Home নির্বাচিত লেখা শাশ্বত বাওবাব । রবিউল ইসলাম ।। গল্প

শাশ্বত বাওবাব । রবিউল ইসলাম ।। গল্প

শাশ্বত বাওবাব । রবিউল ইসলাম ।। গল্প
0
0

বই : তথাগত কোথায় থাকেন – রবিউল ইসলাম / গল্প / ২০১৭, উলুখড়

শাশ্বত বাওবাব

এক.

একটি বাওবাব বৃক্ষ আমার ভেতরে বাস করে। অনেক গভীর মর্মমূল পর্যন্ত তার শেকড় ছড়ানো। আমিও বাস করে আসছি চির-পুরাণের শাশ্বত এক বাওবাব গাছের গুহায়। এক সময়হীন ঈশ্বর আমাকে সবসময় আগলে রাখছেন। যে স্বয়ংসম্পূর্ণ গুহাটিতে আমি বাস করি, তার উপরে আরেকটি গুহা থেকে প্রতিনিয়ত কাতর কান্না ভেসে আসে। সেই কান্না কখনো থামে না। কবে কে যেন বলেছিল সেখানে আদিমাতা থাকেন। যদিও তার সাথে আমার কখনো দেখা হয়নি। আদিমাতা কেন এভাবে নীরবচ্ছিন্ন কাঁদেন! আর কেনই-বা এ বিলাপ পৃথিবীর কোণে কোণে ছড়িয়ে পড়ে জানি না! আমি যে বাওবাব গাছটিতে বাস করি তার উপর দিয়ে ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত মেঘ একবার করে পাক দিয়ে যায়। তারা আদিমাতার কান্নাগুলো নিয়ে যায় দেশ-দেশান্তরে। তারপর সেইসব মেঘ বৃষ্টি হয়ে ঝরে। লম্বা ঠোঁটের যে কাঠঠোকরা পাখিটি রোজ আমাকে খাবার দিয়ে যায়-তাকে একবার বলেছিলাম ক্রন্দনশীল জগদ্ধাত্রীকে যেন আমার কথা  বলে। যদিও সে বিষয়টি সম্পূর্ণ এড়িয়ে যায়। পৃথিবীর সমস্ত নশ্বরতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই বাওবাব বৃক্ষটি যেন শত সহস্র পুরাণ রচনা করে আসছে।

আমার ভেতরের বাওবাবটি সমস্ত শিরা-উপশিরায় স্নায়ুরজ্জুতে তার শেকড় বিস্তৃত করেছে। রক্তের প্রতিটি কণিকায় তার সরব উপস্থিতি। হয়তো আমার রোমকূপ এমনকি রোমগুলোও বাওবাব গাছেরই শেকড় আর ডালপালা। যদিও তাতে কিছু যায়-আসে না। আমার মস্তিষ্কে যে নিউরন সেলগুলো নিয়ত বিভাজিত হচ্ছে, আমি জানি হয়তো সেগুলো প্রতিটি বাওবাব গাছেরই আত্মা। তারা একদিন জেগে উঠবে এই ধরিত্রীতে। একদিন হয়তো দীর্ঘ শীতনিদ্রা থেকে জেগে উঠে পৃথিবীর মানুষ দেখবে বাওবাব বৃক্ষেরা তাদের পৃথিবী দখল করে নিয়েছে।

একবার রাজধানী আনতানানারিভো থেকে একটি মাদাগাসকারিয়ান বাবুইপাখি এসে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়েছিল আমার গুহায়। তার কাছে একটি গাঢ় টকটকে লাল বক্ষবন্ধনী দেখার পর সে বলেছিল, ফরাসি একট্রেস ইসাবেল আদজানির কাঁচুলি এটি। সত্যিই বক্ষবন্ধনীটি থেকে ফরাসি সৌরভ আর নারীর উষ্ণতা আমার গুহাটিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। সে জানায় – এটি ভালোবেসে তাকে দিয়েছে ইসাবেল! এই কাঁচুলিতে বাসা বুনবে বলেই বসতি ছেড়ে এসেছে বাবুইটি। সে আরো বলেছিল, শীতের রাতগুলোতে যখন চরাচর হিম হয়ে আসে, যখন বাওবাব গাছগুলো ক্রমাগত অশ্রু ঝরাতে থাকে, যখন সাপগুলো গর্তে লুকিয়ে যায়, যখন সিংহের ছানাপোনাগুলো মায়ের পেটের তলে গুটিশুটি মেরে শুয়ে ঘুমে কাতর থাকে, যখন তীক্ষ্ণ শব্দ করে হিম বাতাস বিষমাখা বর্শাফলার মতো পালকের কোমলতা ভেদ করে হাড়ে-মজ্জায় সেঁধিয়ে যেতে চায়-  তখন ফরাসি সুন্দরী ইসাবেলের স্তনের মাপের এই কাঁচুলিটি তাকে নিবিড় উষ্ণতা দেয়। তার মনে হয়, সে যেন ইসাবেলের বক্ষযুগলের ওমের মধ্যেই রয়েছে। বাবুইটি বলে, ‘হায় ইসাবেল! আমাকে এতই ভালোবাসতে তুমি!’ বাবুইটি আরো বলে –  ‘কোনোদিন যদি আমাদের দেখা হয় তবে আমি তোমাকে পৃথিবীর সমস্ত প্রেমের হাইনতিনিগুলো শোনাব।’বাবুইটি আরো বলেছিল- ‘সে যখন এই লাল কাঁচুলি দিয়ে বাসা বুনবে, যখন  বাওবাবের ডালে তা ঝুলবে, তখন ফুলে ফুলে রঙিন হয়ে উঠবে মহাবৃক্ষটি। জগতের সমস্ত গাছও ফুলফলে ভরে উঠবে।

সেদিন বাবুইটি সারারাত আমাকে মাদাগাসকারের লোককবিতা (হাইনতিনি) পাঠ করে শোনাল! কবিতাগুলো এতো হৃদয়গ্রাহী আর দুঃখজাগানিয়া ছিল যে, বাওবাব গাছগুলো থেকে অশ্রু ঝরতে থাকল। তাদের পাতাগুলো নুয়ে গেল। হাইনতিনি শুনতে আশপাশের হাতি, জিরাফ এলিফ্যান্ট বার্ডসহ সব পশুপাখি জড়ো হয়ে গেল! জিরাফগুলো পাতাখাওয়া বন্ধ করে কান পেতে থাকল। কাঠবেড়ালি-খরগোশগুলো ইতিউতি লম্ফঝম্প বন্ধ করে গর্তের বাইরে মুখ বের করে বসে থাকল। নেকড়ে ও শিয়ালগুলোর ডাক বন্ধ হয়ে গেল। যে বানরগুলো দিনরাত বাওবাব গাছের এডাল থেকে ওডালে চঞ্চল ছোটাছুটি করত তারা নিস্তব্ধ হয়ে থাকল।

একটি হাইনতিনি ছিল অনেকটা এরকম –

‘ওহে কাকতাড়ুয়া তুমি দেখ, বাওবাব গাছগুলোর নিচে

  খেলা করছে একটি কালো শিশুর আত্মা!’

‘ওহে বাওবাব তোমাকে ডাকছে

 ওই লম্বা ঠোঁটের পাখিটি, যে কিনা

ভ্রমণে যাওয়ার আগে তোমাকে

একটি গোপন কথা বলে যেতে চায়!’

‘ওহে মরু বাতাস, আমার বুকটা কেমন খাঁ খাঁ করছে,

যাও না লাল টিয়া পাখিটির ঠোঁটে চুম্বন করে আস!’

‘ওহে নিঃসঙ্গ বানর কাল যখন পরিপূর্ণ চাঁদ উঠবে

আমাকে তুমি তার গর্ভে ঘুমাতে দিও!’

হাইনতিনিটি শোনার পর আমার ভেতরের বাওবাব গাছগুলো আমার হৃদপি- খামচে ধরে থাকল। যা আগে কখনো ঘটেনি।

দুই.

উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের লেকপার্কে হাঁটতে গিয়ে একদিন দেখা হয় এক আফ্রিকান তরুণীর, যে তার নাম বলেছিল ফ্লোরা এনদোনিয়াইনা এমকোদো। কালো গোলাপ, কালো নারী, আফ্রিকার অতল রহস্য আর বাওবাব গাছের প্রতি আমার আজন্মের টান। বহুদিন আমি স্বপ্নে দেখেছি কোনো এক আফ্রিকান দেবীকে নিয়ে বাওবাব গাছের গুহায় বসবাস করছি। ফ্লোরা ‘হাই’ বললে তার দিকে তাকালাম। আমার বুক ধুকপুক করে উঠল। ফ্লোরার চুলগুলো যেন বাওবাব গাছের ডালপালা আর শাখাপ্রশাখা। আফ্রিকান নারীদের মতো দুই কানের পাশ দিয়ে দুটি লম্বা পাকানো বেণি দুলিয়ে রেখেছিল। দুই কানে ঝুলছে বেশ বড় দুটি ধাতব রিং, যা দারুণভাবে মানিয়ে গেছে তার মুখের আদলের সঙ্গে।

লেকপারের অ্যালমন্ড গাছগুলোর ছায়া মাড়িয়ে দেবদারু আর ঝাউপাতাদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফ্লোরা ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে জানাল, সে তার বন্ধুর সঙ্গে বাংলাদেশে এসেছে আনতানানারিভো শহর থেকে। বন্ধুটি ছিল মোজাম্বিকের নাগরিক। বেড়ানোর জন্যই তারা বাংলাদেশে আসে। বাংলাদেশ অনেক সুন্দর! মানুষগুলোও তার অনেক ভালো লাগে। জরুরি কাজে দেশে ফিরে গেছে তার বন্ধু। শিগগিরই ফিরে আসবে। তাই এখন সে একা। একনাগাড়ে সব কথা বলে সে একটু হাসল!

ভেতরের ধুকপুকানিটা কতটা লুকাতে পেরেছি জানি না। তাকে বলি, ‘তুমি কি প্রতিদিন এখানে আস?’ ফ্লোরা হাসে। সে হাসি স্বর্গীয়! তাকে প্রথম আবিষ্কৃত বুনোফুল আর বিষণ্নতার দেবী বলে মনে হয়! হাসিতে ঝলমলিয়ে সে তার বিষাদ ঢেকে রাখে-  ‘প্রায়ই!’

এই লেকপার্কে আগন্তুকের মতো মাঝেমধ্যে আসি। একা একা হাঁটি। এখানে আসা মানুষের অনেকেই উচ্চপদস্থ আমলা, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা, ফাটকাবাজারি, বিদেশি এনজিও’র অনুদান কি সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎকারী, ক্ষমতাসীন প্রভাবশালী নেতা-মন্ত্রীদের ইয়াবা পাচারকারী স্বজন, স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের সদস্য, পেঁয়াজ-রসুনের মজুতদার পরিবার থেকে আসা অঢেল বিত্তসম্পন্ন ঘরের নারী-পুরুষ। এদের প্রত্যেকের নানা অসুখবিসুখ। দেখতেও একেকজন বেঢপ বেসাইজ। কেউ হার্টের, কেউ বহুমূত্রের রোগী। কেউ মনোবিকলাঙ্গ তো কেউ শরীরপ্রতিবন্ধী! হাঁটতে আসা নারী-পুরুষদের কেউ কেউ ফ্লোরাকে দেখছিল বেশ কৌতূহল নিয়ে! বিষয়টি একটু অস্বস্তির মনে হলেও ফ্লোরার সেদিকে খেয়াল নেই। এ বিষয়ে মোটেই সচেতন নয়। মানুষগুলো জুতা মসমসিয়ে ছুটে যাচ্ছে। মেদ কমাতে হবে! ফিট থাকতে হবে! সুগার কন্ট্রোলে রাখতে হবে! কনসটিপেশন দূর করতে হবে! হৃদপি- সচল রাখতে হবে! ঘাম ঝরাতে তাই প্রাণান্ত চেষ্টা তাদের! কয়েকটি ফুটফুটে কিশোরীও হাঁটছে! হিজাবপরা তরুণী আছে কয়েকজন। ক্রমেই স্বাস্থ্যসচেতন হয়ে উঠছে মানুষ। দিনকয় আগে এখানেই ক্রসফায়ারে মারা পড়েছিল তিন যুবক। তার কয়দিন পর উদ্ধার হয়েছিল সাড়ে চার কোটি টাকার সাপের বিষ!

ফ্লোরার সৌন্দর্যের সাথে ইননোসেন্স আর রহস্যময়তা মিলে যে আবহ তৈরি হয় সেখানে অন্য কোনো ভাবনার ফুরসত মেলে না। সবকিছু ভুলিয়ে দেওয়া এক মানবী যেন। আমরা পরস্পরের মোবাইল নম্বর নিয়ে বিদায় নিলাম।

চলে আসার পর মনে হল ফ্লোরা কি কিছু বলতে চাইছিল? মনে একটা খুঁতখুঁতানি থেকে গেল! এর পর সেদিন সারাটা সময় আমি ছিলাম উন্মনা! খাপছাড়া! চুপচাপ বাসার পড়ার টেবিলে বসে থাকলাম অনেকক্ষণ! কিছুতে মন বসল না। ফেসবুকেও না। এমনকি স্ত্রীর আহ্বানেও সাড়া দিতে পারলাম না। কিছুক্ষণ মাদাগাসকার নিয়ে নাড়াচাড়া করলাম। খ্রিস্টজন্মের দুই হাজার বছর আগে ভারত মহাসাগরের দ্বীপটিতে মানুষের আগমন ঘটে। ১৮ শতকের শেষ দিকে ফরাসিরা মালাগাছিতে কলোনি গড়ে তোলে। খুব বেশি সময় কলোনি থাকতে হয়নি তাদের। ফ্লোরার কথা ভাবি! তার শরীরে কি ফরাসি রক্ত বইছে? মুখের আদল অন্তত তাই বলে! আফ্রিকান ছাঁচ পাল্টে আরো ধারালো হয়েছে। কাল একবার ফোন দেব নিশ্চয়ই।

সকালে ব্রেকফাস্ট টেবিলে পাউরুটিতে জেলি মাখাতে মাখাতে শশী বলে, ‘তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন, কোনো সমস্যা?’ সংক্ষেপে ‘না’ বলে এড়িয়ে যাই। মুখে একটা সিরিয়াস ভাব এনে সে বলে, ‘একটা কথা বলব, উত্তরটা সিরিয়াসলি দিও।’ আমি জানি শশী কী বলবে। বিয়ের আগে-পরে বহুবার এভাবেই কথা বলেছে সে। আমার হাতের কাপ থেকে গরম চায়ের ভাপ উড়ে যাচ্ছে। একটু পর তারও চোখ বাষ্পায়িত হয়ে উঠবে। গলা ভিজে আসবে। এমনই হয় বরাবর। শশী বেশকিছু অনুযোগ করবে যার বেশকিছু অবান্তর। কয়েকটি আংশিক সত্য। কয়েকটি আসলেই সত্য।  সে বলবে-  ‘তুমি আমাকে ভালোবাস কিনা ‘হ্যাঁ’অথবা‘না’ উত্তর দেবে।’ তবে সকাল সকাল তার এমন প্রশ্নে আমি একটু অবাক হই। এ ধরনের প্রশ্ন সে রাতে বিশেষ মুহূর্তে করে থাকে। আর কতবার বলব যে-  এটা আসলে বলার মতো কিছু না। এটা হচ্ছে অনুভবের। বলব কী করে, আমি নিজেই তো এ প্রশ্নের উত্তর জানি না! অনেক সময় আমি চুপ করে থাকি। আজও থাকলাম।

শশীর বাঁ হাতের কানি আঙুলটি কাঁপছিল, ‘আজ সকাল সকাল তোমাকে এ কথা বলছি কেন জান?’

‘কেন?’

‘তুমি তো পড়ার রুমে ঘুমিয়ে গেছ। রাতে আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি। স্বপ্ন না সত্যি এটাও বুঝতে পারছি না।’

আমি চুপচাপ শুনে যাই।

‘দেখি কি আমাদের জানালায় রাতে একটি অচেনা পাখি এসেছে। এমন অদ্ভুত পাখি আমি কখনো দেখিনি!  পাখিটি মানুষের মতোই কথা বলছিল। ঠোঁট অনেক লম্বা। বাঁকানো তলোয়ারের মতো। মাথায় লম্বা রঙিন ঝুটি। এমন কোনো রং নেই যে পাখিটির গায়ে নেই। এসব রূপকথার গল্পেই শুধু পড়েছি।’

তার কথা শুনে হাসলাম।

‘তুমি হাসছ! আমি কিন্তু বানিয়ে বলছি না।’ ওর কণ্ঠে রাগ ও অসহায়ত্ব দুটোই।

‘পাখিটি তোমাকে কী বলল?’

‘সাত দিন তোমাকে সাতটি স্বপ্নের কথা শোনাতে বলল।’

‘প্রথমদিনের স্বপ্ন তাহলে এটাই?’ আবারো হাসলাম!

‘হ্যাঁ, হয়তো এটাই!’ শশী বলল। ওর অভিব্যক্তি সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। সেখানে কোনো অভিযোগ-অনুযোগ নেই। রাগ-ক্ষোভ-দুঃখ-অভিমানের বাইরে এক ধরনের অতীন্দ্রিয় অভিব্যক্তি এমনকি তার কণ্ঠেও। এমন নয় যে শশী স্বপ্ন দেখত না। সে দশজন স্বাভাবিক মানুষের মতো এমনকি দশজন স্বাভাবিক নারীর মতো দুঃস্বপ্নও দেখে। মাঝেমধ্যে ভয় পেয়ে জেগে ওঠে।

‘কাল আরো একটা স্বপ্ন দেখেছি!’ তার দিকে উৎসুক চোখে তাকালে শশী বলে –

‘আমরা মাদাগাসকার বেড়াতে গেছি। অ্যাভিনিউ অব দ্য বাওবাব সড়কে হাত ধরে হাঁটছি দুজনে। তারপর রণপায়ে হেঁটেছি। রণপা থেকে পড়ে আমার একটা পা ভেঙে গেছে আর ডাক্তাররা বলছেন পা-টি কেটে বাদ দিতে হবে। দেখি, একটা বাওবাব বনসাই কিনেছি।’শশীর চোখদুটো বিষণ্ণ হয়, পানিতে ভরে যায়। বিয়ের পর আমরা কোথাও বেড়াতে যাইনি। এই আক্ষেপটা সারাজীবন ওর মধ্যে থেকে যাবে। যখনই কেউ বেড়াতে যায় তখনই এ প্রসঙ্গটি আসে আর ওর চোখ ছলছল করে।

নিজের মধ্যে একটা প্রত্যাশা টের পাই। কেমন যেন অস্থির লাগে। ফ্লোরা কি আমাকে ফোন করবে? অস্থিরতার মধ্যে দিন কাটে। ফোন আর আসে না। নিজেকে হীনমন্য মনে হয়। প্রত্যাশা যখন স্তিমিত হয়ে আসে তখন একদিন কল করে ফ্লোরা। একটু দেখা করতে পারব কি না, তাকে একটু সময় দিতে পারব কি না জানতে চায়। কুয়াশার মতো নরম বিনয়ী কণ্ঠস্বর!

তিন.

সদ্য ভাদ্রমাসের প্রথম শনিবার বেলা ১১টা বেজে ১৭ মিনিটে উত্তরা ১৩ নং সেকটর লেকপাড়ের এদিকটায় গলির ভেতরে বেশ নিরিবিলি। থেমে থেমে দুয়েকটা হকারের হাঁকডাক, গাড়ির হর্ন আর রিকশার ঠুনঠুন শব্দ ছাড়া বেশ নিস্তরঙ্গ আর আয়েশি ভঙ্গি। বাড়িগুলোর দারোয়ানদের মধ্যেও সেই ভাব। লাইটপোস্টের পাশে দুটো চড়–ইয়ের মধ্যে একচোট হয়ে গেল! এ সময়টায় চড়–ইপাখিগুলো বেশ সক্রিয় ও সবাক থাকে। এটা মনে হয় তাদের প্রেমের সময়। দাম্পত্য কলহেরও। চড়ুইপাখিরা ঘণ্টায় কতবার সেক্স করে?

ফ্লোরা যেন আমার অপেক্ষাতেই ছিল। নিজেই নেমে এসে আমাকে নিয়ে গেল। ওর মধ্যে চড়ুইপাখির চঞ্চলতা টের পাই। কিন্ত বাইরে কী শান্ত দেখায়! স্থির, নিটোল! রুমে হালকা আফ্রিকান বিটে গান বাজছে। এছাড়া সুনসান। হালকা আলো, দেয়ালে কয়েকটি মুখোশ। আফ্রিকান প্রিমিটিভ। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি। ফ্লোরার জন্য ড্রিংকস সাজায়। বাওবাব ফলের এনার্জি ড্রিংকস! আজও আফ্রিকান সাজে সেজেছে। কানে বেশ বড় ধাতব রিঙ। মুখে ওই মাস্কগুলোর মতোই আলপনা করা। বেশকিছু সূর্যমুখী ফুল যেন। গলায় সিংহের দাঁতের কারুকাজ করা নেকলেস।

ড্রিংকস সাজাতে সাজাতে ফ্লোরা জানায়, বন্ধুটি ওকে একা ফেলে গেছে। আসার কথা থাকলেও আসছে না। অপেক্ষা করতে করতে ভিসার মেয়াদ প্রায় শেষ, হাতে টাকা কড়ি যা ছিল সব ফুরিয়েছে। এখন সে নিরুপায়। আমি তাকে কোনো হেল্প করতে পারি কিনা? এক নাগাড়ে এসব বলে সে বিষণ্ণ হাসে।

বাওবাব ড্রিংকসে চুমুক দিতে দিতে মুখোশগুলোর সত্যিই কোনও স্পিরিচুয়াল পাওয়ার আছে কি না ভাবি। আমার ভাবনা বুঝতে পেরেই যেন ফ্লোরা একটি কালো মাস্ক পরিয়ে দেয়। সে নিজেও একটা পরে। ড্রামবিট ক্রমে দ্রুত হয়। কখন যে দ্রুততর বিটের সাথে আমি দুলতে শুরু করি বুঝতে পারি না। ফ্লোরা কি দুলছে? ও কি ঘনিষ্ঠ হয়ে আসে? দুজনেই নাচতে থাকি। যৌথ নাচ। নাচতে নাচতে একে অপরের বাহুবন্ধনের আবদ্ধ হতে হতে মনে হয় যেন আগুনের গর্ভে ঢুকে গেছি। ফুটছি অনন্ত আগুনের আত্মায়। বল্গাহীন দাউদাউ শিখার মধ্যে গলে গলে যাচ্ছি পরস্পরের মধ্যে! কখনো ছাই হয়ে উড়ে উড়ে যাচ্ছি অবিনশ্বর এক ঘুমের দিকে! আবার মনে হয় বাওবাব গাছের গুহায় পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছি!

সেদিন গভীর রাতে বাসায় ফিরে দেখি পিঠময় চুল ছড়িয়ে একা একা খাটের মাঝখানে বসে চুলে তেল মাখছে শশী। দাদীকে এভাবে চুল ছড়িয়ে বসে থাকতে দেখেছি। মাকে দেখেছি। এখন শশীকে দেখি। জগতে কি চুলে তেল দেওয়ার আর কোনো ভঙ্গি নেই? তর্জনী মধ্যমা আর অনামিকা একত্র করে মেলামাইনের বাটিতে রাখা তেল নিয়ে বেশকিছু চুল গোছা করে গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত  তেল দিয়ে ম্যাসাজ করছে সে। এভাবে টানতে থাকবে সবগুলো চুল। তেলের বোতলের লেবেলে একটি ডবকা তরুণী ভ্রুভঙ্গি করে দাঁড়িয়ে আছে। এমনটা বেশি দেখা যায় নারীদের অন্তর্বাসের প্যাকেটে। বুকদুটো উদ্ধত! বর্তুল! বেশ লো-কাট ব্লাউজ। শাড়ি কোমরের উপর আর ওঠেনি। সুন্দর নাভি দৃশ্যমান। কোমর থেকে নিতম্বের কার্ভটা বেশ আকর্ষণীয়। চুলগুলো আগেকার দিনের ‘ফেইরি টেলস’-এর ছবির আদলে ছড়ানো। শশী না তাকিয়েই বুঝতে পারল আমার উপস্থিতি।

‘টকদই টেবিলে রাখা আছে, খেয়ে নিও।’বিছানা আমাকে তীব্রভাবে টানছে। কিন্তু শশীর কেশপরিচর্যার আগে কোনো উপায় দেখছি না। পড়ার রুমে চলে যাব কি না ভাবছি।

‘আজ আর তেল না দিলে হয় না?’

ও একাগ্রে চুলে হাত চালাতে থাকে। ‘তুমি কি খুব বেশি টায়ার্ড?’

আসন করে বসা শশীর ভাবগতিক সুবিধার মনে হচ্ছে না। আমি জানি তার আহ্বানে সাড়া দেওয়ার একবিন্দু সামর্থ্য আমার অবশিষ্ট নেই আজ, অথচ নিজেকে সাজাচ্ছে সে। আজ কত তারিখ? ১২ সেপ্টেম্বর। শশীর চক্র পূর্ণ হতে কতদিন বাকি? এটা বড্ড জ্বালায়। প্রতিমাসে। অন্তত সাতদিন মহাফাঁপরে রাখে। শশীর মতে, এটা আমাদের আত্মবিশ্বাসহীনতা! দুজনেই এসময়টা কনফিউশনে ভুগি। যেহেতু আমাদের সন্তান নেয়ার পরিকল্পনা নেই আর একবার কনসিভ করার পর ও অ্যাবরশন করেছে তাই উদ্বেগ অনেক বেশি। ওর ওভারিতে সিস্ট থাকায় ডাক্তার দ্রুত সন্তান নেয়ার কথা বলে। আমাদের পরিকল্পনা শুনে মহিলা ডাক্তারটি অদ্ভুত চোখে তাকায়! শশীর ঋতুচক্র বেশ অনিয়মিত। তাই একটু দেরি হলেই আমাদের টেনশন শুরু হয়ে যায়! এই সাসপেন্স প্রতিমাসেই ভোগায়! ও পিল খেতে চায় না, যদি মোটা হয়ে যায় এই ভয়ে? আমার কনডমে অস্বস্তি! শেষে স্থায়ী বন্ধ্যাকরণ নিয়ে ভাবি। ওকে লাইগেশন করার কথা বলি! শশী বলে-‘বারবার আমি শুধু ছুরি কাঁচির নিচে যাব? তুমি ভ্যাসেকটমি করিয়ে নিচ্ছ না কেন?’

ওর যুক্তির কাছে হেরে চুপ করে থাকি। কিন্তু ভ্যাসেকটমির কথা ভাবতে পারি না। কোথায় যেন একটা দেয়াল আমাকে আটকে রাখে। পুরুষালি ইগো না নিজেকে নির্বীর্য করার ভয় হয় বুঝতে পারি না! এ এক অদ্ভুত বাধা!

এর মধ্যেই শশী একদিন বলে, ‘একটা সারপ্রাইজ আছে!’ দেখি ও একটা বনসাই কিনে এনেছে। বাওবাবের বনসাই। দেড় ফুটের মতো হবে। সত্যিই অদ্ভুত! এটা নিয়ে ওকে বেশ উৎফুল্ল দেখতে ভালো লাগে। রুটিন করে বনসাইটির যত্ন নেয় শশী। বলি, তুমি দেখি বাওবাবের প্রেমে পড়ে গেছ!’ ও হাসে। কোনো কথা বলে না। সেদিন অনেক অনেক দিন পর ওর সেই আগেকার উজ্জ্বল ভুবনভোলানো হাসিটি আবার দেখি! শশী যতক্ষণ বনসাইটির কাছে থাকে ততক্ষণ গুণগুণ করে সুর ভাজে। ‘বনসাইটি না আনলে কখনো জানতেই পারতাম না তুমি এত কেয়ারিং।’ও বলে, ‘আমি অপেক্ষা করে আছি কবে বনসাইটিতে ফুল ফুটবে।’ ‘একে বনসাই তার আবার ফুল?’ আমি হাসলে শশী বলে-  ‘কেন বনসাইদের কি ফুল ফুটতে নেই, একদিন অবশ্যই ফুটবে?’ শশী কি জানে বাওবাবকে ‘ট্রি অব লাইফ’বলে?

‘তুমি এত টায়ার্ড থাক আজকাল, একবার ডাক্তার দেখাও না।’বলেই যেন হঠাৎ মনে পড়ে গেছে এমন ভঙ্গিতে বলে, ‘জান, আজ জানালাটা খুললেই কিসের যেন বোঁটকা গন্ধ আসছে সেই দুপুর থেকে।’সে কেশচর্যা গুটিয়ে নেয়।

‘কিসের আর! তোমার সিনডারেলার গন্ধ হবে।’নয়তো কেউ কিছু ফেলেছে নিচে। এ এলাকাটা মোটামুটি অভিজাত হিসেবে চিহ্নিত। কিন্তু মানুষের মধ্যে সেই আভিজাত্যের ছিটেফোঁটাও নেই। কিছুদিন পর পর পরিষ্কার করা সত্ত্বেও জানালা দিয়ে ফেলা কনডমসহ যাবতীয় আবর্জনার স্তূপে ভরে ওঠে। জানালা খুলে দিলে কোনো গন্ধ পাই না আমি।

‘কোথায় গন্ধ?’ চুলের তেল যাতে না লাগে সে জন্য বেশ নরম আর হালকা গোলাপি টাওয়েল দেয়া বালিশে ডান হাতের এলবো ঠেকিয়ে আর তালুতে মাথা রেখে ‘দ’ ভঙ্গিতে শুয়ে পড়ে শশী। তার পেছনে লম্বা কোলবালিশ। বিয়ের পর থেকেই এটি আছে। আমরা রক্তমাংসের দুই নরনারীর যৌথযাপন সত্ত্বেও কোলবালিশটি দুজনেরই প্রিয়। কখনো দুজনের মাঝখানে কখনো শশী কখনো আমি তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রাখি। বেশ লাগে। অন্তত একটুখানি ভিন্নতা আসে। জ্বলজ্যান্ত একটা মানুষকে কতক্ষণই বা জড়িয়ে রাখা যায়। নিজেকে বিছানায় সঁপে দিলে ধীরে ধীরে গন্ধটা আসতে থাকে। আমার কাছে খুব পরিচিত মনে হয় গন্ধটা। কোথায় যেন পেয়েছি গন্ধটা? আমার কিছুটা ঝরঝরে লাগে। ক্লান্তি কাটছে! হাত বাড়িয়ে শশীকে কাছে টানি। বোঁটকা অস্বস্তিকর গন্ধটা ক্রমে তীব্র হচ্ছে আর আমি জেগে উঠছি। এর সঙ্গে সিনডারেলা কেশতৈল ও শশীর চুলের গন্ধ। ওর ঘামের গন্ধ এক অদ্ভুত মিথষ্ক্রিয়া তৈরি করে আমার মস্তিষ্কে। প্রথমদিকে শশীর ঘামের গন্ধ আমাকে তীব্রভাবে জাগিয়ে দিত। এটা এখন কমে গেলেও মাঝেমধ্যেই জাগিয়ে দেয়। শশী এখন এক উদ্দাম পাইরেট। উত্তাল সমুদ্রের দৈত্যাকার ঢেউয়ের তর্জনগর্জন আর উত্থানপতনের মধ্যে লুণ্ঠনের রোমাঞ্চে বুঁদ। কখনো নিপুণ ও দক্ষ সার্ফার। এর মধ্যেই কার্পাস শিমুলফল ফেটে যেভাবে তুলা বের হয় সেভাবেই খুলতে থাকে আমার চিন্তাসূত্র। গন্ধটা ক্রমেই পরিচিত হয়ে উঠছে। একটা আফ্রো-ফরাসি ফ্রাগরান্স? ইসাবেল আদজানি’র কথা মনে হল। কী সৌরভ ব্যবহার করত ইসাবেল? এই উদ্দামতার মধ্যেই মনে হয় মহাসমুদ্রের এই যে বিশাল ঢেউ। এরা কোথা থেকে এসে এভাবে তটে আছড়ে পড়ে? কেনই-বা নিজেকে এভাবে নিবেদন করে? এসব ঢেউ কেন এত নিঃসঙ্গতা আর হাহাকার নিয়ে আসে? একটু কান পাতলেই তাদের আকূতি শোনা যায়। হয়তো তারা বলছে, ‘দেখ! আমি কিভাবে তোমাতে বিলীন হয়ে যাচ্ছি।’প্রতিটি ঢেউ ভিন্ন। আদতে তারা কত যূথবদ্ধ!

‘তুমি ইসাবেলের নাম শুনেছ? সে কী পারফিউম ব্যবহার করত জান?’ আমার প্রশ্নে শশী কিছুটা থমকে যায়। ‘তাই তো বলি তুমি আজ এত ‘লাইভ’কেন?’ দ্রুতলয়ের নিশ্বাসের সঙ্গে সে বলতে থাকে, ‘নো-প্রোবলেম, তবু এমন লাইভ থাইকো।’ ইসাবেল এখন লেইট সেভেনটিজে-  শশীকে বলি, সে কোনো উত্তর দেয় না। সেভেনটিজ না সেভেনটিন শুনেছে বোঝা না গেলে আচমকা গন্ধটা হাওয়া হয়ে যায়। তখন চোখে পড়ে আমার বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলের নখটির একপাশের কালো দাগটি আরো বড় হয়ে গেছে। ‘দেখ তো এখানে কী হয়েছে?’ শশীর বুকের ওঠানামা কিছুটা থিতু হয়ে আসলে বলে, ‘তোমার নখে পচন ধরেছে!’

‘ডার্মাসিম লাগাচ্ছি’! দেয়ালে টাঙানো আফ্রিকান মুখোশটি দেখি। এটি ফ্লোরা দিয়েছিল আমাকে। মুখোশটি একবারেই সহ্য করতে পারে না শশী। অনেকবার নামিয়ে ফেলতে চাইলেও আমার আপত্তিতে পারেনি।

‘তুমি যে নোংরা থাক মলমে কি আর সারবে? আমার তো মাঝে মাঝে ঘিন্না লাগে, আগে নিজেরে পরিবর্তন কর’! উল্টোদিকে ঘুরে শুয়ে পড়ে শশী। গন্ধটা আবার ধীরে ধীরে ফিরে আসছে; আসুক। নখের পচনটা ক্রমেই বাড়ছে। অনেকটা ছড়িয়ে গেছে। শশী বলে, ‘পচন একেবারে ভেতর থেকে শুরু হয়েছে। চিকিৎসাও সেখান থেকেই শুরু করতে হবে।’ তখন বিদ্যুৎচমকের মতো আমার মনে পড়ে-এ গন্ধ তো আমার চেনা। ফ্লোরার ঘরে এ গন্ধটা পেয়েছি আমি। ও বলেছিল এটা বাওবাব ফুলের গন্ধ! বারান্দায় গিয়ে চমকে যাই। শশী কি দেখেনি? বনসাইটিতে একটি ফুল ফুটেছে। গন্ধটা সেই ফুলের। উত্তেজনায় ওকে চিৎকার করে ডাকি। শশী দৌড়ে আসলে ফুলটি দেখাই। আনন্দে কেঁদে ফেলে ও। আমাকে অশ্লেষে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘বলছিলাম না ফুল ফুটবেই!’