাতে তার নিজেরই উন্মোচন। কেননা কবির স্বরই তার আত্মসমর্থনের চূড়ান্ত উপায়।

কবি হতে চায় স্বতঃপ্রমাণিত— না, চেয়েছে নিজেরই কণ্ঠের ব্যাপ্তি। চেয়েছে অসম্ভব এ শব্দলোককে নিঃশেষিত করে, তার আড়ালে তারই ‘অর্থময় কোনো ছায়াবিশ্বকে খাড়া করে তুলতে।’ কিংবা তার আকাঙ্ক্ষা এ শব্দপ্রপঞ্চের গহ্বরে কোটি কোটি বিচিত্র প্রপঞ্চের নিয়ত রূপবদল। তাই বিষয়আশয়ের অস্পষ্ট কিমিতি থেকে নিংড়ে তোলা কবির স্বরটি শোনায় অতি বিবিক্ত, কেমন মেদুর, নিষ্কুণ্ঠ আর সর্বাংশে অভিমুখী। তার আকুতি এত সংক্রামক আর বলয়িত যে, তার স্বরের টানে আমাদের সম্বিত বার বার আলোড়িত হয়।

যেন, প্রকৃত তাৎপর্যই ওই গানে; ধ্বনির নিষ্কম্প্র উড়াল, স্বরের প্রচ্ছন্ন বহ্নির আভাসে আছে শুধু গান। আমাদের জ্ঞাত-অজ্ঞাত শব্দের রঙ ও আভায় যেন গান অনুপুঙ্খ জড়ানোপাকানো; এ দৃশ্য, এ বিষয়, এ মাটি ওই সোঁদা বস্তুনিচয় কিংবা আরও ঊর্ধ্বে শূন্যের শোভায় মিলিয়ে থাকা এক অপ্রতিরোধ্য বিস্তার। শুধু কবি তার আকাঙ্ক্ষার ক্ষণিক, নিষ্কলুষ চরিতার্থতার জন্য সে গানের ভেতর বেছে নেয় এমন এক ভাষা, এমন এক চেতনা, এমন কোনো সংকেত—গুরুত্বে গৌরবে গভীরতায় সৌন্দর্যে জ্বলে তার শব্দকান্তি—তার আড়ালে এক বিস্তীর্ণ লয় গড়ে ওঠে ধীরে ধীরে, অগোচরে অন্য কোনো অশ্রুত মর্মর—ক্ষীণ বা তীব্র, মৃদু বা উজ্জ্বল, স্পর্শের মধ্যে অথচ সুদূর; আমাদের শ্রুতি এত অতলে টেনে নিয়ে যায় যে সে ভাবের আবরণে, সে চেতনার ইন্ধনে, সে সংকেতের চকমকি ঘষে জ্বলে ওঠে নির্ধূম অগ্নির মতো কবির স্বর। গানের এই কিনারাবিহীন চিরবিমূর্ত পথে এগুতে গিয়ে কবির তাই জরুরি হয়ে পড়ে—নিজস্ব একটি লয়, ভীষণ বিবিক্ত কোনো স্বর; প্রথম সংস্পর্শে যাকে আমাদের সবচে’ তৎপর, সবচে’ উজ্জ্বল আর কবির প্রকৃত আলোকলক্ষণ বলে মনে হয়।

এই যে আলোর লক্ষণ, এষণাকে সম্ভাবনার কিনারায় নিয়ে আসার এই সঙ্গীতশিল্পিতা আপনা আপনি কবির বুক চিরে জ্বলে ওঠেনি নিশ্চয়ই। এ সত্য মেনে কবিকে আমরা অন্য এক দূরতিক্রম্য দায়িতার মুখোমুখি দাঁড় হতে দেখি। কী সে দায়— যাতে শব্দের বাহুল্য ঝেড়ে অর্থের বিরুদ্ধে কবিকে জাগাতে হয় মর্মার্থের এমন স্বচ্ছ প্রসার? যেন তার ঐক্যসঞ্চারী স্বরের স্পর্শে সব কিছুর নিখুঁত মর্মার্থ গেঁথে তোলাই কবিত্বের লক্ষণ। এই ঐক্য সঞ্চারের গুণপনা যে কবি যত আয়ত্ত করতে পেরেছে, তার স্বর ততটাই প্রভাবশালী, তার কাব্যার্থ ততটুকুই সার্থক। কারণ শব্দ আর শৈলীর আব্রু পেরিয়ে আমরা ভাষার যে অর্থ নিকেশ করি, ঠিক তেমনই করি তার অর্থের নিষ্ঠুর বিনাশও। অথচ কবির মর্মে যে কল্পনাতীত সময়ের অতলান্ত বিষাদ, গ্লানি ও আত্মধিক্কার বা আনন্দের তুরীয়তা, সত্তার গভীরে নিহিত যে গীতল বিদ্যুত আর শব্দের অতীন্দ্রিয় তাৎপর্য কিংবা চিৎপ্রকৃতি জুড়ে যে প্রবল নীরব ভাবের উদ্গার— তার কিমিয়ায় কবির কণ্ঠে আসে এমন বিপুল প্রতিশ্রুতির স্বর—ঈপ্সা ও আর্তির এমন পরিণত উৎসার। জন্ম তার আনুগত্যের মাঝে—অনন্ত শব্দলোকের কাছে কবির আনত হওয়ায়।

অথচ, কোথাও পরাভূত নয় স্বর। বিষয়আশয়ের তাবৎ ঐশ্বর্য ও জঞ্জাল, বাস্তবতার রণরক্তের ঢেউ বা শষ্পশ্যামল প্রেক্ষিত, উপকরণের ভয়াবহ সান্নিধ্য, কল্পনার অরণ্যপ্রতিম জট, পঙ্ক্তিপ্রণালীর গূঢ়তম খাদ, সময়ের ধূসর ধূসরতর অবলেপন— কোথাও চাপা পড়েনি স্বর। কবির জীবদ্দশায় যে নিবিড় অনুধ্যান আর প্রতীতিকে ঘিরে চলে তার স্বর সঞ্চারের তৎপরতা, তার ভিন্নতর সংবেদন জাগানোর ক্ষমতা— তা আদিগানের কোনো নবায়িত নির্বাচন। আদি ইচ্ছাশক্তির পুনরুদ্ধার। যেন সমগ্রতার ছিন্নবিচ্ছিন্ন, চূর্ণ, খণ্ড, স্ববিরোধী প্রবণতাকে শেষ অব্দি মেলানোর এক আতীব্র চেষ্টা। এই আকুতি, স্বরকে আয়ত্তে আনার এই নিয়ত বাসনা পরিণামে কবিকে জয়ী করেছে— কবির নিষ্ঠা বার বার বশ মানিয়েছে অপাংক্তেয়, নির্মম শব্দকেও।

For last year’s words belong to last year’s language

And next year’s words await another voice.

… … … … … … … … … … … … … …

Since our concern was speech, and speech impelled

us

To purify the dialect of the tribe

And urge the mind to aftersight and foresight,

Let me disclose the gifts reserved for age

To set a crown upon your lifetime’s effort.

কাকে বলি স্বর— যদি তা না হয় ভিন্ন কোনো ঋজু বিবর্তনরেখা, না হয় অনধিগম্য নিঃশব্দলোকে কবির অতি ধীরে ধীরে এগোনো? বরং অন্তর্জীবনের এই রূপবদলই তো সত্য। সব কালে এ নিরাবরণ নিষ্ঠুর সত্যই ছিল কবির আত্মরক্ষার বর্ম। শুধু বর্ম নয়, সময়ের অগ্নিজলের পরীক্ষা উতরানোর মোক্ষম উপায়। যেন আবর্তিত— তবু এই সচল প্রবণতাকে নতুন করে কবির কণ্ঠে জাগিয়ে নিয়ে স্বরের উত্থান। সময়-সময়ান্তরের নানা স্বপ্নে, কবির বিচিত্র এষণায় তা শুধু বহু কণ্ঠে বহুল স্বরে উদ্গীত হয়েছে মাত্র। যেখানে সময়কে শিয়রে রেখে কবির জীবন, তখন শুধু শব্দের নির্বাক নিয়মানুবর্তিতা তার শেষ কথা নয়; অর্থের স্থাবর চূড়াগুলোও কালক্রমে নুয়ে পড়ে, হারায় ইঙ্গিতের সব সূক্ষ্ম গুণপনা। কেবল তার স্বর অনুসরণ করে আমরা তার সমসাময়িক বোধের গহ্বরে, তার অন্তর্জীবনে, কাব্যসুষমায় প্রবেশ করি, যা তাকে ঘিরে ঘটেছে, যা ছিল তার প্রথম আলোড়ন।

যেহেতু আমাদের স্মরণচিহ্ন, কীর্তি ও স্মৃতি, অস্তিত্ব আর অনস্তিত্বের প্রমাণ, বা, উড়াল ও অবতরণের অভিজ্ঞান এক অনবচ্ছিন্ন স্থির সময়ের চড়াই-উৎরাই নিয়ে বিস্তৃত। তাই সব স্বরের বিবর্তনে, প্রতিটি শৈলীর অবলোকনের পেছনে অন্তত সময়ের ভূমিকাই মুখ্য। কিন্তু কবির উপস্থিতি সেখানে শুধু উপলক্ষমাত্র। বলা যায়, এ মহাসময়ের ভেতর কবি একটি প্রত্যাশিত রন্ধ্র; তার কণ্ঠ চিরে শব্দের আড়াল থেকে যে অন্ধকার অতল স্বরের অবতারণা—ব্যাপ্তি তার বহুল বিচিত্র, আর্জি তার সমগ্রতার অসহ তাড়না ছেড়ে ওঠা। তার উৎসার এমন কৃষ্ণকায়, তবু কেমন ঐক্যসঞ্চারী।

নিখিল নাস্তির অন্ধকারেও চেনা যায় তার বিবিক্ত অবয়ব। যেন স্বর এমন অমোঘ আর্জি শানিয়ে তোলে—তাতে মর্মন্তুদ মরণও হয়ে ওঠে কী গভীর রমণীয়, কবির অপরিমেয় অন্তর্দ্বন্দ্বও শোনায় কেমন স্বাভাবিক।

এত অখণ্ড অপরিসীম সময়— তবু কবির থামার উপায় নেই। তার পরিক্রমণ সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ। নিঃসংশয়ে বলা চলে, এ একাকিতার মাঝে, সবার অলক্ষ্যে, কবি ফিরে যায় শব্দের উৎসে, খুঁজে পেতে বের করে শব্দের হারানো সৌকর্য, শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়ে বিস্মৃতির নিচে চাপা পড়া ছন্দ ও শৈলীর ছড়ানো শিকড়, দূর আর অস্পষ্ট শব্দ-অলংকার, উপমার উপলবন্ধুর পথ, বা আরো একাকার অনেক বিবর্ণ চিত্রকল্পের পারম্পর্য, কল্পনাসূত্রে পাওয়া শব্দের সংস্কারবোধ; বের করে জ্ঞাত-অজ্ঞাত আশ্চর্য সব শব্দকান্তি— এক অপ্রতিরোধ্য কণ্ঠস্বর।

সময়ের এই ঘেরাটোপের মধ্যেও এ স্বর সচল, বিন্যস্ত আর নৈঃশব্দের সঘন রহস্যভরা; অথচ স্বতঃস্ফূর্ত, আত্মার ভেতর থেকে ভীষণ মোচড়ে ওঠা, দৃশ্যত প্রখর, অদ্ভুত প্রভাবশালী, ভবিতব্যকে প্রতিহত করে এ স্বর দাঁড়ায়; কি শৈলী কি প্রকরণে, স্বর যেন কোনো অপ্রত্যাশিত আকাঙ্ক্ষার আবর্তে, কোনো বিশেষ কারণে হয়ে ওঠে অভূতপূর্ব আলোর সম্ভাবনা—যেখানে কবির কল্পনার অসামান্য মর্মার্থ আমাদের শ্রুতিগোচর হয় তার বিবিক্ত স্বরটির আশ্রয়ে।

Behind each was a spirit like the rising of the Sun.

It was a sight beyond joy and beyond dancing. Then

a voice said to me it is the music that frays and

breaks the sting.

কবির এই স্বর লাভের তাড়না, সর্বাংশে, সব কালে মহৎ কবিদের তর্কাতীতভাবে আলাদা করেছে। একেক জন কবির স্বরকে ঘিরে এসেছে একেক ধরনের শব্দ-শব্দার্থ; কখনো বিকীর্ণ, কখনো উজ্জ্বল-উন্মাতাল, কখনো অগম্য, কঠিন ও নির্বিকার অথবা প্রদীপ্ত, কখনো বিক্ষিপ্ত কিংবা শান্ত; কাব্যশরীরে এসেছে ছন্দ-শৈলীর কত কত বিবর্তন, পরিবর্তন— কল্পনা ও চিত্রময়তায় এল কত কী বিচিত্র প্রেক্ষা, যুগে যুগে নতুন কবি তার নিজেরই স্বরের ওপর ভর করে অবতারণা করল নতুন আর্জির, আর তাতে ফুটে উঠল অপূর্ব সব কাব্যার্থ। কিন্তু সব কালে কবির স্বর ছিল তার সময়ের শর্তে, রুচি ও উদ্ভাসে পৃথক। যেন, কবির সমকালে নিজের মধ্যে কোনো গোপন প্রত্যক্ষ থাকে তার, নিজের কোনো কল্পিত প্রয়াসের ব্যূহে কবি মানেন তার একাকী রুদ্ধতা; যেন সারা জীবনভর শব্দগুলো নিয়ে কোনো দুরূহ সমদর্শিতার পরীক্ষা তাকে দিতে হয়, নিজের অলক্ষ্যে কাব্যিক নীতির ওপর তাকে আরোপ করতে হয় স্বকীয় এক নীতি কিংবা খুঁটিয়ে তুলতে হয় স্বরের অনির্বচনীয় এক সম্ভাবনা। কেননা, স্বর লাভ না হওয়া অব্দি কবিদের অস্তিত্ব ভিত্তিহীন। বলা যায়, স্বরই কবির অস্তিত্বের, তার প্রাতিস্বিকতার মেদুর সূচনা।

শুধু স্বর। তবে, শৈলী আর বিষয়আশয়ের সেই আদি থেকে চলে আসা মারাত্মক রক্তারক্তি নয়, শব্দ আর অলংকারের কৃতিত্বও নয়, নয় কৃতকৌশল কিংবা অসংখ্য প্রতিমার নির্বাক প্রবর্তনা। শুধু স্বর— কেবল ওই জ্বলন্ত আর্তির ধ্বনি, কোনো উন্মোচিত আহ্বান, যা আমাদের শ্রুতিগহ্বর ডুবিয়ে দেয় ‘কল্জে ছেঁড়া কথার তিমিরে’। আমরা নিস্তব্ধ হয়ে শুনি তার মহৎ, মর্মস্পর্শী এষণা। বেদনাসহ— তবু ধী আর অভীপ্সায় আচ্ছন্ন কী নিখুঁত আনন্দধ্বনি; মনে হবে অন্তহীন, শব্দায়ুধে বলীয়ান, এক চিরস্থায়ী স্থাপত্য সংহতি কবি ফুটিয়ে তোলে তার নিজের লব্ধ ক্ষমতাবলে।

কী সেই ক্ষমতার উৎস— যা সময় ঠেকিয়ে রাখে, আমাদের রক্তে পৌঁছায় কবির এষণার অমিত আলোড়ন, কিংবা শ্রুতিকে বধির করে ঢুকে যায় কোনো বোধের কম্পন? অভিজ্ঞতা বলে, প্রতীতি ও অনুধ্যানে কবিরা সব কালে এই অনিশ্চিত শব্দসঙ্কুল পথে পা বাড়ায়, শব্দ-শৈলীর পুনরুদ্ধারে বেরোয়। প্রচলপ্রথা ছেড়ে নতুন কবি পৃথক প্রথা নতুন স্বর সঞ্চার করে। কিন্তু যে স্বর দুর্বল, আর্তি জাগাতে অসমর্থ তা একদিন নৈঃশব্দ্যের খাদে চাপা পড়ে যায়। কখন, কিভাবে, কোথায় স্বর কবির কণ্ঠ চিরে বেরুবে তার নিশ্চয়তা নেই। নিশ্চয়তা নেই বলেই স্বরকে ঘিরে চিরকাল কবিদের এই প্রবল ঔৎসুক্য। ঈপ্সিত অথচ আশাতীত, নিশ্চিত তবু কী অনিশ্চিত, বা এমনই এক ভয়াবহ তাড়না কবিকে স্বরের আবহে আজীবন সমাধিস্থ করে রাখে। কেবল তার মর্মে থাকে তার নির্বিকল্প প্রতীতি।

তবে কি প্রতীতির জোরে কবি বেরোয় তার স্বরটির সন্ধানে? নিভৃতে, বিক্ষিপ্ত কণ্ঠটি হয় উদ্দীপ্ত। মৃদু কিন্তু স্পষ্ট, অনবচ্ছিন্ন; দেখতে দেখতে স্বরের অন্ধকার ঊর্মিমালা হয় ক্রমশ স্পষ্টতর, ছন্দের ঘূর্ণিত স্পর্শে জাগে বিপুল প্রতিমা, এভাবে অসংখ্য প্রতিমা হয়ে ওঠে একত্রে এক অমিত বিচ্ছুরণ আর যূথবদ্ধ; শব্দের সঙ্গে শব্দের নিয়ত সংঘাতে অনেক নিষ্ক্রিয় প্রতিমা সক্রিয় হয়ে ওঠে নতুন করে। শুধু কবির প্রতীতির রেখা অনুসরণ করে আমরা দেখতে পাই— তার দৃশ্যমানতা, ওই অপ্রতিম প্রতিমার আড়ালেও বয়ে চলেছে কোনো সূক্ষ্মতর গান— এভাবে ফুটেছে বিবিক্ত একটি স্বর— যা না হলে কবির সৃষ্টিপ্রতিভা তার করে পুরোপুরি চেনা যায় না। প্রতীতির এই অতীন্দ্রিয় জোরই তো চিরকাল কবির অস্তিত্বকে আলো করে দাঁড়িয়েছে। স্বরের ঈষৎ সংবেদন, তার নীরব সৌকর্য আমাদের কেবল চমকিত নয়, প্রকৃতঅর্থে অনুগতও করে।

                প্রভু, দিনমানের চূড়া পেরুবার

                আমাকে যোগাও সেই তেজ উল্লাস।

এভাবে গানে গানে জন্ম নেয় কবি। কিন্তু কোন মর্ত্যরে প্রেমে পড়ার ফলে তার উদ্ভব? এমন কোন মুহূর্ত, যখন কবি থাকে সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ ও জর্জরিত। চরিতার্থতার প্রবল আকাঙ্ক্ষার ঘরে-বাইরে কবি নিয়ত উন্মুখ। সন্দেহ নেই, কবি চাইবে তার জ্ঞাত কালকে পার করে, জনান্তিকে, অন্য কালের কাছে তার আর্তি পৌঁছুতে, চাইবে তার স্বরটি সব কালের আত্মিক প্রতিকল্প করে দাঁড় করাতে। তার প্রচণ্ড সংক্ষোভের চিহ্ন, অন্তত অমন নিষ্প্রতিকার মর্মযন্ত্রণার ভার নিয়ে— পদে পদে অনিশ্চয়তার জট, শব্দের অরণ্যে ডুবে থাকা ঘেরাটোপ, ছন্দের অসীম চোরাস্রোত চিনে কবিকে সামনে এগোতে হয়। তবু তার স্বর কোথাও অবলুপ্ত হয় না। বরং এত বিপর্যয়কর অতিক্রমণের পরও, দেখা গেল, সুধাসাগরের তীরে কবি একাকী উত্তীর্ণ।

কেননা, সব তর্কের পরও কবিরা অদৃষ্টবাদী নয়— তার আস্থা তার অন্বয়েচ্ছায়। যদি অভীষ্ট থাকে সকল দ্বন্দ্বের অবসান, শব্দের নির্ভার সংঘর্ষ, অর্থের আড়াল থেকে মর্মার্থের পুনরুদ্ধার, তবে যে একাকী অনুধ্যানে কবির স্বরের ব্যবহার, তা’সব কালে আমাদের সংবেদন সমান নাড়িয়ে দেয়। যেন খাদে-নিখাদে সবখানেই কবির থাকে অবাধ সঞ্চরণ। কেউ বলেন, এটা আসলে কবির এক ধরনের অকল্পনীয় জাগ্রতদশা। সমন্বয়ের বোধ। বহু শব্দ আর বহু বর্ণের একত্র উদ্ভাস— কবির প্রবল অন্বয়েচ্ছায় যা চিত্রল সঙ্গীতে স্বরের পর স্বরে বিধৃত—আমাদের শ্রুতিগহবর উপচে, চেতনাবচেতনের দ্বার উৎরে, চুপিসারে, তা’ আরো ঊর্ধ্বে প্রবহমান।

কবির চমকপ্রদ দায়টি যেন শেষমেষ তার স্বতন্ত্র ঐক্যসঞ্চারী স্বরপ্রবাহ। সেই মহাপরিকল্পনা। সুরের শেষতম চূড়ায় পৌঁছানোর বিপুল উদ্যোগ। মনে হবে, কোনো অভিসারী আলোড়নের ভেতর দিয়ে কবি পৌঁছে যেতে চায় সেই বিন্দুতে— যেখানে আমাদের সব সংশয়, সময়ের সব দ্ব্যর্থবোধ ঘুচে যায় নিমিষে। আমাদের গোচরে আসে কবির ওই ক্ষণিক মানসিক আরোহণের লক্ষণ, অবলোকনের অনুপুঙ্খ চিত্ররূপ, তার এষণার ছবি। অনুভব করি, কী ভয়াবহ তাৎপর্যে কবির সমস্ত কল্পনা, তার তীক্ষ প্রতিভা দীপিত হয়েছে অনির্বচনীয়, নিরাকার স্বরপ্রবাহে।

শব্দ থেকে শব্দে— কবির গড়েপিটে তোলা প্রায় অলৌকিক প্রবাহের মধ্যে, আমরা টের পাই একেকজন কবির অরণ্যের মতো বিস্তীর্ণ তার স্বরের অধ্যাত্ম ঐশ্বর্য, চিত্রময় পরম্পরা, ঘটনাবর্তের নতোন্নত গীতল এক বিস্তার। পর্বের পর পর্ব জুড়ে তাতে ওতপ্রোত মিশেছে কবির ইচ্ছার উত্তাপ, নির্লিপ্তির গলিত তুষার, যন্ত্রণার সব অসহ স্ফূরণ; কবির আর্তির বশে অনেক জাগ্রত কল্পনা, অভীপ্সা ও স্মৃতি হয়ে ওঠে হীরের মতো উজ্জ্বল— চিরায়ত। যেন, কবির অন্বয়েচ্ছা তার অন্ধকার একটি প্রবাহ ও বিপুল বিস্তার অনুষঙ্গের বোঝাটি আমাদের শ্রুতিবিবরের মধ্য দিয়ে টেনে নিয়ে চলেছে অন্য কোনো অমোঘ ও স্থির মহাসঙ্গীতের দিকে। কবির স্বরের এই গতিশীল মহিমা তাকে চিরকাল এ মর্ত্যরে অতি ব্যবহারে নিষ্প্রভ, শ্রীহীন শব্দসঙ্কুল পথ পার করে দিয়েছে। তাই মহিমালব্ধ কবির অতি ক্ষীণ স্বরও মনে হয় তার নির্মম রক্তক্ষরণের মূল্যে সঞ্চিত। আকুতি ও দ্যোতনার আলোয় সমান তেজষ্ক্রিয়। উপকরণের ওই অসীম প্রাচুর্য, শব্দের শ্রী কিংবা দাহিকাশক্তি, নৈঃশব্দ্য ও ব্যঞ্জনার বুনোব্যাপিতা, তাৎক্ষণিক বা চিরকালীন মর্মার্থ— এ সবই তো এক গভীর সঙ্গীতে পুরো স্বর জুড়ে অলৌকিক মহিমায় জ্বলমান।

সঙ্গীত আমাদের শ্রুতির, এমনকি দৃষ্টিরও বিমূর্ত কেন্দ্রে শায়িত

অপরিমেয় শক্তিকে করে অবমুক্ত, একে আমরা উপলব্ধি বলি১০

জ্বলছে জ্বলছে। শুধু আজন্ম দগ্ধতা। যেন চিরপ্রণম্য এ দাহিকাশক্তি কবির যন্ত্রণাকে অভিষিক্ত করল সৌন্দর্যে, একাকিতার যন্ত্রণায় পুড়ে যাওয়াকে কবি করল গভীর অর্থময়, বা, গানে গানে এ যন্ত্রণাই স্বরিত হল বার বার। যেন স্বরের পেছনে থাকে কবির অশরীরী জ্বলন্ত উপস্থিতি। যদি বলি, এভাবেই কবিরা পরস্পরবিরোধী আবেগের যুগপৎ সমারোহে আর বিবিধ আততি মিলিয়ে তার বিবিক্ত যন্ত্রণাকে আমাদের চিনতে শেখায়— তবে শব্দ নয়, শৈলী কিংবা প্রকরণও নয়, অন্য কোনো অসম্ভব যন্ত্রণাই জানিয়ে দিয়েছে স্বরের নিহিত তাৎপর্য। শুধু নিজেকে নিখুঁত উন্মোচিত করতে পারলেই স্বর কবির কণ্ঠে নিশ্চিত বিকশিত হবেই— স্বরের অসীম দাহিকাশক্তি ঠিকই তার অজ্ঞাত কোনো কাব্যার্থ ফুটিয়ে তুলবে— তার এমন কোনো সংজ্ঞার্থ, যার আর্জি ছিল এর আগে আমাদের সম্পূর্ণ অজ্ঞাত।

যে কোনো মহৎ কবির ওই বিরাট বিপুল অন্ধকার গানের ভেতর স্বরকে লক্ষ্য করা হোক না কেন, তার অদৃশ্য প্রবাহে শোনা যাবে চাপা আর্তির মতো কবিকে শনাক্তকারী কোনো ইঙ্গিত— তাতে আড়ষ্টতা নেই, সংশয়ের ছায়াও পড়েনি। বরং শব্দের সংহতি ও টানাপড়েন, প্রাচুর্য ও রিক্ততা সত্ত্বেও তবু সেই অনাদিকাল থেকে কবির বুক চিরে বেরুনো তার এই ঐক্যসঞ্চারী স্বর আমাদের রক্তে ও চিত্তে, শ্রুতি ও দৃষ্টিতে ফুটিয়ে তোলে প্রতিটি কবির ভিন্ন এক আবেদন।১১ ইতোপূর্বে কাব্যজগতে যে বোঝাপড়া হয়ে গেছে বলে আমরা জেনেছি, দেখা গেল, নতুন কালে নতুন কবির কণ্ঠস্বরে তা আরো ইঙ্গিতপূর্ণ রহস্যময়তায় কেমন জ্বলমান। আসলে, যে কোনো স্বরপাওয়া কবি শব্দের অপরিমেয় শৃঙ্খলার ভেতর এমন কোনো মর্মার্থ বের করে, যা তার আগে, আর কারো সংবেদনের অধিকৃত ছিল না— এমন প্রখর আর আচ্ছন্ন পরিমণ্ডল, যাতে শব্দের পর শব্দ জুড়ে থাকে মর্মার্থের গোপন কোনো ভার। কেবল, স্বরের এই শনাক্তকারী উন্মেষ দেখেই আমরা বুঝে উঠতে পারি একেকজন স্বরপাওয়া কবির প্রতিমা ও প্রেক্ষিত, তার কল্পনার সুবিশাল উপত্যকা। সামান্য বিহঙ্গদৃষ্টিতে তাকালেই টের পাওয়া যায়, অর্থের বিরুদ্ধে কবির মর্মার্থের চিরকালীন প্রতিশোধ। শোনা যায় স্বরের মনোহর উত্থান। কে নয় স্বরের উত্থান— যে কবি সপ্রাণ যে-কোনো মুহূর্তে জ্বলে উঠতে পারে, যার স্বর সব দুঃসহ নিঃশব্দতা ঘুচিয়ে দেয়, রক্তের টানে যন্ত্রণার আগুনে কণ্ঠে ওঠে যে আগ্নেয় উৎসার, বা, যা বিনা ব্যাখ্যায়, অজ্ঞাত সংঘাতে পাওয়া কারো একক সৌকর্য— যাকে বলি উদ্যম, বলি অনুধ্যান, মূলত যা কবিজীবনের একমাত্র চালিকাশক্তি— স্বর তারই নামান্তর।

ফলে, আর্তিহীন এষণাহীন কোনো স্বর নেই। স্বরের নতুনতর আলোড়নই স্বরপাওয়া কবির প্রথম বিবিক্ত লক্ষণ। স্বরের গভীর উন্মেষ ঘিরে কবির সমস্ত লক্ষণ এমন জ্বলমান আর বহুধা বিকীর্ণ, তাতে কবির সব জটিল কৃৎকৌশল আর নিপুণ সক্রিয়া সত্ত্বেও তার স্বরটি এমন নিষ্কুণ্ঠ, নিভাঁজ, এত অবাধ ও সমাদৃত— গড়ে তোলে গানের ভেতর এমন নিজস্ব স্থাপত্যসংহতি, স্বরের বিস্ময়কর ক্রমপরম্পরা— যেন কবির সত্তার গভীর স্পর্শে, তার সুস্পষ্ট লয়ের ছোঁয়ায় আমাদের শিথিল মনোনিবেশ, আমাদের অসাড় হয়ে-পড়া কৌতূহল হয় বার বার পুনরুজ্জীবিত।

 

টীকাভাষ্য

১.            গীতহীন, চৈতালী; রবীন্দ্রনাথ।

২.            যে ওঙ্কার সেই প্রাচীনকাল থেকে কবির মনে প্রত্যয় জাগিয়েছিল, যে উদ্গীত ধ্বনির মূর্চ্ছনায় বাল্মীকি কিংবা কালিদাসের জড়বুদ্ধি ঘুচে গিয়েছিল—সেই আদিসঙ্গীতই আজ অব্দি কবির আরাধ্যই থেকে গেছে। হোমার বা থিয়োক্রিটাস, ভার্জিল কিংবা ওভিদ, হোরেস থেকে কাথুল্লাস—কি প্রাচ্যে, কিংবা পাশ্চাত্যে সব কবিই প্রকৃতি-সৌকর্যের গোপন বীজের গানই নিজের কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন।

ওই বীজ ফেটে বিশুদ্ধ কবিতার প্রথম তরঙ্গ রোমান্টিক আন্দোলনের শুরু। আরো পরে, দ্বিতীয় তরঙ্গের ভেতর থেকে প্রতীকী আন্দোলনের জন্ম। এই দুই তরঙ্গের সঙ্গমস্থলে বড় কোনো কবি না হয়েও পো’র নামটি নিতে হয়। পো’ই কবিতায় সঙ্গীতের ভূমিকা প্রথম স্পষ্ট করে তোলেন। এক্ষেত্রে, তার Philosophy of composition এবং Poetic principle রচনা দু’টি স্মর্তব্য। তার নন্দনতাত্ত্বিক মতামত হচ্ছে, সঙ্গীতের খাঁটি গুণপনাই কবিতার জরুরি উপাদান; যাতে মিশে থাকে এক ইঙ্গিতময় অনির্দিষ্টতা যা থেকে কবিতায় অতীন্দ্রিয় সৌন্দর্যের সৃষ্টি (Creation of Supernal Beauty)। তিনি বলেন, ““Contrive to tone them down in proper subjection to that Beauty which is the atmosphere and the real essence of the poem.”

বিশ্বসাহিত্যে এ দুই তরঙ্গ থেকে যে তোলপাড়, যে নানা আন্দোলনের জন্ম-জন্মান্তর, ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি এসে সমালোচক হিসেবে ওয়াল্টার পেটার আর কবি হিসেবে সুইনবার্ন ও বোদলেয়ার ঘোষণা করেন, ‘সব শিল্পই সঙ্গীতের একটি রূপ পেতে চায়।’মালার্মে, ভের্লেন, র্যাঁবো, কোরবিয়ের কিংবা ভালেরীর আলোচনা করতে গিয়ে আর্থার সাইমনস্ “Simbolic Movement in literature” গ্রন্থে অস্পষ্ট এই ইঙ্গিতময় আদিগানকেই কাব্য সৃষ্টির মূল কারণ বলে উল্লেখ করেন, তার মতে, প্রথমত তা হয়তো সম্পূর্ণত শব্দহীন একটি ধ্বনিস্পন্দন মাত্র। ক্রমে চিন্তা অনুভবের ওপর দানা বাঁধে। কাব্যশরীরে সঙ্গীতের মিশে থাকার গোপন কথাটি এই। কবি নিরন্তর কোনো সূক্ষ্ম সঙ্গীত তৈরি করে তার কাব্যের জন্য। গানের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ জুড়ে দিয়েছিলেন ছবিকেও। কথাটি অনেকটা এলিয়টের ‘শ্রুতিনির্ভর কল্পনা’(Auditory Imagination) শব্দবন্ধটির মতো শোনায়। কবি এলিয়টের মতে, কবিতা বোধগম্য হবার আগেই সঞ্চারিত হয়। ভাষা যে বিশেষ আবেদনের মাধ্যমে সঙ্গীতের দিকে বাঁক নেয়, এলিয়ট দান্তে বিষয়ক তার অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণকারী ‘The Music of Poetry-তে বলেন, শব্দের সাহায্যে নয়, যে সুরে ওই শব্দসমষ্টিকে কবিতায় ব্যবহার করা হয়েছে তার মাধ্যমেই কবি সেই প্রাচীনকাল থেকে পাঠকের মনে প্রত্যয় জাগায়। প্রতিমাবাদীদের চিত্রের অনুধ্যানেও রয়েছে এই মহাসঙ্গীত। প্রচলিত ছন্দস্পন্দন থেকে কবিতাকে মুক্তি দিতে গিয়েও ওরা বরং অধিকতর সূক্ষ্ম সঙ্গীতেরই সৃষ্টি করেছে। য়েটস্, লোরকা বা জীবনানন্দের অতীন্দ্রিয় স্বপ্নকল্পনা ও মৃদু লোকসুর বার বার মনে করিয়ে দেয় : গানই কবির বিকাশে একমাত্র অনুঘটক।

৩.           আজকাল শিল্প-সাহিত্যে ‘অর্থ’ খোঁজা অনেক ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়াপ্রবণতা হিসেবে দেখা হয়। “Against Interpretation”-এ সুসান সনটাগ অর্থ কথাটি মনের কোনো সচেতন সক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এতে উদ্ভাসিত হয় কোনো সুস্পষ্ট রীতি, অর্থের কোনো সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলা, তিনি বলেন, “In a culture whose already classical dilemma is the hypertrophy of the intellect at the expense of energy and sensual capability, interpretation is the revenge of the intellect upon art. Even more. It is the revenge of the intellect upon the world. To interpret is to improverish, to deplete the world—in order to set up a shadow world of ‘meanings’. It is to turn the world in to this world.”

৪.            Little Gidding, Four Quartets: T. S. Eliot

৫.            Darkness Visible; William Golding.

৬.           তরঙ্গিত প্রলোভন, সোনালী কাবিন; আল মাহমুদ।

৭.            James Joyce, Gorge Luis Borges.

৮.           সব কবিই তার কল্পনায় প্রত্যক্ষ জগতকে, বিচিত্র দৃশ্যমানতাকে শব্দে, রঙে বা অন্য কোনোভাবে সকলের গোচরে আনতে চায়। কল্পনায় প্রত্যক্ষ বস্তু বা বিষয়ের, প্রেক্ষিত বা অনুষঙ্গের অনেক কিছুই হয়তো শেষমেশ থাকে না। যেটুকু চোখে পড়ে তা’শেলীর মতো কবির মূল ধারণার সম্ভবত ক্ষীণতর কোনো ছায়া। কবি চরম পরস্পরবিরোধী সব উপাদান ও অনুভূতির বিশৃঙ্খলার মধ্যে সবসময় সমন্বয়ের তীব্র প্রয়াস চালায়। কবির একীভূত করার এই আকাক্সক্ষাকে কোলরিজ বলেছেন অন্বয়েচ্ছা (Esemplastic power)।

৯.            শব্দ থেকে শব্দে গড়ে তোলা নিখুঁত ধ্বনিসঙ্গতিময় কবিতাকে পো বলেছেন, সৌন্দর্যের ছন্দায়িত সৃষ্টি। কবিতায় শব্দের বাহ্য অর্থের সমান্তরালে থাকে এক ইঙ্গিতময় উঁচু স্বর ও ভাবার্থ ব্যঞ্জিত নিচুস্বর। পো’র ইঙ্গিতময় অনির্দিষ্টতা ও সাঙ্গীতিক বহিঃস্বর তত্ত্বের অনুরূপ সম্ভাবনাই আর্থার সাইমনস্ লক্ষ্য করেছিলেন ভের্লেন, র্যাঁবো, কোরবিয়ের, জুল লাফর্গ কিংবা স্তেফান মালার্মে ও ভালেরীর মধ্যে। ভাষারীতির অধিকতর সংবেদনশীল সূক্ষ্ম যে প্রবাহ রয়েছে, যা মূলত একজন কবির বক্তব্য সঞ্চারের একটি কৌশল মাত্র, এফ. এস. ফ্লিন্ট তার নাম দিয়েছিলেন স্বরপ্রবাহ (Cadences)। প্রতিমাবাদী কবি রিচার্ড আলডিংটন যেমন বলেন, একটি নতুন স্বরপ্রবাহের অর্থই হচ্ছে একটি নতুন ধারণা। এ শুধু অনুরণন নয়, তাতে অনুভূতি জাগিয়ে দেয়ার আশ্চর্য আলোড়ন ও সূক্ষ্মতা উদ্ভাবন করেছিলেন মালার্মে ও তার অনুগামীরা। এলিয়ট তাই কবিতা লেখার ব্যাপারে পরামর্শ দেন সম্ভাব্য সবচেয়ে মধুর স্বরপ্রবাহে কাব্যার্থী তার মন পূর্ণ করুক।

১০.         Music and Letter; Stephane Mallarme.

১১.         সাহিত্যে লেখক ও পাঠকের মধ্যে পারস্পরিক এক ধরনের যে মমত্ববোধের সম্পর্ক রয়েছে, সার্ত্রে সৃষ্টিশীলতার এই বহিরঙ্গ দৃষ্টিকে বহুদূর বিস্তৃত করেছেন। ধরাছোঁয়ার বাইরের এই গভীর তাৎপর্যের মাধ্যমে লেখক তার রচনার মাঝে সম্পৃক্ত হতে পাঠকের স্বচেতনাকে আহ্বান জানায়। যেখানে প্রতিটি শব্দই একেকটি কল্পলোকের দিকে পৌঁছুনোর পথ। কথাটি কান্টীয় শোনালেও তিনি সব সাহিত্যকর্মকে এক ধরনের আহ্বান (appeal) উল্লেখ করে বলেন, “To write is to make an appeal to the reader that he lead into objective existence the revealation which I have undertake by means of language.”