Home নির্বাচিত লেখা শেষ সাক্ষাৎকার প্রথম নমস্কারের আগে । ঋত্বিক কুমার ঘটকের সাক্ষাৎকার : মুহম্মদ খসরু।। চলচ্চিত্র

শেষ সাক্ষাৎকার প্রথম নমস্কারের আগে । ঋত্বিক কুমার ঘটকের সাক্ষাৎকার : মুহম্মদ খসরু।। চলচ্চিত্র

শেষ সাক্ষাৎকার প্রথম নমস্কারের আগে  । ঋত্বিক কুমার ঘটকের সাক্ষাৎকার : মুহম্মদ খসরু।। চলচ্চিত্র
0
0

বই : সাক্ষাৎকার চতুষ্টয় : মুহম্মদ খসরু [ রাজেন তরফদার।ঋত্বিক কুমার ঘটক । শামা জায়েদী।আদুর গোপাল কৃষ্ণান] / ২০০৮,  উলুখড়।।

ঋত্বিক কুমার ঘটকদের আদিবাড়ি বাংলাদেশের পাবনা জেলায় হলেও বাবার চাকরির সুবাদে ঋত্বিকের জন্ম হয় ঢাকা জেলায় ১৯২৫ সালে। ঋত্বিকের বাবা শ্রী সুরেশচন্দ্র ঘটক ছিলেন একজন সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তা— ঋত্বিক যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন তাঁর বাবা ঢাকার জেল ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন।

ঋত্বিকের স্কুলজীবন কাটে বাংলাদেশে অতপর দেশভাগের পর তাঁরা চলে যান দেশ ত্যাগ করে, কিন্তু দেশভাগের মর্মবেদনা তাঁকে আমৃত্যু তাড়া করে বেরিয়েছে। বাংলাদেশ ভাগ হয়ে যাওয়ার করুণ কাহিনীই ঋত্বিকের ছবির লাইট মোটিফ। ঘুরে ফিরে এসেছে এই বিষয়টি। ঋত্বিক ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

অতপর যোগদান করেন ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার আই.পি.টি.এ.-তে। অভিনয় ও নাট্য রচনায় মেতে ওঠেন। ঋত্বিক ছিলেন দায়বদ্ধ এক দামালশিল্পী। বহু মানুষের কাছে পৌঁছার উদ্দেশ্যে তিনি একের পর এক মাধ্যম বদলেছেন। নাট্য রচনা থেকে গল্প লেখা, গল্প লেখা থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ বহু মাধ্যমে ছিল তাঁর অবাধ যাতায়াত—“আজ যদি চলচ্চিত্রের চাইতে আরও শক্তিশালী মাধ্যমে আবির্ভাব ঘটে চলচ্চিত্রকে লাথি মেরে চলে যাব আমি মশাই, চলচ্চিত্রের প্রেমে পড়িনি—” এ ধরনের স্পর্ধিত উক্তি একমাত্র ঋত্বিক ঘটকের মতো ব্যক্তির মুখেই শোভা পায়।

ঋত্বিকের চৈতন্য সর্বদা আইজেনস্টাইনে মগ্ন থেকেছে, আইজেনস্টাইন ছিলেন কেবল একমাত্র গুরু।

ঋত্বিকের ছিল ঝড়ো জীবন। স্থায়ী ঠিকানা বলতে তেমন কিছু ছিল না, প্রতিদিন যাপন করেছেন ঘরহীন ঘরে। রেখে গেছেন হীরকখণ্ডের মতন আটটি পূর্ণদৈর্ঘ্য এবং নয়টি ছোট ছবি যা দেবে আগামী নতুন চলচ্চিত্র প্রজন্মকে নতুন দিশা। কিছুদিন চলচ্চিত্রের শিক্ষকতা করেছেন, তিনি পুনে ফিলম ও টেলিভিশন ইন্সটিটিউটের ভাইস প্রিন্সিপাল ছিলেন। পুনে থেকে পাশ করা তাঁর প্রিয় ছাত্ররা হলেন মনি কাউল, কুমার সাহানী, আদুর গোপালকৃষ্ণান ও কেতন মেহতা। ঋত্বিকের এইসব ছাত্রদের নির্মিত ছবির আজ জগৎজোড়া সুনাম। অথচ জীবদ্দশায় ঋত্বিকের ছবির দিকে কেউ ফিরেও তাকায়নি, কোনো মূল্যায়নই হয়নি তাঁর ছবির। ঋত্বিক ছিলেন এক অগ্রগামী চলচ্চিত্রকার, যুগের চাইতে অনেক অগ্রসর।

নাটক এবং চলচ্চিত্র ছাড়া সাহিত্য রচনায়ও ঋত্বিক ছিলেন সমান দক্ষ। দুটি উপন্যাস, ছয়টি নাটক, চল্লিশটিরও উপর ছোটগল্প এবং ষাটটিরও অধিক চলচ্চিত্র নন্দনতত্ত্ব-বিষয়ক গভীর সিরিয়াস রচনা এবং চলচ্চিত্র আস্বাদন ও উপলব্ধি-বিষয়ক প্রবন্ধগ্রন্থ “চলচ্চিত্র মানুষ ও আরও কিছু” শীর্ষক একটি বই লিখে গেছেন তিনি।

আধুনিক ভারতীয় চলচ্চিত্রের বলয়ে ঋত্বিকের প্রভাব ও প্রতিপত্তি যখন বিকশিত হওয়া শুরু করেছিল আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পরিমণ্ডলে ঋত্বিক যখন একজন ‘অতরচলচ্চিত্রকার’রূপে সম্মানিত হতে শুরু করেছিলেন সেই মুহর্তে ১৯৭৫ সালে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে অকাল মৃত্যু ঘটে এই মহান চলচ্চিত্রকারের।

১৯৭৫ ধ্রুপদী ৩য়  সংখ্যায় প্রকাশিত ভূমিকা:

১৯৭২-এর ঘটনা। তিনটি ছবির কাজ শুরু হয়েছিল প্রায় একই সাথে। প্রথমটি সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’। অন্য দুটো যথাক্রমে রাজেন তরফদারের ‘পালঙ্ক’  এবং ঋত্বিক ঘটকের  ‘তিতাস একটি নদীর নাম’।  শেষোক্ত ছবি দুটোর পটভূমি ছিল বাংলাদেশের।

দেশ তখন স্বাধীন। ভূমি খুঁড়ে মানুষের হাড় আর মাথার খুলি স্তূপীকৃত করা হচ্ছে। একুশে ফেব্রুয়ারির আমন্ত্রনে বিমানযোগে বাংলাদেশে আসেন ঋত্বিক কুমার ঘটক।

ঋত্বিকদাকে আমি প্রথম দেখি, ‘হোটেল পূর্বরাগে’। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ছবির সুটিং চলাকালীন সময়ে। আমি তখন রাজেনদার (রাজেন তরফদার) ‘পালঙ্ক’  ছবিতে সহকারী রূপে কাজ করছি।

ঋত্বিকদা ঢাকায় আসা অব্দি তাঁর সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছেটা ক্রমশ আক্রমণাত্বক হয়ে ওঠা সত্ত্বেও সুযোগের সঙ্গে সময়ের আঁতাত গড়ে উঠছিল না। যদিও তিতাসের প্রযোজকরা তাঁকে নারায়ণগঞ্জে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন অথচ তাঁর থাকা-না-থাকা এবং আমার দেখা-না-দেখা কী করে যেন এক হয়ে উঠল। ঋত্বিক ঘটককে দেখলাম। প্রথম নমস্কারের আগেই। তারপর কিছুদিন। দেখা গেল ‘তিতাস একটি নদীর নাম’–এর প্রযোজক হোটেল পূর্বরাগের একটি কামরা ভাড়া নিয়েছেন। তা প্রায় আমাদের ‘পালঙ্ক’ইউনিটেরই সংলগ্ন এবং ঋত্বিকদাও থাকছেন সেই ঘরে। কলকাতা থেকে ‘তিতাসে’র সঙ্গীতকার ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খাঁ-র ইতিমধ্যে ঢাকা এসে পৌঁছানোর কথা। যদিও তার পূর্বেই বাংলাদেশের খ্যাত-অখ্যাত লোকসঙ্গীত শিল্পীদের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে পূর্বরাগে। পূর্বরাগের সেই কামরাটিতে। যেখানে ঋত্বিকদা আছেন। এবং ঋত্বিকদা-ই  ‘তিতাসে’র সঙ্গীতের মহলা শুরু করে দিলেন।

শুরু মানেই শুরু নয়। সে ব্যাপক ব্যাপার। কাজের অবসরে মাঝে মাঝে ঋত্বিকদার ঘরে গিয়ে সঙ্গীতের মহলা শুনতাম। তখন তিতাসের গান নির্বাচনের পালা চলছে। বাংলাদেশের পরিচিত-অপরিচিত লোকশিল্পীরা আকুল হয়ে ভেজা উদাত্ত গলায় গাইছেন। একাগ্র ঋত্বিকদা শুনছেন। উত্তরবঙ্গ এবং সিলেট অঞ্চলের লোকগীতি শোনার ব্যাপারেই তাঁর আগ্রহ দেখলাম বেশি। হরলাল কাকু, তাঁর ছেলে রথীন এবং ছোট মেয়ে স্বপ্না রায়কে দিয়ে বারবার ভাওয়াইয়া গাওয়াচ্ছেন তিনি। শুনছেন। ভাবছেন। একদিন দেখলাম হরলাল কাকু তাঁর গানের খাতা সমেত হাজির। অজস্র সংগৃহীত লোকগীতি থেকে ঋত্বিকদার নির্বাচিত গানগুলো স্বপ্নাকে দিয়ে গাওয়াচ্ছেন তিনি। স্বপ্নার গান ঋত্বিকদা-র খুব ভালো লেগেছিল। কথা প্রসঙ্গে একদিন বলেছিলেন, “এ মেয়েকে আমি কলকাতা নিয়ে যাব, আমার ছবিতে গান গাওয়াব”। লীলাবালী (‘লীলাবালী লীলাবালী, বর ও যুবতী সই গো কী দিয়া সাজাইমু তোরে’) গানটি আমিও সর্বপ্রথম ‘তিতাসে’র ঐ সঙ্গীত মহলায়ই স্বপ্নার মুখে শুনি, যা ‘তিতাসে’বিশেষ আবহ সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছিল।

এভাবে আরও কিছুদিন।

ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খান এসে গেলেন কলকাতা থেকে। তাঁর সঙ্গে আমার পূর্ব পরিচয় ছিল। একদিন, পূর্বরাগের ডাইনিং রুমে বসে চা পান করছিলেন সবাই। ঋত্বিকদা এবং ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খান পান-পর্বটা বোধহয় আগেই সেরে এসেছিলেন কোথাও থেকে। দু’জনেরই বেশ টলটলায়মান— খোলামেলা— আমুদে অবস্থা। উচ্চস্বরে কথা বলছিলেন ঋত্বিকদা। ঐ উচ্চস্বরই আমাকে টেনে নিয়ে এল ডাইনিং টেবিলে। তিতাসের সহকারী পরিচালক ফখরুল হাসান বৈরাগীও সেখানে উপস্থিত ছিল। বৈরাগী আমাকে দেখিয়ে বলল : দাদা, খসরু এখানকার ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত। ঋত্বিকদা একবার আমার মুখের দিকে তাকালেন। তারপর বুকে। আমার বুক পকেটে সেদিন তিনটে কলম ছিল। ঋত্বিকদা বললেন “কিরে হারামজাদা, তোর পকেটে তিনটে কলম কেন। আঁতেলিপনা? যাও কবিতা লেখ গিয়ে, ফিল্ম করতে এসো না। ফিল্ম করতে এসে ওসব আঁতেলিপনা চলে না, শারীরিক পরিশ্রম করতে হয়। বুক-জলে দাঁড়িয়ে শুটিং করতে হয়, বুঝলে?”

এভাবেই কথা উঠল। কথা, গল্প, খিস্তি এবং প্রাণময় প্রাজ্ঞ আলোচনা। ঋত্বিকদা মুডেই ছিলেন। কথা প্রসঙ্গে বিভিন্ন দেশের ছবি নিয়েও কথা উঠল। আমি ফরাসি চলচ্চিত্র-ধারার কথা বলতেই উনি ব্রিটেনের ফ্রি সিনেমার উপর পক্ষপাতমূলক আলোচনা করলেন অজস্র যুক্তিপাতে। জন স্লেসিংগারের ‘কাইন্ড অব লাভিং’-এর ভূয়সী প্রশংসা করলেন। আরও অনেক কথা বললেন সেদিন ঋত্বিকদা। মানুষ, শিল্প এবং চলচ্চিত্রকে জড়িয়ে। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনলাম। শুনলাম সেদিন ওস্তাদ বাহাদুর খানের সরোদ বাদন— রাত-ভোর। ‘তিতাসে’র সুটিং চলছে। পুরোদমে। ‘পালঙ্কে’রও।

একদিন ঋত্বিকদা রাজেনদাসহ আমাকে নিয়ে গেলেন এফ, ডি, সি-তে। সুটিংয়ের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করলেন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। তারপর রাজেনদাকে বললেন, “চলুন রাজেন বাবু, কবরীর বাসা হয়ে একটু এয়ারপোর্ট যাব।”আমি তো সঙ্গে রইলামই। যাবার পথে রহিমা খালার সাথে দেখা। ঋত্বিকদা রহিমা খালাকে বললেন, “কিরে বুড়ি, কেমন আছিস? তোকে আমি বিয়ে করব।”বলেই হাসলেন অট্টস্বরে। তারপর বাকিটুকু বললেন রাজেনদাকে “মশাই, এমন প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী হয় না। একেবারে যাকে বলে জাতশিল্পী।”

কবরীর বাসায় ঢুকেই একটু ফর্মাল খবর-টবর দেবার ধার না ধরেই ঋত্বিকদা চেঁচিয়ে ডাকলেন “কবরী আছিস নাকি বাসায়”? এঘর থেকে ওঘর। ঋত্বিকদা-র গলা শুনেই কবরী হন্তদন্তহয়ে ছুটে এল। চোখেমুখে বলল : আরে ঋত্বিকদা? ঋত্বিকদা বললেন “শোন ছেমরি, আগামীকাল সুটিং, সকাল ছ’টায়, তৈরি থাকবি।” বিস্ময়াপন্ন কবরী বলল : কাল যে আমার অন্য ছবির সুটিং আছে দাদা! ঋত্বিকদা প্রায় ধমকে উঠলেন, “রাখ তোর শুটিং। আমি যখন বলছি তখন ওসব সুটিং ফুটিং ক্যানসেল।”অগত্যা। কেননা ঋত্বিকদার যে কথা সেই কাজ। এবং এই কথা-কাজের আত্মীয়তাই তাঁকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র-কর্মীদের কাছে প্রিয়পাত্র করে তুলেছিল। যদিও প্রথম প্রথম তাঁর সান্নিধ্য থেকে অনেকেই দূরে সরে ছিল। অহেতুক সন্দিগ্ধ কিছু চলচ্চিত্র-কর্মী তাঁর বাংলাদেশে আসাটা এবং ছবি করাটা সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু ‘সময়ে’এরাই ঋত্বিকদার কাজে-ব্যক্তিত্বে যুগপৎ বিস্মিত এবং মোহিত হয়ে ওঠে।

‘তিতাসে’র সুটিং প্রায় শেষ।

আমাদের ‘পালঙ্ক’ ইউনিট তখন ঢাকার অদূরবর্তী কলাকোপা থেকে আউটডোর সুটিং সেরে ফিরেছে। এসেই শুনলাম ঋত্বিকদা অসুস্থ। সুটিং করতে করতেই নাকি হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। ছুটলাম পি, জি, হাসপাতালে। আমি আর বাদল। যেয়ে দেখি ঋত্বিকদা হাসপাতালের বেডে ম্লানভাবে শুয়ে আছেন। আমরা গিয়ে তাঁর শিয়রে দাঁড়ালাম। কারো মুখে কোনো কথা নেই। ঋত্বিকদা শোয়া অবস্থা থেকে আস্তে আস্তেউঠে হেলে বসলেন। চোখমুখ ফোলা। স্পষ্ট করে কথা বলতে পারছিলেন না। খুব মৃদু স্বরে বললেন ‘জিহ্বা কেটে গেছে’। তাঁর উলঙ্গ পা-তেও দেখলাম ক্ষতচিহ্ন। এমন সময় ‘তিতাসে’র প্রডাকশন কন্ট্রোলার আব্দুল জলিল ঋত্বিকদার জন্য চাইনিজ খাবার নিয়ে কেবিনে ঢুকলেন। আমাদের বললেন: বেশি কথা বলতে ডাক্তার নিষেধ করেছেন। আমরা মৌনভাবে বিদায় নিলাম।

ঋত্বিকদার অসুস্থতার কথা ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে জানানো মাত্র তিনি পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রিকে নির্দেশ দিলেন অবিলম্বে ঋত্বিক ঘটককে কলকাতায় নিয়ে এসে উপযুক্ত চিকিৎসা করানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য। সিদ্ধার্থশংকর রায় সঙ্গে সঙ্গে মৃণাল সেনকে পাঠালেন ঢাকায়, ঋত্বিকদাকে নিয়ে যাবার জন্য। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী ঋত্বিক ঘটকের একজন বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। এবং ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক কর্মজীবনের উপর ঋত্বিকদা একটি প্রামাণ্য ছবি তৈরি করছিলেন। কিন্তু ছবিটা অসমাপ্ত রয়ে গেছে।

মৃণাল সেন ঢাকায় শুনেই ছুটলাম তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। ঋত্বিকদার অবস্থা জানা দরকার। কিন্তু মৃণাল সেন-ঋত্বিকদা কারো সঙ্গেই দেখা হল না। রাজেনদা জানালেন মৃণাল সেন কয়েক মুহূর্তের জন্য ছিল, ঋত্বিকদাকে নিয়ে একটি বিশেষ হেলিকপ্টার যোগে কলকাতা ফিরে গেছে। মনটা খারাপ হয়ে গেল।

ঋত্বিকদা’র বাংলাদেশে ছবি করার ব্যাপারটা এদেশের বুদ্ধিজীবী মহলকে কতটা আলোড়িত করেছিল আমার জানা নেই। কেননা এদেশের আলোকপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সব সময় চলচ্চিত্রশিল্প এবং শিল্পমনস্ক ব্যক্তিদের কাছ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন রেখেছেন। বিপরীতে চলচ্চিত্রশিল্পের সঙ্গে জড়িত শিল্পী-কুশলী কর্মীরাও অন্য কোনো শিল্প-মাধ্যমের সঙ্গে নিজেদের একাত্ম করতে পারেননি। ফলত সেতুবন্ধ রচনা হয়নি চলচ্চিত্রকারের সঙ্গে কবি-সাহিত্যিকের কিংবা চলচ্চিত্র-কর্মীর সঙ্গে চিত্রকরের। এবং এই যোগাযোগশূন্যতা সামগ্রিকভাবে অন্তরায় ঘটিয়েছে চলচ্চিত্রের (শৈল্পিক) বিকাশের, প্রকাশের। তাই বাংলাদেশে ঋত্বিকদা’র ছবি করা কিংবা অসুস্থ হয়ে পড়াটা কিছু মুষ্টিমেয় চলচ্চিত্র-অনুরাগীকেই যুগপৎ উত্তেজিত এবং বিমর্ষ করেছে। এটা দুঃখজনক হলেও অনভিপ্রেত ছিল না।

ঢাকায় ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ যখন মুক্তি পেল ঋত্বিকদা তখন কলকাতায়। লোকমুখে খবর পেলাম ঋত্বিকদা এখন অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এদিকে ‘তিতাসে’র প্রযোজকবৃন্দ ছবিটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পাঠানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাই তাঁরা ছবিটির চূড়ান্ত সম্পাদনার জন্য ঋত্বিকদাকে পুনরায় ঢাকায় নিয়ে আসার কথাও ভাবছিলেন।

ইতিমধ্যে কলকাতায় ‘তিতাসে’র একটি বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। নির্বাচিত সেই বিদগ্ধ দর্শকমণ্ডলী কর্তৃক ছবিটি বিশেষভাবে প্রশংসা লাভ করে। ঠিক তখন ভারতে ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে বিক্রির কথাও চলছিল, কিন্তু তা আজও ‘কথা’ই থেকে গেছে।

হঠাৎই একদিন খবর পেলাম ঋত্বিকদা আবার ঢাকা এসেছেন ‘তিতাসে’র পুনঃসম্পাদনার কাজে প্রযোজকদের বিশেষ অনুরোধক্রমে। উঠেছেন হোটেল গ্রীন-এ। শোনামাত্র ছুটলাম তাঁর সঙ্গে দেখা করবার জন্য। গ্রীন-এ পৌঁছে দেখি তিনি বন্ধুবান্ধব নিয়ে চুটিয়ে গল্প করছেন। মসৃণভাবে দাড়ি-কামানো উজ্জ্বল মুখ, সুন্দর স্বাস্থ্য, পরনে পরিষ্কার পাজামা এবং সিল্কের পাঞ্জাবি। এমন সুন্দরভাবে ছিমছাম সৌম্যমূর্তির ঋত্বিকদাকে এর আগের দেখায় কখনো দেখিনি।

জীবনের ক্রমাগত ব্যর্থতা ভোলার জন্য ঋত্বিকদা আÍঘাতী পথ বেছে নিলেও স্বীয় প্রতিশ্রুতির প্রতি ছিলেন অবিচল। তাই তাঁর সমগ্র জীবন পর্যালোচনায় আপোস শব্দটির ছায়াপাত ঘটে না। শিল্প অন্বেষণে ব্যাপৃত তাঁর জীবন। তাঁর শিল্পের বাস্তবতাও এক কঠোর রূপাকৃতির। কোথাও ইচ্ছাপূরণে ব্যাপার নেই। জীবনটা তো ইচ্ছাপূরণের ব্যাপার নয়। শিল্প জীবনকে বাদ দিয়ে নয়। জীবনের দুঃখ এবং গ্লানি ভোলার জন্যই তিনি ক্রমশ মদাসক্ত হয়ে পড়েন। হতাশাচ্ছন্ন মধ্যবিত্ত সমাজে এ্যালকোহলিজমের শিকার হয়ে যান এক শিল্পসাধক।

ড. গুরুদাস ভট্টাচার্য তাঁর কোনো-এক লেখায় সাহিত্য-ব্যক্তিত্বের সাথে চলচ্চিত্র-ব্যক্তিত্বের তুলনা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সত্যজিৎ রায় এবং নজরুলের সাথে ঋত্বিক ঘটকের তুলনা করেছিলেন। কিন্তু আমার মনে হয় তাঁর এ তুলনা (নজরুলের সঙ্গে ঋত্বিক ঘটকের) যথার্থ নয়। বরঞ্চ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ঋত্বিক ঘটকের সৃজনশীলতা এবং জীবনযুদ্ধের বহুবিধ কর্মকাণ্ডের যথেষ্ট সাযুজ্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। দুজনই শিল্পসৃষ্টিতে ছিলেন কমিটেড। দু’জনই এ্যালকহলিক হয়ে পড়েন এবং পরবর্তী জীবনে মানসিক রোগ-যন্ত্রণায় আক্রান্ত হন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছিল হিস্টিরিয়া এবং ঋত্বিকদার প্যারানোয়া টাইপ। সহধর্মিনী শ্রীমতী সুরমা ঘটকের এক লেখায় জানা যায় ঋত্বিকদার সিজোফ্রেনিয়া ছিল। এর কারণও সুবোধ্য। ‘সুবর্ণরেখা’সৃষ্টির পর দীর্ঘদিন তাঁর হাতে কোনো ছবি ছিল না। নিজের প্রতি অত্যাচারের জেদ তাঁর ঐ সময় থেকেই। মদ তখন তাঁর ব্যর্থতা ভোলার অনুষঙ্গ। ঠিক ঐ সময়ই তিনি একবার মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন এবং দীর্ঘদিন তাঁকে মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকতে হয়।

সেদিন হোটেল গ্রীনে ঋত্বিকদাকে ঐ রকম সুন্দর স্বাস্থ্যে চমৎকার আড্ডায় মশগুল দেখে মুহূর্তের জন্যও মনে হয়নি তিনি কখনো অসুস্থ ছিলেন। আড্ডা হালকা হবার সুযোগে ঋত্বিকদার সঙ্গে প্রাথমিক দুটো চারটে কথার পর আমাদের ফিল্ম সোসাইটি প্রসঙ্গ তুলি এবং আমাদের পত্রিকা ‘ধ্রুপদী’র জন্য তাঁর একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণের প্রস্তাব রাখি। ঋত্বিকদা বললেন : “হ্যাঁ, কলকাতায় যখন একটু সুস্থ হয়ে উঠি সত্যজিৎ বাবু একদিন ফোন করে বলেছিলেন, “ঋত্বিক বাবু, আপনার বাংলাদেশের ছবির ওপর ভালো একটি আলোচনা বেরিয়েছে ওখানকার ফিল্ম সোসাইটির পত্রিকায়’, পরে পত্রিকাটি পাঠিয়েও দিয়েছিলেন। ভালোই লিখেছে ছেলেটি। আমাকে এবং আমার ছবির মূল বক্তব্য ধরার প্রচেষ্টা আছে লেখাটিতে।”ঋত্বিকদা যে লেখাটির কথা বলছিলেন সেটি ‘তিতাস একটি নদীর নাম’প্রসঙ্গে। ছবিটি মুক্তির কিছুদিন পরই ধ্রুপদীর তৃতীয় সংকলনটি বেরিয়েছিল এবং তাতে মাহবুব আলম (সুকদেব বসু নামে) ছবিটি নিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচনা করেছিল। তারপর তিনি কলকাতায় ‘তিতাসে’র বিশেষ প্রদর্শনীর প্রতিক্রিয়ার কথা তুললেন। বুদ্ধিপ্রভ দর্শক দারুণভাবে নিয়েছে ছবিটি। বিষ্ণু দে-ও নাকি সেদিনকার বিশেষ প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন। বিষ্ণু দের অশেষ স্নেহভাজন এবং গুণমুগ্ধ ছিলেন ঋত্বিকদা। বিষ্ণু দে-ও ছিলেন ঋত্বিক ঘটকের শিল্পকর্মের একজন সত্যিকার অনুরাগী। ঋত্বিকদার ছবি ‘মেঘে ঢাকা তারা’র উপর বিষ্ণু দের লেখা এবং ‘কোমলগান্ধার’ছবিটির নামকরণ ইত্যাদিতে তাঁদের একের প্রতি অন্যের সমমর্মিতা সহজে অনুমেয়। ঋত্বিকদাকেও পূর্বে কথাপ্রসঙ্গে বহুবার বিষ্ণুদের নামটি শ্রদ্ধাভরে উচ্চারণ করতে শুনেছি।

কলকাতায় ‘তিতাসে’র বিশেষ প্রদর্শনীকালীন বিষ্ণু দে-কে জড়িয়ে একটি ঘটনার কথা বলছিলেন ঋত্বিকদা : হল-ভরা মানুষ ‘তিতাস’  দেখছেন, ছবির প্রায়-অন্তিম দৃশ্য— যে সিকোয়েন্সে তিতাসের শুকনো পারে উদয়তারা যেমন করে হোক বাঁচবার জন্য শহরে যাবার কথা ভাবছে এবং উন্মাদপ্রায় বাসন্তীর মাকে বলছে, ‘হোঁচট খামুনা, দেহে যৌবন আছে, তরতরাইয়া পিছলাইয়া যামু’— ঠিক সে মুহূর্তে কে যেন সম্মুখের সীট থেকে চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। সন্দেহ হল, কেননা আমি জানতাম বিষ্ণু বাবু সামনের ঐ দিকটায় বসেছেন। হলের বাতি জ্বালাতে বলে আমি সামনে এগিয়ে গেলাম। প্রজেকশন থেমে গেল। আলো জ্বলে উঠল। যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই। যেয়ে দেখি, বিষ্ণু বাবু চেয়ার ছেড়ে নিচে বসে পড়েছেন এবং ফুঁপিয়ে কাঁদছেন তখনও। আমি হাত ধরে তুলে তাঁকে চেয়ারে বসালাম। সুস্থির হয়ে বসলেন তিনি। খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। বয়স্ক মানুষ, না জানি কী হল? হয়তো কোনো শারীরিক কারণে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। কিন্তু পরে জানা গেল কারণটা মোটেও তা নয়। তিনি সেই প্রায়-অন্তিম দৃশ্যটার সঙ্গে এমন গভীরভাবে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন যে নিজের ভাবাবেগকে আর চেপে রাখতে পারেননি, ডুকরে কেঁদে উঠেছিলেন। তিনি একটু স্থির হবার পর আবার হলের বাতি নিভল এবং ছবির বাকি অংশটুকু প্রদর্শিত হল।

সেদিন হোটেল গ্রীন-এ উদ্বাস্তু গল্পের তোড়ে ধ্রুপদীর জন্য সাক্ষাৎকারের সঠিক দিন-সময় নেয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনি। দিন কয়েক পর তাই এফ, ডি, সি.তে গেলাম। ঋত্বিকদা সেখানে তখন ‘তিতাসে’র পুনঃসম্পাদনার কাজে ব্যস্ত। সম্পাদনা কক্ষে রয়েছেন দেখলাম সম্পাদক বশির ভাই, তাঁর সহকারী আতিক, ‘তিতাস’ ইউনিটের বৈরাগী, সানাউল্লাহ, জলিল প্রমুখ। ঋত্বিকদা এডিটিং টেবিলের সামনে বসে— মুভিওয়ালাতে একটা রীলের শেষাংশ। একসময় ছবি চলা থামল। ঋত্বিকদা হাই তুলে বললেন ‘আজ এই পর্যন্ত থাক, দারুণ ক্ষিদে পেয়েছে, সকাল আটটা থেকে এ যাবৎ কেবল এক বোতল মদ খেয়েছি, এই খেয়ে আর কতক্ষণ?’ দেখলাম টেবিলে একটা খালি মদের বোতল পড়ে আছে তলানীটুকুসহ। সময় তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। ঋত্বিকদা হাঁক দিলেন ‘খাবারের কী হলরে?’ বৈরাগী বলল ‘দাদা এখনি এসে যাবে’। ঋত্বিকদা ক্ষেপে উঠলেন—“আরে রাখো, আমার কি এভাবে সময় কাটানোর দিন নাকি! ফুসফুসে ছ’ছটা পারফোরেশন নিয়ে ছবি সম্পাদনা করছি। আমার তো শালা এই শরীর নিয়ে স্যানিটরিয়ামে থাকার কথা।”তারপর বশির ভাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “বশির চল, তোর বাসায় বৌমা যা রেঁধেছেন তাই চারটা খাব— শেভও করতে হবে।

বশির ভাই’র বাসায় যাবার পথে ঋত্বিকদা-কে বললাম “দাদা, আমাদের পত্রিকার জন্য সাক্ষাৎকারের সময়টা কখন হবে?” ঋত্বিকদা মুখিয়েই ছিলেন “কই, টেপ রেকর্ডার এনেছ? হারামজাদা, এভাবে ঋত্বিক ঘটকের সাক্ষাৎকার হয় না।”আমি বললাম “দাদা কাল সকালেই সব নিয়ে আপনার হোটেলে আসছি।”ঋত্বিকদা বললেন “তাই এসো।”

পরদিন। সকাল সাতটা। হোটেল গ্রীনে ঋত্বিকদার কাছে যেয়ে হাজির হলাম আমরা ক’জন চলচ্চিত্র-সংসদ কর্মী (কাওসার, প্রিন্স, শাহজাহান, মাহবুব ও আমি)। বলতে গেলে ঋত্বিকদাকে একরকম ঘুম থেকে টেনেই তোলা হল। উনি বললেন “এত ভোরে এসে গেছ তোমরা। একটু অপেক্ষা কর, আমি হাত-মুখটা ধুয়ে আসি।”আমাদের সবার জন্য চায়ের অর্ডার দিয়ে তিনি বাথরুমে ঢুকলেন। আমরা চা খেয়ে তৈরি হয়ে নিলাম। টেপ রেকর্ডারের প্লাগটা বোর্ডের সকেটে লাগালাম। বাথরুমে জল পড়ার শব্দ থেমে গেল। ঋত্বিকদা পাজামা পড়ে আদুল গায়ে বেরিয়ে এলেন। মাথা গলিয়ে ঢলঢলে হাতার গেঞ্জিটা গায়ে চাপিয়ে এক কাপ চা খেয়ে নিলেন। তারপর বিছানায় আসন গেড়ে বসে একটা বিড়ি ধরিয়ে বললেন “এবার শুরু করা যাক। বল কী জানতে চাও তোমরা।”  টেপ রেকর্ডারটা অন করা হল। প্রশ্নোত্তর শুরু হল।

শুরুর শুরুতেই মনে একটা দ্বিধা ছিল, ভয়ও। হয়ত ঋত্বিকদা সব প্রশ্নগুলো হেসেই উড়িয়ে দেবেন। কিংবা ধমক-টমক দেবেন। কিন্তু কথোপকথন শুরু হতেই লক্ষ্য করলাম ঋত্বিকদা অত্যন্ত সিরিয়াস হয়ে উঠলেন। তাঁর বলার ভঙ্গি, চলচ্চিত্র সম্পর্কে অসাধারণ বাগ্মিতা আমাকে মুগ্ধ করল। সে মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছিল আমি যার সঙ্গে কথা বলছি তিনি শুধু এই উপমহাদেশের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকারই নন, একজন শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র শিক্ষকও বটে।

সাক্ষাৎকারের জন্য নির্দিষ্ট প্রশ্নসমূহ নিয়ে আলোচনার পরও চলচ্চিত্র এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে কিছু আলোচনা হল। ঋত্বিকদা একসময় বললেন ‘আশা করি তোমাদের কাজ শেষ হয়েছে।’বললাম ‘হ্যাঁ, আমাদের সাক্ষাৎকার-গ্রহণ পর্ব আপাতত এখানেই শেষ।’ঋত্বিকদা একটা বিড়ি ধরালেন। আমরা টেপ রেকর্ডার গুটিয়ে নমস্কার জানিয়ে চলে এলাম। ঋত্বিকদাকে সেই প্রথম নমস্কার— শেষ সাক্ষাৎকারের আগে।

ফেরার পথে ঋত্বিকদার একটা কথাই কানে বাজছিল “চলচ্চিত্রকে নতুন করে ভালোবাসতে এসেছ তোমরা, এই ভালোবাসার মর্যাদা রেখ।”

সেই মর্যাদার জন্যই আমরা চলচ্চিত্র-সংসদ কর্মীরা লড়ে যাচ্ছি।

সাক্ষাৎকার

মারী সীটন তাঁর এক লেখায় বলেছিলেন আপনি হলেন বাংলা চলচ্চিত্রেরবিদ্রোহী শিশু তাঁর ধারণায় আপনার অতিরিক্ত মননশীলতা আপনার নিজের কিংবা আপনার চলচ্চিত্রের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে সম্বন্ধে আপনার নিজস্ব মতামত কী?

এ সম্বন্ধে আমার কোনো মতামতই নেই। কারণ বিদ্রোহী শিশুটা তো বাংলা করা হয়েছে। ওটা আসলে ‘Infant terrible’। এর কোনো বাংলা প্রতিশব্দই নেই। আর ওটা লিখেছিল ‘অযান্ত্রিকের’সময়। ‘অযান্ত্রিক’হচ্ছে ১৯৫৭-৫৮ সালের ছবি। আজকে চুয়াত্তরে তার উত্তর দেয়ার তো কোনো মানে হয় না। আমার কোনো কিছু বলার নেই। একজন সমালোচক আমার সম্বন্ধে কী বলেছে তা দিয়ে আমি কী করব।

শিল্পাঙ্গনের কতকগুলো মাধ্যম পেরিয়ে আপনি চলচ্চিত্রে এসেছেন যেমন প্রথম জীবনে কবি গল্পকার, তারপর নাট্যকারনাট্যপরিচালক ইত্যাদি এবং অবশেষে চলচ্চিত্রকার শিল্পমাধ্যমের প্রতি অগাধ মমত্ববোধই সাধারণত শিল্পীকে তাঁর ভালোলাগা মাধ্যমের প্রতি টেনে আনে আপনিচিত্রবীক্ষণে সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন “…যদি কাল চলচ্চিত্রের চেয়ে better medium বেরোয় তাহলে সিনেমাকে লাথি মেরে আমি চলে যাব আমি সিনেমার প্রেমে পড়িনিI don’t love film…” এইসব কথায় মাধ্যমটির প্রতি আপনার অশ্রদ্ধা প্রকাশ পায় না কি?

একেবারেই পায় না। মাধ্যমটা কোনো প্রশ্নই না। আমার কাছে মাধ্যমের কোনো মূল্য নেই। আমার কাছে বক্তব্যের মূল্য আছে। আমি কেন এ সমস্ত মাধ্যম change করেছি, বদলেছি? কারণ বক্তব্যটা মানবদরদী। বক্তব্য বলার চেষ্টা বা পৃথিবী সম্বন্ধে জানা বা মানুষের জীবনযাত্রার প্রতি মমত্ববোধের প্রশ্নটাই প্রথম কথা, সিনেমার প্রতি মমত্ববোধটা কোনো কাজেরই কথা না। ও সমস্ত যারা Aesthetes তারা করুন গিয়ে। Art for Arts sake যারা করেন তারা করুন গিয়ে। All art expression should be geard towards the betterment of man- for man। আমি গল্প লিখছিলাম, তখন দেখলাম গল্পেতে কাজ হচ্ছে না। ক’টা লোক পড়ছে? নাটকে immediate hit— আরো বেশি লোককে convert করা যায়। I am out to convert। তারপর দেখলাম নাটকের থেকেও ভালো কাজ হচ্ছে সিনেমায়। অনেক বেশি লোককে approach করা এবং convert করা যায় এতে। So cinema is important. Cinema as such এমন কোনো value নেই। I don’t think it has any value। এবং যারা এ সমস্ত কথা বলে তারা সিনেমাকে ভালোবাসে না, নিজেকে ভালোবাসে। এ জন্যই কাল যদি একটা better medium পাই তাহলে আমি সিনেমা ছেড়ে দিয়ে চলে যাব। এখন পর্যন্তআর medium কোথায়! আমাদের দেশে এখন পর্যন্তজনতার কাছে পৌঁছতে পারে এমন medium হচ্ছে cinema। কালকে TV হতে পারে। এখন পর্যন্তইন্ডিয়াতে সিনেমাই সবচেয়ে বেশি লোককে at the same time reach করতে পারে। কাজেই আমার বক্তব্যের হাতিয়ার হিসাবে একেই বেছে নিয়েছি।

আপনাদের চলচ্চিত্রে আগমনঅর্থাৎ আপনি, সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, রাজেন তরফদার এরা সাধারণত ইতালীয়নিও রিয়ালিজমদ্বারা অনুপ্রাণিত যুদ্ধপরবর্তী ইতালিতে চলচ্চিত্রে যে বিপুল শৈল্পিক উৎকর্ষতা ঘটেছিল তাদ্বারা আমার মনে হয় কমবেশি সবাই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন পঞ্চাশের শেষভাগে এবং ষাটের দশকে ফরাসি দেশে যেনবতরঙ্গচলচ্চিত্র আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল সে আন্দোলনের ধারা কি আপনাকে আলোড়িত করেছিল? ফরাসিনবতরঙ্গএবং নবতরঙ্গ গোষ্ঠীর অন্যতম চলচ্চিত্রকার জাঁ লুক গদার সম্পর্কে আপনি কিছু মন্তব্যব্যক্ত করুন

প্রথম কথা হচ্ছে যে মৃণাল বাবু একদিক দিয়ে এসেছেন, সত্যজিৎ বাবু একদিক গিয়ে এসেছেন আর আমি আর-এক দিক দিয়ে এসেছি। এটা কোনো একটা আন্দোলন—সংঘবদ্ধ আন্দোলন থেকে আসেনি। যেমন সত্যজিৎ বাবু ছবি সম্বন্ধে প্রচুর পড়াশুনা করতেন। রেনোয়া সাহেব যখন এলেন ছবি করতে তখন তাঁর সঙ্গে থেকে তিনি highly influenced হলেন। রেনোয়াই তাঁর গুরু। তিনি নিজেও এটা স্বীকার করেন। নিও-রিয়ালিজমটা তার পরে। আমি সম্পূর্ণরূপে আইজেনস্টাইনের বই পড়ে influenced হয়ে ছবিতে আসি। ১৯৫২-তে film festival-এ যে neo-realistic ছবিগুলো দেখানো হয়েছিল সেগুলো আমাদের definitely খুব মোহিত করেছিল, কিন্তু কাকে influence করেছিল আমি ঠিক বলতে পারি না। কেননা সত্যজিৎ বাবুর ছবিতে রেনোয়া সাহেবের লিরিসিজম এবং ফ্লাহার্টির লিরিসিজম—নেচার লাভ এই থেকে তার আরম্ভ। আমার ছবি কারোই বোধহয় না। যদি থাকে আইজেনস্টাইনের আছে। কেননা neo-realistic ছবি আমার ‘অযান্ত্রিক’একদমই না। ‘নাগরিক’-ও না। ‘অযান্ত্রিক’কমপ্লিটলি একটা fantastic realism। একটা car— একটা গাড়ি without any trick shot,  ওটাকে animate করা হয়েছে। She is the heroine, আর driver হচ্ছে হিরো। ডযড়ষব গল্পটা একটা ড্রাইভার আর তার গাড়ি। আর কিছু নেই। এটার সঙ্গে neo- realism-এর সম্পর্ক কী? ওটাকে সম্পূর্ণ রূপে fantastic realism বলা যেতে পারে। কিন্তু আমরা প্রত্যেকেই দেখেছি এবং সে সময় ওটা খুব powerful ছিল। এবং নিশ্চয়ই আমাদের প্রত্যেকের খুব ভালো লেগেছিল। Unconsciously হয়তো খানিকটা— সেই সারা পৃথিবীর ছবি দেখলেই হয়ে থাকে, যেমন জাপানি ছবি দেখেও হয়েছে।

না, আপনাদের চলচ্চিত্র সৃষ্টির পরপরই ভারতে Subjective Realism-এর যুগ শুরু হয় বলে বলা হয়েছে জন্যেই আমি এই প্রশ্নটা করেছিলাম

হ্যাঁ, এরকম অনেক কিছুই বলা হয়ে থাকে। এ সমস্ত lebeling-এর কোনো মূল্য নেই। ওই lebel-গুলো lebel-ই। ওগুলো কোনো কাজেরই না। প্রত্যেকেই তার নিজস্ব পথে চলেছে। আর ঐ ফরাসি ‘নিউ-ওয়েভ’ আমি একেবারে পছন্দ করি না। ওটা একটা stunt আমার মতে।

আমরানিউওয়েভে কিছু ছবি দেখেছি, যেমন ত্রুফোরফোর হান্ড্রেড ব্লোজকিংবা গদারেরব্রেথলেস এগুলো দেখে মনে হয়েছে যে এরা একটা আন্দোলনের ফসল

‘ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ’! ওটা নিউ-ওয়েভই না। তবে খুব ভালো ছবি।  আর ‘ব্রেথলেস’আমি দেখিনি, ওদের যেটা দারুণ ‘নিউ ওয়েভ’রেনের ‘লাস্ট ইয়ার এট মারিয়ানবাদ’, ওটা একেবারে completely existentialist ছবি। ‘নিউ ওয়েভ’টা কী?  লেবেলিং-এর ব্যাপারগুলো কাটো তোমরা পথের থেকে। তোমরা নতুন করে ছবি ভালোবাসতে এসেছ। এই লেবেলগুলো হচ্ছে অত্যন্তfalse-critic-দের তৈরি। লেবেলিং বলে কিছু নেই। একটা অবস্থা থেকে, একটা পটভূমি থেকে এখন তোমাদের ঢাকায় নতুন ছবি শুরু হবে। তোমাদের এখানকার শিল্পীরা পৃথিবীর ছবি দেখে তার থেকে influenced হবে যেমন, তেমনি এদেশে ইতিহাসের যে পটভূমি, তাদের suffering sorrow-র যে পটভূমি— তা থাকতে বাধ্য। তার থেকে নাম লেবেল করার দরকারটা কী? এক একজন এক-এক দিক থেকে করবে। I don’t believe in name।

বেশ, আপনি গদারের ছবি সম্পর্কেই কিছু বলুন

গদার কি new wave নাকি? Godard is an utter communist film maker এবং একেবারে bold। He believes in street— fight from the street— এই তো বক্তব্য তার। সে ‘নিউ ওয়েভ’মোটেই না। আর সেও বদলাচ্ছে তো। তার last statement-গুলো কী? ত্রুফোর সাথে গদারের কোথায় মিল? আঁলা রেনের সাথে হ্রব গ্রিয়ের কোথায় মিল?

ফর্মএর দিক থেকে কিছু মিল থাকতে পারে

তা হলে তো সব ছবিতেই কিছু কিছু মিল পাওয়া যাবে। ফর্ম-টর্ম কিছু একটা ব্যাপার না। ব্যাপার হচ্ছে content—approach। তার থেকে expression-টা আসে। Form টা শুধু expression-এর জন্য। যেমন গদার completely একজন working communist। সে ভেবেছিল গল্পের কোনো value নেই। এই ছিল তার stand। এখন সে বলছে যে, না গল্পের দরকার আছে। এখন he has changed, লোকে অভিজ্ঞতা থেকে, নিজের ছবি দেখে, পৃথিবী দেখে, তার ছবি দেখে অন্যের reaction দেখে আস্তে আস্তে বদলায়। যে আমি ‘অযান্ত্রিক’করেছিলাম, সে আমি কি আছি? সত্যজিৎ বাবুর ‘সীমাবদ্ধে’র সাথে ‘পথের পাঁচালী’র কী মিল? ‘অশনি সংকেত’-এর সাথে ‘পথের পাঁচালী’র কয়েকটা শট-ফটে মিল থাকতে পারে, আর কী মিল?

কোনো এক লেখায় বার্গম্যানকে আপনি নকলনবীশ বলে উল্লেখ করেছেন

জোচ্চের বলেছি।

আপনি বলেছেন বার্গম্যান সব জিনিসকে খানিকটা ভাইকিংসদের ফিলসফির সঙ্গে মিলিয়ে চালাবার চেষ্টা করেন যাকে আপনি চমক ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারেন না আপনিতিতাস’-এর সুটিং চলাকালীন এক সময়ে কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন বার্গম্যান হল শিল্পের জোচ্চোর আপত্তি না থাকলে বার্গম্যান সম্পর্কে আপনার ব্যক্তিগত ধারণাটা একটু বিশদভাবে বলুন

বার্গম্যান সম্পর্কে বলতে গেলে অনেক কিছুই বলতে হয়। বার্গম্যানের দু’একটা ছবি ছাড়া আর সব ছবিই মধ্যযুগ, আদি মধ্যযুগ, ক্রুসেডের পিরিয়ড এবং তারো আগের পিরিয়ড এগুলো নিয়েই সৃজিত হয়েছে। কেন হয়েছে? তার কারণ হচ্ছে যে সুইডেন হচ্ছে one of the last countries to be Christianized। সুইডেনে বিশেষ করে whole Scandinavia-তে Vikings philosophy যেমন সারাজ’, হালহালা ইত্যাদি একটা খুব vigorous ব্যাপার ছিল। তার সঙ্গে লড়াই করে ঢুকতে হয়েছে Christianity-কে। এখনও সেই conflict টাকে although refer back করে continuously। যেমন ‘Virgin Spring, Virgin Spring-টা কী? আসলে ব্যাপারটা হচ্ছে একটা চার্চ স্থাপন করে তার পিছনে একটা মিথ্যা গপ্পো তৈরি না করলে তো লোককে আর টানা যায় না। সেই জন্যই গপ্পো ফাঁদা হয়েছে যে একটা বাচ্চা মেয়ে raped হয়েছিল but she was so innocent যে সেখানে একটা spring grow করল, এবং সেখানে বিরাট করে Cathedral তৈরি শুরু হল। এখন এর পেছনে একটা গুল তৈরি করতে না পারলে তো পুরুতদের জমবে না। সেই জন্য একটা গুল তৈরি করা— সে মেয়ে হেন তেন— আসলে কিছুই না। আসলে হচ্ছে যে একটা emotional surcharge না করে তো আর Pagan philosophy-কে আনা যাবে না। লোকের মধ্যে ঐ জায়গায় একটা পীর, ওখানে একটা দরবেশ, এখানে একটা গুরুদেব এই সমস্তবিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করতে হবে— উনি ছিলেন সেখানে, কাজেই এটা হয়েছে। এই যে গুল— এগুলো কী? What is this Seventh Seal’? Terrific। জোচ্চর বলেছি এইজন্য— জোচ্চোর তো আর যাকে তাকে বলা যায় না। জোচ্চোর কাকে বলবে, one of the supreme brain, one of the supreme technician যে জেনেশুনে বদমাইশি করছে। গাধাদের কাছ থেকে তো এটা আশা করা যায় না— যে জোচ্চরি করতেই জানে না। If he does not know the truth, he cannot cheat. So knowing fully well he is cheating. Do you follow me? সেই জন্যই তাকে জোচ্চোর বলেছি।

কিন্তু তার কিছু কিছু ছবি যেমন ধরুন ‘Soul’  ব্যতিক্রমধর্মী মনে হয়

Terrific ছবি। শুধু ‘Soul’ কেন, ‘The Face’-ও Terrific ছবি। শেষটায় আমার মনে হয় যেন ego থেকে বেরিয়ে এসে খানিকটা আজকের agony-কে ধরার চেষ্টা আছে। ‘Silence’-ও তাই। তাই বলছি যে series of film যেমন ‘Winter light’, ‘Wild strawberries’-christian philosophy-র সেই ডাক্তার—সেই স্টিগমেটারের চিহ্ন, ক্রসের চিহ্ন, সিম্বল সমস্ত কিছু Biblical। এই জিনিসগুলোকে I don’t like.

এটা তো Social Consciousnessএর ব্যাপার

এখানে social consciousness কোথায়? Seventh Century কি Eighth Century-র Sweden-এর সাথে আজকের সুইডেন এর কোনো সম্পর্ক আছে? social consciousness-এর মানে কী? একবার করলাম সেটা একটা কথা। তা করছে তো। পাসোলীনি করেনি? ‘Gospel According to St. Mathews’ সম্পূর্ণ Biblical কিন্তু কী terrific ভাবে সেটা আজকের context-এ টেনেছে। কাজানজাকিস, কাকোয়ানীস এরাও তো ক্রিশ্চিয়ান myth গুলো নিয়েই ছবি করেছেন এবং আজকের context-এ টেনে। কিন্তু এ ব্যাটা শুধু পেছনের দিকে নিয়ে যাবারই চেষ্টা করছে। এরা ঐতিহ্যটাকে টেনে আজকের দিনের সঙ্গে তার মানে তৈরি করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। আর এ ভদ্রলোক চেষ্টা করছেন আমাদের পিছনমুখী করতে। একই জিনিস— ওটা আমি কেন করব না। আমি করতে পারি— আমিও কি রামায়ণ, মহাভারতের গল্প করতে পারি না? করা মানে, আমি কী করব ওটাকে ওখানে টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। মোটেই না। ওখান থেকে টেনে আমাদের ঐতিহ্যের অংশ আমাদের দেশের কাজেই তাকে আমার টানার সমস্তঅধিকার আছে। এদের সবাইকে আমি দেখিয়েছি আমার ছবিতে। আমি দেখাচ্ছি যে এই হচ্ছে ছবিটুকু।

সে ক্ষেত্রে আপনার নিজের তো বক্তব্য থাকতে পারে

আমার বক্তব্য হচ্ছে যে হাজার বছর ধরে আমার চাষী বসে আছে। আর তোমরা নেচে কুঁদে যাচ্ছ। সক্কলে নচ্ছার। ছবি আরম্ভ হচ্ছে এক বুড়োকে দিয়ে। আর কিছু নেই। শেষও হয়েছে সেই বুড়োকে দিয়ে। বুড়ো বসেই আছে। সে কাশছে। কী করবে? আর দাদারা সব করে যাচ্ছে। বাকতাল্লা বাজিয়ে বড় বড় কথা, হ্যান ত্যান। সকলেই দেশের মুক্তি আন্দোলন পকেটে করে বসে আছে। কী করে মুক্তি আসবে? কী করে সব কিছু হবে? সক্কলে জানে— সব ডাক্তার। সব গদীর জন্য দৌড়াদৌড়ি করছে। এই তো বক্তব্য আমার। আমি এটা as a common Citizen of India, who has gone through all these things, এর point of view থেকে দেখেছি। No political issues। আমার Universal গালাগালি। সেটা হল এই জন্য যে ওরা আমাদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। আমি জানিনে solution, আমার কাছে কোনো theory নেই।

এটা এক ধরনের exposition।  কিন্তু আপনার নিজের একটা বক্তব্য থাকতে পারে তো?

সুইডেন-এর Definitely অধিকার আছে করার। Crusades, প্রথম Christianity advent, Pagan philosophy এগুলো সম্পূর্ণ ওর সম্পত্তি। কিন্তু সে সম্পত্তিটাকে তুমি কিভাবে ব্যবহার করছ? যেহেতু সে extremely powerful—One of the greatest film maker of the world। সে জন্যই ওকথা বলা হয়েছে। একটা হেজী, পেজী, Tom, Dick and Harry-কে তো আর কেউ জোচ্চোর বলবে না। That fellow does not know, বুঝেছ?

আপনার নিজের লেখা কাহিনী নিয়ে ছবিযুক্তি, তক্কো গপ্পো’-কে সরাসরি পলিটিক্যাল ছবি বলতে চেয়েছেন পলিটিক্যাল ছবির যদিও কোনো নির্ধারিত সংজ্ঞা নেই তথাপি আপনিও কি মৃণাল সেনের মতো কোনো বিশেষ একটি মতবাদ কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শ ব্যাখ্যায় সচেষ্ট হবেন, নাকি অন্য কিছু?

না, ব্যাখ্যার কথা না। ওতে ১৯৭১ সাল থেকে ১৯৭২ সালে পশ্চিম বাংলার যে রাজনৈতিক পটভূমি এবং সেটাকে আমি নিজের চোখে যা দেখেছি তা চিত্রায়িত করা হয়েছে। তাতে কোনো মতবাদের ব্যাপার নেই। from a point of view of not a politician. Political কোনো মতবাদকে যেমন Naxalite মতবাদ আমার please করার কথা না, ইন্দিরা গান্ধীকে please করার কথা না CPM-কে please করার দরকার নেই, CPI-কেও please  করার দরকার নেই— আমার থাকলেও ছবিতে আমি শ্লোগানে বিশ্বাস করি না। ওর থেকে যদি কিছু emerge করে, through situation, through conflict, একটা কিছু যদি তোমাদের mind-এ আসে তো এল। কিন্তু আমি এইটেই solution বলতে পারি না।

অবশ্য এটা কোনো ছবিতেই আপনি বলেননি

না, বলা যায় না। আমি তো মনে করি বলা উচিতও না। কিন্তু এগুলোকে ধরা উচিত, কারণ আমি চোখের ‘পরে দুঃখের কটাক্ষ তো দেখছি।

আপনার প্রায় সব ছবিতেই একটা Optimism লক্ষ্য করেছি সম্বন্ধে আপনার মতামত কী?

ও সমস্ত অপটিমিজম-টপটিমিজম বুঝি না। মোদ্দা বাংলা হচ্ছে—এই হচ্ছে যুক্তি-তক্কো-গপ্পো। একে যদি তোমরা political বল তো political, non-political বল তো non-political. But no slogan, no party -বাজী, Universal Condemnation। আমার কিছু বক্তব্য নেই। I am not a political man, আমি politics করি না। কাজেই কোনো party করি না। কিন্তু চারপাশে আমি reality দেখেছি তো।

আপনি কি কোনোইজমে’  বিশ্বাস করেন?

আমি কিসেতে বিশ্বাস করি সেটা আমার অন্য জায়গায়। As an artist আমি সেটাকে চাপাতে চাই না। আমি mainly present করতে চাই যে এই ব্যাপারগুলো হয়েছে। এখন তুমি decide কর।

তার মানে আপনি কোনো ideology impose করতে চান না

Automatically থাকবেই ভিতরে, কিন্তু সেটা সোচ্চার নয়। তোমরা ‘সুবর্ণরেখা’  দেখনি? এতে ideology নেই? এতেও থাকবে।

হ্যাঁ দেখেছি ভীষণ আশাবাদী ছবি

আশাবাদ ছাড়াও ideology একটা definitely আছে। Analysis of the condition of the then West Bengal। তার পরে একটা comment আছে তো? এখানেও একটা comment থাকবে। আর সেই comment টা দিয়ে আমি একটা slogan mongering  বা ঐ সমস্তের মধ্যে নেই।

ফিল্ম ফিনান্স কর্পোরেশন যাদের টাকা দিচ্ছে আর যারা এফ, এফ, সি টাকা পাচ্ছে না নিয়ে দুটো গ্রুপ তৈরি হয়েছে তাঁদের বক্তব্যও দুরকম এফ, এফ, সি পক্ষপাতিত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠিত চলচ্চিচত্রকাররাই এফ, এফ, সি অর্থ সাহায্য পাচ্ছেন নতুনরা যারা ভালো ছবি করতে চাইছে তারা তাদের স্ক্রিপ্ট নিয়ে দেনদরবার করতে করতে উৎসাহ ধৈর্য্য দুটোই হারিয়ে ফেলছে এতে কি এফ, এফ, সি দায়িত্বহীনতা প্রকাশ পাচ্ছে না? তা হলে আর ভালো ছবি সৃষ্টিতে এফ, এফ, সি ভূমিকাটা রইল কোথায়?

FFC-এ পর্যন্ত অন্ততঃপক্ষে, আমি ঠিক exactly এর পরিসংখ্যানটা বলতে পারব না, তবে জন্ম থেকে গোটা ষাটেক ছবি finance করেছে। তার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত বলতে কি, আগে যাদের নাম ছিল এমন লোকের মধ্যে একমাত্র মৃণাল সেন এবং আমিই সাহায্য পেয়েছি। আর কোনো তৃতীয় ব্যক্তি অর্থাৎ প্রতিষ্ঠিতদের মধ্যে কেউ পায়নি। আর প্রতিষ্ঠিত সব নতুন নতুন ছেলে তাদের মধ্যে more than 75% যারা ছবি করতে গিয়েছিল টাকা মেরে পালিয়েছে। Straight টাকা মেরে হাওয়া হয়েছে। যেমন একজনের নাম বলছি অচলা সচদেব বলে একজন actress আছেন তার স্বামী জ্ঞান সচদেব। আড়াই লাখ টাকা advance নিয়ে বসে আছে।  ফেরত নেওয়ার কোনো উপায় নেই। এইভাবে সয়লাব করছে। আর তারা যে নতুন ছেলেদের টাকা দেয়নি তা না। আমারই student, Gold medalist from Film Institute of Poona মনি কাউলের দু’দুটো ছবিকে finance করেছে এবং ওর দুটো ছবিরই যথেষ্ট নাম হয়েছে। He has established himself, not only that, এ বছর ফ্রাঙ্কফুর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে যে সেমিনার হয় সেখানে Jury হয়ে সে গিয়েছে। এতকিছু সম্মান সে পাচ্ছে। কুমার সাহানীকেও FFC একটা ছবি করতে দিয়েছে। সে ছবিটা এখনো release হয়নি। কে বলেছে, নতুন ছেলেদের দেয় না? একজন দু’জন এখানে ওখানে তড়পে বেড়াচ্ছে। এখনকার মধ্যে আমি যতদূর জানি পূর্ণেন্দু পত্রীকে ওরা দেয়নি। সে জন্যই এতসব ব্যাপার। কিন্তু He is not a new director। সে ‘স্বপ্ন নিয়ে’  বলে একটা ছবি করেছিল। তারপর এখন স্ত্রীর পত্র’করেছে। কাজেই তাকে— You cannot say, he is a new one.

কিন্তু তার অভিযোগটা খুব বড় করে দেখানো হয়েছে

সেটা আনন্দবাজার পত্রিকা গ্রুপ। Because he works in আনন্দবাজার। তারা ওটা নিয়ে নাচানাচি করেছে। তাতে কিছু যায় আসে না। আমাদের দেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের কিস্সু যায় আসে না। আনন্দবাজার তো হচ্ছে একটা fascist organisation. Fascist ও নয় CIA agent।

এটা কি Off the record না কি?

Off the record কেন, on the record. I shout from the house tops, from the house tops to the streets। আজকে তোমাদের এখানে off the record করতে যাব কী জন্য?

পুনা ফিল্ম ইনস্টিটিউটে শিক্ষক হিসেবে বছর ছিলেন? সেখানে শিক্ষক থাকাকালীন অভিজ্ঞতার কথা কিছু বলুন

এটা কে বলল, আমি ছিলাম মানে? পুনায় আমি Visiting Professor হিসাবে দু’বছর জড়িত ছিলাম। প্রত্যেক দু’মাস পর পর যেতাম। দশদিন করে থাকতাম— চলে আসতাম। তারপর আমি vice-principal হিসাবে মাত্র তিন মাস ছিলাম। পুনায় আমার অভিজ্ঞতা হচ্ছে যে আমি মনে করি আমার জীবনে যে কয়টা সামান্য ছবি করেছি সেগুলি যদি পাল্লার একদিকে দেয়া হয় আর, মাস্টারিটা যদি আরেক দিকে দেয়া হয় তবে ওজনে এটা অনেক বেশি হবে। কারণ কাশ্মীর থেকে কেরালা, মাদ্রাজ থেকে আসাম পর্যন্ত সর্বত্র আমার ছাত্র-ছাত্রী আজকে উঠছে। I have contributed at least a little in their luck which is much more important than my own film making, আমি বলছি তো ওজনে ওটা অনেক বেশি।

পুনা ফিল্ম ইনস্টিটিউটে আপনার ছাত্রদের মধ্যে কুমার সাহানীমায়া দর্পণএবং মনি কাউলউসকী রোটীছবির মাধ্যমে যথেষ্ট প্রতিশ্রুতির পরিচয় দিয়েছেন তাঁদের সম্পর্কে আপনি দারুণ গর্বিত পুনা থেকে পাশ করা কে. কে. মহাজনও আপনার ছাত্র যে এখন সবচাইতে প্রতিভাবান আলোকচিত্রী আপনি শিক্ষক থাকাকালীন পশ্চিম বাংলার কোনো ছাত্রছাত্রী কি পুনায় ছিল না যাদের প্রতিভা উপরোক্ত শিল্পীদের সাথে তুলনা করা চলে?

ছিল। বেশ কয়জন ছিল। ক্যামেরাম্যানদের মধ্যে ধ্রুবজ্যোতি বসু ও সোমেন বলে দুটো ছেলে ছিল এবং এরা দু’জনেই সুযোগ সুবিধা পেলে মহাজনের থেকে খারাপ কাজ করবে না। ব্যাপার হচ্ছে ফিল্ম লাইনে ভালো কাজ জানলেই তো আর নাম করা যায় না। প্রতিযোগিতাও করা যায় না। মহাজন lucky যার ফলে সে একটা ভালো break পেয়ে গিয়েছে। এরা break এখনো পাচ্ছে না তাই ডকুমেন্টারি ফকুমেন্টারি করে বেড়াচ্ছে। কিন্তু এদের কাজ খুব ভালো।

দেশভাগ অর্থাৎ ভাঙ্গা বাংলার প্রতি আপনার যে মমত্ববোধ সেটা আপনার ছবির একটা বিশেষ দিক অন্তত সে কারণেই আপনার বিষয়গত ভাবনাসমন্বিত ট্রিলজীমেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমলগান্ধারআরসুবর্ণরেখা আপনার মতে আমাদের এই ভাগ হয়ে যাওয়াটার কারণেই আজকের এই অর্থনৈতিক সংকট স্বাভাবিকভাবে তাই আপনার ছবিতে কিছু রাজনৈতিক সমস্যাও আলোকিত হয় আপনি কী ভাবেন নাভাবেন সেটা বড় কথা নয়, আপনার ছবিটাই বলে দিচ্ছে এই হয়েছে বলে রকম হচ্ছে, এই না হলে হয়তো অন্যরকম হত ইত্যাদি বেশ বোঝা যায় আপনি কী বলতে চাচ্ছেন, আপনার ব্যথাটা কোথায় কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর আপনি সেরকম একটা ছবি করলেন না কেন? বিষয়বস্তুর দিক থেকে আপনিতিতাসকে বেছে নিলেন কী কারণে? ছবিটা তো আরো পরে হতে পারত কেননা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে আপনার পূর্বেকার চিন্তা-ভাবনাগুলো আরও উন্নতভাবে প্রকাশ পেতে পারত

যখন আমার ‘তিতাস’করার কথা আসে তখন এ দেশটা সবে স্বাধীন হয়েছে। এবং most unsettled। এখন যে খুব একটা স্বাধীন হয়েছে তা মনে হয় না। কিন্তু তবু তখন একেবারে কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। কী চেহারা নেবে। সব শিল্পই দু’রকমভাবে করা যায়। একটা হচ্ছে খবরের কাগুজে শিল্প। সেটা করতে পারতাম। আরেকটা হচ্ছে উপন্যাস—যেটা lasting value। সেটার জন্য থিতোতে দিতে হয়। নিজের মাথার মধ্যে অভিজ্ঞতা খরচা করতে হয়। Time দিতে হয়— ভাবতে হয়। It takes two-three years, four years and then only you can make such a film, otherwise you cannot be honest। তুমি খবরের কাগুজেপনা করতে চাও করতে পার। আমি খবরের কাগুজে তো নই। আমি অনেক গভীরে ঢোকার চেষ্টা করি। কাজেই তখন ফট করে এসে— পঁচিশ বছর যেখানে আসিনি, সেখানে এসে কিছু বুঝতে-না-বুঝতে নাড়ীর যোগ না করতে করতে, দেশের মানুষকে গঞ্জে, বন্দরে, মাঠে, শহরে যাদের দেখি না, জানি না, চিনি না— আমি পাকামো করতে যাব কোন দুঃখে? আমার কোনো অধিকারই নেই। এই হচ্ছে এক। আর দু’নম্বর হচ্ছে তখন condition কেমন fast changing এটা, ওটা, সেটা, নানা রকম তার মধ্যে থেকে একটা Pattern আস্তে আস্তে বেরোক। আমি ভাববার সুযোগ-সুবিধা পাই। তোমাদের সঙ্গে যোগাযোগ হোক বারে বারে। আস্তে আস্তে ঠিক সময়েই ওটা হবে। আর ফরমায়েস দিয়ে শিল্প হয় না। তুমি হুকুম দিলে ‘দরবেশ’খাব, কি ‘রাঘবশাহী’খাব, কি  ‘রস কদম্ব খাব তা নয়। ‘দৈ দাও মরণ চাঁদের’এ ব্যাপারটা নয়। ব্যাপারটা হচ্ছে যে আমার ভেতরে থেকে যখন ইচ্ছা আসবে তখন করব। আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে যে সেইটে করার পক্ষে ‘তিতাস’টা ছিল আমার পক্ষে আইডিয়াল। কারণ ‘তিতাস’ছিল একটা subject যে subject মোটামুটি যে বাংলাটা নেই তার। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগেকার বাংলা। তার উপর তো পটভূমিটা। এর Subject-টা হচ্ছে এমন যা বাংলাদেশের সর্বত্র ঘোরার সুযোগ দেয়— গ্রাম বাংলাকে বোঝার সুযোগ দেয়। গাঁয়ে গিয়ে shooting করাটা বড় কথা নয়। shooting করার ফাঁকে ফাঁকে মানুষের সাথে মেশা, নাড়ীর স্পন্দনটাকে বোঝার চেষ্টা করা। কাজেই ‘তিতাস’-টা একটা অজুহাত এদিক থেকে। এবং ঐ অবস্থায় তিতাস ধরে করলে হয় কী— সেই মাকে ধরে পুজো করা হয়। তা এতগুলো কারণেই এই। ‘তিতাস’পরে হতে পারত না। এখনো ‘তিতাস’ আমার একটা study আর আমার একটা worship হিসাবে দেখা যেতে পারে। This river, this land, this people এদের মধ্যে যাবার একটা ব্যাপার আছে, আবার আছে এর সঙ্গে নিজেকে re-establish করা। আর শেষ কথা হচ্ছে ও সময়ে ওটা time ছিল না এবং time এখনো আসেনি। এখনো serious study করে serious work যেটা আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরে লোকে দেখে কিছু বুঝবে, সে রকম ছবি করার অবস্থা এখনো আমার আসেনি। মানে আমি এখনো এতটা বুঝে উঠতে পারিনি— কোন দিকে যাবে ইতিহাস। আমি যেদিন তাগিদ বোধ করবো, আমি ঠিক জুড়ে দেব। বুঝতে পেরেছ?

আপনি তো বাংলাদেশে একটা ছবি করলেন এখানকার অভিনেতাঅভিনেত্রী কলাকুশলী এবং যান্ত্রিক আয়োজন নিঃসন্দেহে ভালো ছবি তৈরির পক্ষে যথেষ্ট তা নয়ততিতাসে মতো মহৎ সৃষ্টি সম্ভব হত না তবু কেন বাংলাদেশে ভালো ছবি হচ্ছে না? বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প সম্পর্কে যতটুকু জেনেছেন তাতে কী মনে হচ্ছে আপনার? গলদটা কোথায়?

আমার জানা নেই। কারণ আমি এত ভালো করে জানিও না। আর এ কথা আলোচনা আমার কি করা উচিত?

আমাদের একটা suggestion হিসাবে যদি কিছু বলেন, আমরা যারা আছি তাদের প্রতি আপনার একটা উপদেশ অত্যন্ত প্রয়োজন আপনি তো ইন্ডাস্ট্রিতেও কিছুদিন ছিলেন

Suggestion হচ্ছে, এখানে ছবি না হওয়ার কারণ হচ্ছে যে পঁচিশ বছর ধরে তোমাদের দরজায় কুলুপ দিয়ে রাখা ছিল। কিস্সু দেখতে, শিখতে কিংবা পড়তে দেওয়া হয়নি। Somehow this has happened। হঠাৎ দরজা খুলেছে। এখন এই সুযোগটা গ্রহণ করে তোমাদের উচিত, যে করে পার Film Society Movement করার সাথে সাথে একটা পাঠাগার তৈরি করা। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ film সম্পর্কে বই, ম্যাগাজিন এবং ক্লাসিক বইগুলো জোগাড় করে নিজেরা পড়াশুনা করো। আসলে জিনিসটা হচ্ছে যে Serious attitude টা develop করা উচিত। কিন্তু attitude develop করতে যেটা আমরা করেছিলাম সেটা হচ্ছে পড়াশুনা। কারণ আমাদের কারোই মুরোদ ছিল না film করি বা বিদেশের ছবি দেখি। ঠিক এই অবস্থা ছিল কলকাতার, তা ১৯৪৪ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত। ১৯৫০-এ শুরু হল আমাদের World ক্লাসিকস এবং অন্যান্য ভালো ছবি দেখা, যদিও ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলন (Calcutta Film Society) শুরু হয়েছে ১৯৪৮ থেকে। তার আগে আমরা কী করেছি? আমরা তার আগে কোথায় আইজেনস্টাইনের Film Form, Film Sense, পুদভকিনের Film Technique & Film Acting, ক্রাকাওয়ের এবং পল রথার বই জোগাড় করে, রজার ম্যানভিলের বই জোগাড় করে, পড়ে, বুঝবার চেষ্টা করে মানসিক প্রস্তুতি নিয়েছি, তারপর ছবি পেয়েছি এবং দেখেছি। আমাদের এই চেষ্টাটা Film Industry-র completely বাইরে ছিল। আমরা সকলেই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে জড়িত ছিলাম। যেমন আমি Assistant Director ছিলাম, আমি গল্পলেখকও ছিলাম আবার এ্যাকটিংয়েও ছিলাম। কিন্তু সেটা ছিল একটা দিক। কারণ ওখানে এসব কথা বললে হাসতো আজকের মতো। একই, কোনো তফাৎ নেই। নিজেদের individual চেষ্টায় বা বন্ধুবান্ধবরা কয়েকজন মিলে এদিক ওদিক করতে করতে এক আধটা বই নিয়ে, পড়ে, আলোচনা করে বোঝবার চেষ্টা করা। এই করতে করতে বছরখানেক বা বছর দুয়েকের মধ্যে একটা আন্দোলন দানা বাঁধল। তখন society তৈরি করার একটা অবস্থা তৈরি হল। এই ভালো ছবির movement টা, সত্যিকারের সৎ ছবির movement টা এই commercial world-এর বাইরে করতে হয়। পরে commercial world-এ তার effect পড়ে এবং সেখানে আঘাত করার প্রশ্ন আসে। কিন্তু আঘাতটা করবে কে? অপ্রস্তুত সেপাই কতগুলো— হাতে ঢাল নেই, তলোয়ার নেই, নিধিরাম সর্দার— তাতো আর করতে পারবে না, তাদের তো complete mental preparation থাকা উচিৎ। আর ভেতরে কী আছে সেটার দরকার নেই। সব পৃথিবীতেই সমান আর কী।

উভয় বাংলার মানুষদের নিয়ে তো আপনি যথেষ্ট ভাবেন আপনার চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তুতেও তারই পক্ষপাতিত্ব এখন এই যে দুদেশের মধ্যে চলচ্চিত্র বিনিময় এবং যৌথ প্রযোজনায় চলচ্চিত্র সৃষ্টির কথা উঠছে, সম্পর্কে আপনি কী বলেন

করা উচিত। যত বেশি পারা যায় যৌথ প্রযোজনায় ছবি করা উচিত। আদান-প্রদান হওয়া উচিত। যাওয়া-আসা উচিত। মেশা উচিত। এটা তোমাদেরই করতে হবে। পৃথিবীর কোনো দেশেই সম্পূর্ণভাবে আশা করা যায় না যে এ সমস্ত ব্যাপারে সরকারী আমলাদের সাহায্য পাওয়া যাবে। কোনো জায়গায় কোনো Film Society, কোনো Film Movement, কোনো Art movement কোনোদিন bureaucrat-দের দিয়ে হয়নি। এরা একটা চেহারা করে পাঠাবে, আবার তারা ওখান থেকে একটা চেহারা করে পাঠাবে। এ চলবেই, এগুলো inevitable। কতগুলো ব্যাপার, তোমাদের দল বেঁধে যাওয়া উচিত কলকাতায়, গিয়ে ঘুরে দেখা উচিত। কিছু বই পড়া উচিত, কিছু মেশা উচিত। আবার ওখান থেকে ছেলেপেলে এখানে আসা উচিত। ঠিক same। তার একটা পথ হচ্ছে ঐ joint production। ওখান থেকে কিছু ছেলে কিছু কর্মী এল, তোমরা কিছু জুটলে। ঠিক এগুলো হওয়া উচিত। কিন্তু এগুলো করার জন্য যদি মুখাপেক্ষী হয়ে বসে থাক! নিজেদের মধ্যে জোর আনতে হবে, পরে সরকারকে convince করতে হবে। যেমন Indian Government এখন আর এই media-র গুরুত্বকে অস্বীকার করতে পারবে না। যার জন্য তার, FFC তৈরি করতে হয়েছে, Film Institute তৈরি করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু তার আগে কত বছরের চেষ্টায় তাদের মনে এই seriousness টা ঢোকাতে হয়েছে, নইলে প্রথম দিন বললে কেউ দিত নাকি? ‘৪৮-এ ভাবতে পারত নাকি কেউ যে সরকার টাকা দিচ্ছে, ব্যাংক টাকা দিচ্ছে Film-কে।

FFC আর Film Development Boardএর মধ্যে পার্থক্য কী?

কলকাতায় West Bengal Film Development Board—সেটাProvincial আর এটা হচ্ছে All India থেকে। Development Board টা সবে হয়েছে, ওটার কোনো কাজ-টাজ নেই।

ভারতের ভালো বাংলা ছবি, শিল্প ছবি কিংবা চলচ্চিত্র আন্দোলনের কথা উঠলেই আবশ্যিকভাবে তিনটি একঘেঁয়ে নাম এসে যেতসত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক আর মৃণাল সেন কিন্তু আশার কথা সম্প্রতি এর সাথে আর একটি নাম যুক্ত হয়েছে পূর্ণেন্দু পত্রী কিন্তু এদের বাইরেও কি প্রতিশ্রুতিশীল চলচ্চিত্রকার নেই? যদি থেকে থাকে তাহলে তাদের নাম অনুচ্চারিত কেন?

এ তো বাংলা ছবির কথা হচ্ছে?

না, আপনি All India Basis বলুন

মনি কাউল, কুমার সাহানী এদের নাম তো এখন উঠছে। আর কলকাতায় এখন পর্যন্তকাউকে দেখা যায়নি। কাজেই এদের কথা কী বলব।

চলচ্চিত্র সর্বাধুনিক শিল্পমাধ্যম অন্যান্য শিল্পমাধ্যমের শিল্পীদের চলচ্চিত্র সম্পর্কে না জানলেও বোধহয় স্বীয় মাধ্যমে করে খাওয়া যায় কিন্তু চলচ্চিত্রকারকে সকল প্রকার শিল্পকলা সম্পর্কে গভীরভাবে জানতে হয় বাংলাদেশের সাহিত্যিকরা চলচ্চিত্রের ব্যাপারে আদৌ কোনো উৎসাহ প্রকাশ করে থাকেন না বরং মাধ্যমটির প্রতি তাদের চরমতম অনীহা চলচ্চিত্রের প্রতি সাহিত্যিকদের দায়িত্ব সম্পর্কে আপনার ব্যক্তিগত ধারণা কী?

ঐ বললাম তো, লোককে জোর করে তো আর কিছু করানো যায় না? সাহিত্যিকদের অনীহার কারণ হচ্ছে সাহিত্যিকরা চোখের সামনে যা দেখছেন তার ভিত্তিতে হবে অনেকটা। কাজেই তারা যখন দেখবেন কিছু ছেলেপেলে কিছু serious চেষ্টা করছে, পারুক আর না পারুক, সবাই যে successful হবে এমন তো নয়। কিন্তু attempts হচ্ছে। Some good boys, রুচিবান কিছু ছেলেপুলে কিছু করার চেষ্টা করছে। তখন automatically সাহিত্যিকরা বুঝবেন যে জিনিসটা serious। এখন বললে তাঁরা বলবেন যে এখানে যা হয় তাতে আমরা কী বলব? ভালো একটা গল্প দেব, কেউ নেবে না। তাই তো এখন সত্যি সত্যি ঘটনা। আমরা করবোটা কিভাবে? How to help and why to get interested? তাদের সবাইকে interested করতে গেলে এখান থেকে একটা force আসা উচিত। তাহলে automatically তাদের মনের মধ্যে আগ্রহ আসবে। আগ্রহ এলেই interested হবে। এবং তখন তারা সেই দিকে লেখার কথা ভাববেন। Filmic story কাকে বলে এটা নিয়ে চিন্তা করবেন। যাঁরা তোমাদের এখানে sincere লেখক আছে তাঁরা এটি করবেন। কিন্তু এখন how do you expect serious people to be interested?

যতদূর জানি যাবৎ আপনার কোনো ছবি সরকারিভাবে কোনো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রেরিত হয়নি জর্জ শাদুলের আমন্ত্রের পর কিসুবর্ণরেখাকে কোনো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পাঠান সম্ভব হয়েছিল? আপনার ছবি বিদেশে না পাঠানোর ব্যাপারে কারণটা কীসরকারি আমলাদের কারসাজি, না কি রাজনৈতিক?

আমি তো সমস্ত কিছু বলতেও পারব না। তবে এটা ঠিকই যে সরকারিভাবে কখনো আমার কোনো ছবি যায়নি। আর আসল কথা হচ্ছে যে ‘সুবর্ণরেখা’র  পিরিয়ড পর্যন্ত আমি ব্রাত্য ছিলাম— আমি অপাংক্তেয় ছিলাম। সেটা রাজনৈতিক কারণে তো বটেই। তাছাড়া ভেতরে ভেতরে সব হিংসার ব্যাপার ট্যাপার থাকে। এখন আমি জাতে উঠেছি। তখন তো আমি ছিলাম না এমন। কাজেই এখান থেকে ওখান থেকে নানারকম খোচাখুচি— অমুক তমুক। যেমন ‘সুবর্ণরেখা’তারা আটকাতে পারেনি। তখন তো India-তে ভালো Subtitle হত না। কোনো ছবি বিদেশে পাঠাতে গেলে subtitle না পাঠানো ঠিক নয়। You cannot expect তারা Venice কিংবা Cannes-এ বসে বাংলা বুঝবে।

শুনছি বাংলাদেশে সৃজিত আপনার ছবিতিতাস একটি নদীর নামবিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা হচ্ছে সরকারিভাবে, কিংবা অন্য কোনো বাধা এসেছে কি? আরতিতাস’  যে বাণিজ্যিকভাবে ভারতে প্রদর্শিত হবার কথা ছিল তার কী হল

এ সবগুলোই চেষ্টা চলছে। এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে এরা বিভিন্ন festival-এ যেখান থেকে দাওয়াত পেয়েছেন সেসব জায়গায় এরা পাঠাবার কথা ভাবছেন। সে নিয়ে আলোচনা চলছে। সে একই ব্যাপার কলকাতায় দেখানোর ব্যাপারেও। ওখানে এটা আলোচনা অবস্থায় আছে। এখনো final কিছু হয়নি।

সত্যজিৎ রায় কোনো এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন ভারতবর্ষে এখন তিনটি কমিউনিস্ট পার্টিএবং আমি সত্যিই জানি না যে তার অর্থ কী? কমিউনিস্ট পার্টির এই দ্বিধা বিভক্তিতে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

তিনটে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি আমার আপত্তি— ওটা ফিল্মের কোনো ব্যাপার নয়। ওটা ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো’ তে আমার বক্তব্য থেকে বেরিয়ে আসবে, আর রাজনীতির আলোচনা আমি করতে পারি। ৮/১০ ঘণ্টা আমি বলতে পারি। কিন্তু why—লাভটা কী! ওটার সাথে ফিল্মের কী সম্পর্ক আছে? কমিউনিস্ট পার্টি-ফার্টির কথা তুলে লাভ কী আছে। আমি তো মনে করি না যে as a film maker নিয়ে কথা বলা উচিত। As a social being I may have some feelings, some ideas। যা আছে ছবিতেই আছে, ওটা নিয়ে আমি কোনো মতামত দিতে চাই না।

ভিয়েতনাম নিয়ে ছবি করবেন বলে একবার ভেবেছিলেন তার কী হল?

ভিয়েতনাম নিয়ে ছবি করব বলে ভেবেছিলাম, তার স্ক্রিপ্ট হয়েছে এবং সে স্ক্রিপ্ট ছাপাও হয়েছে। সবই হয়েছে। কিন্তু ছবি হওয়াটা তো চাট্টিখানি কথা না? ছবি করা গেল না।

ওটা কি একেবারে বাদই দিয়েছেন, নাকি ছবি করার ইচ্ছে আছে আপনার?

এখন সে ভিয়েতনাম আর কোথায়? এখন আর ছবি করার কোনো মানেই হয় না।

‘যুক্তি তক্কো, গপ্পো পর কী ছবি করবেন? কোনো পরিকল্পনা থাকলে কিছু বলুন

এখনো আলোচনা চলছে, ভাবছি। এখনো কিছু final হয়নি। কথাবার্তা চলছে।

আপনার অধিকাংশ ছবির কিছু কিছু চরিত্র Archetypal symbol হয়ে প্রকাশ পায় আপনি মনোবিজ্ঞানী ইয়ুংএর কালেকটিভ আনকনশাসনেস দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত তাই আপনার ছবির চরিত্ররা যেমনমেঘে ঢাকা তারা নীতা, গৌরী, ‘কোমলগান্ধার’-এর অনুসয়া, শকুন্তলা, ‘সুবর্ণরেখা সীতার মা, সীতা, এবংতিতাসে রাজার ঝি, ভগবতী প্রত্নপ্রতিমার আদলে গঠিত আপনারযুক্তি, তক্কো, গপ্পোএবং আগামী ছবিতে কি ধরনের আর্কিটাইপাল ইমেজের প্রকাশ ঘটবে?

আর্কিটাইপাল ইমেজ এমন একটা জিনিস যেটা অঙ্ক কষে আসে না। আর দ্বিতীয়ত সে চিন্তা এখন যদি আমার থাকে তবে ওটা প্রভাবিত হবেই কোনো-না-কোনো চরিত্রে।

বাংলাদেশের কোনো ছবি দেখেছেন কি? দেখে থাকলে আপনার অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে বলুন

বাংলাদেশের একটাই ছবি দেখেছি আমি, ‘জীবন থেকে নেয়া’। হ্যাঁ, ‘ওরা এগারোজন’-ও দেখেছি। এই দুটো, দুটো ছবি দেখে আমি বাংলাদেশের ছবি সম্পর্কে কী বলব। ‘জীবন থেকে নেয়া’  আমি কলকাতায় দেখেছি। ও সম্বন্ধে এক কথায় বলা যায় যে তখনকার অবস্থায় এমন একটা ছবি এখানে বসে করা, এর জন্য বুকের পাটা দরকার। ছবি content-এর দিক থেকে বলছি। form বা Structural ব্যাপার এ সমস্তই আমি আলোচনাই করছি না। তখনকার যে অবস্থা ছিল তার মধ্যে একটা ছেলে এরকম Bold ভাবে কাজ করতে পারে, ভাবতে পারে, সেটা অভিনন্দনযোগ্য। আর ‘ওরা এগারোজন’ —ঠিক আছে।

‘তিতাস’  এখানকার দর্শক নেয়নি এর কারণটা কী? আপনি নিজে ব্যাপারে কী মনে করেন?

আমি তখন প্রথমত মৃত্যুশয্যায়। কাজেই কে নিয়েছে কে নেয়নি তারপরে যে লেখা ‘তিতাস’সম্পর্কে এখানে হয়েছে তা উড়ো উড়ো শুনেছি। আমি পড়িওনি কিছু। কারণ আমি বলতেই পারব না। কারণ আমি এখানে ছিলামও না এবং কোনো interest  নেওয়ার মতো অবস্থাও আমার ছিল না। আমি হাসপাতালে তখন পড়ে আছি। আর এর মধ্যে লেখাও বিশেষ পাইটাই নাই। কাজেই এর সম্বন্ধে আমি বলি কী করে। কেন নেয়নি সে সম্বন্ধে তো তোমরা বলতে পারবে। তোমরা তো এখানে উপস্থিত ছিলে। আমি তখন এখানে নেই। So how can I tell!

‘চিত্রবীক্ষণেরসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে আপনি বলেছিলেন যে এখানকার খবরের কাগজওয়ালারাতিতাসকরার সময় প্রথম প্রথম আপনাকে সুচক্ষে দেখেনি পরে নাকি এই বিরূপ ভাবটা প্রীতির সম্পর্কে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল কিন্তুতিতাসমুক্তি পাবার পর এখানকার পত্রপত্রিকাগুলো আপনি পড়েছেন কি না জানি না, অনেকেই আপনাকে উদ্দেশ্য মূলকভাবে গালাগাল করেছে এতে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

এ বিষয়ে আমার বলার মতো কোনো ব্যাপার আছে? প্রথমে যখন আমি এখানে এসেছিলাম তখন সত্যি সত্যি কিছু লেখাটেখা বেরিয়েছিল। সেগুলো পড়ে বুঝতে পারলাম যে তারা খুব ভালোভাবে নেয়নি। তারপর সে লোকগুলোর সাথে কাজ করাকালীন আমার ব্যক্তিগত পরিচয়-টরিচয় যখন হল আমি দেখলাম যে তাদের more or less  আমার প্রতি বেশ ভালোই attitude, তারপর ছবি বেরুনোর পরে কেউ যদি অভিসন্ধিমলকভাবে কিছু করে থাকে— প্রথমত কে করেছে, কে করে নাই— বললাম তো আমি কিছু জানি না। যদি করে, থাকে তার উত্তর দেওয়া আমি ঘৃণ্য মনে করি। আর যদি ইচ্ছা করে না করে তার সত্যিই মনে হয়ে থাকে তা হলে আমি তাকে সেলাম করি, কিন্তু এটা যদি বোঝা যায় কেউ অভিসন্ধিমূলকভাবে কোনো কিছু করছে তবে তার উত্তর দেওয়া কি উচিৎ? কী লাভ হবে দিয়ে?

বাংলাদেশে ভবিষ্যতে আর কোনো ছবি করার কথা ভাবছেন কি না

না, এখনো পর্যন্ত ভাবার মতো আসেনি।

ডাক পড়লে আসবেন কি?

সে সব পরের কথা পরে হবে। এসব conjectural কথাবার্তাগুলো আলোচনা করে লাভ কী? কেউ যখন এখনো ডাকেনি তখন ডাক পড়লে আসবো কি না তা ভেবে কী হবে? তাছাড়া নিজের হাত এখন full। এই তিতাসের পুরোটা তৈরি করতে হবে তো, ‘যুক্তি, তক্কো গপ্পো’  শেষ করতে হবে। তা আমার হাত তো at least for a month or two full। তার পরে এ দুটো ছবি কলকাতায় রিলিজ করতে গেলে যথেষ্ট ঝামেলা, আমাদের দেশে Director-এর, বিশেষ করে কলকাতায় ছবি রিলিজের সময় লোককে ইয়ে কর, কাজেই ঐসব দিকে এখন concentrate করতে হবে, কাজেই immediately এখন বলে কী লাভ?

ইন্দিরা গান্ধীর ওপর প্রামাণ্য ছবি (যাকে আপনি প্রামাণ্য ছবি না বলে Character study বলতে চেয়েছেন) করতে যাওয়ার উদ্দেশ্য কী? ধরনের বিষয়বস্তু আপনার চলচ্চিত্রমানসের সাথে খাপ খায় না দ্বিতীয়ত রাজনৈতিক এবং চিন্তার দিক থেকেও যা একান্তই ভিন্ন ইন্দিরা গান্ধীর উপর এই ছবি করতে যাওয়াটাকে অনেকে আপনার কমপ্রোমাইজিং এ্যাটিচুড এবং স্ববিরোধিতা বলে আখ্যায়িত করতে চাইছে সম্পর্কে আপনি যদি স্পষ্ট করে কিছু বলতেন

আমার স্পষ্ট করে কিছুই বলার নেই এ বিষয়ে, ছবিটা আদ্দেক হয়ে পড়ে আছে, যদি শেষ হয়— ছবি যখন বেরোবে তখন কেন করতে চেয়েছিলাম পরিষ্কার দিনের আলোর মতো হয়ে যাবে। এবং স্ববিরোধিতা কিনা ওটাই প্রমাণ করবে। এবং compromise কিনা ওটাই প্রমাণ করবে। আর্টিস্ট-এর কাছে এসব প্রশ্ন করে লাভ নেই, খালি একটাই কথা যে wait কর। See it and then condemn it।

কিছু কিছু লোক ধরনের মন্তব্য করছে যেঋত্বিক ঘটক তো এখন ইন্দিরা গান্ধীর ওপর ছবি করছে!’ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?

এ সমস্ত কথার উত্তর দেবার কী আছে? যে উত্তর দিয়েছি সেই উত্তরই। অভিসন্ধিমূলক কথার উত্তর দেওয়াটা ঘৃণ্য। ছবিটা আমি যদি শেষ করি, ছবিটা দেখলেই যদি বোঝা যায় যে আমি অভিসন্ধিমূলক কাজ করছি— কি আমি compromise করছি, কি আমি স্ববিরোধিতা করছি, তখন আমাকে তুলে খিস্তি করো।  তার আগে যেটা হয়নি, হবে কিনা তা জানা নাই, সম্ভাবনার ওপর তো বলা যায় না?

পুনাতে যে দুটো শর্ট ফিল্ম হয়েছে যেমনরঁদেভোআরফিয়ারওগুলো কি আপনিই করেছেন, না ছেলেরা করেছে আপনার তত্ত্বাবধানে?

‘রঁদেভো’ টা ছেলেরা করেছে আমার তত্ত্বাবধানে। For Direction students আর ‘ফিয়ার’টা, আমি করেছি for acting Course।

সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময়কাল ১৯৭৪ সালের ১৩ই মে

চলচ্চিত্রপঞ্জি

কাহিনী চলচ্চিত্র

নাগরিক ১৯৫২-৫৩ (মুক্তি পায় ১৯৭৫)

অযান্ত্রিক ১৯৫৮

বাড়ি থেকে পালিয়ে ১৯৫৯

মেঘে ঢাকা তারা ১৯৬০

কোমলগান্ধার ১৯৬১

সুবর্ণরেখা ১৯৬২

তিতাস একটি নদীর নাম ১৯৭৩

যুক্তি, তক্কো, গপ্পো ১৯৭৪

প্রামাণ্য চলচ্চিত্র

ওঁরাও ১৯৫৫

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান ১৯৬৩

সায়েন্টিস্ট অব টুমরো ১৯৬৭

ছৌ ডান্স অব পুরুলিয়া ১৯৭০

স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি

ফিয়ার ১৯৬৫

রঁদেভ্যু ১৯৬৫

আমার লেলিন ১৯৭০

দি কোশ্চেন ১৯৭০

দুর্বার গতি পদ্মা ১৯৭১

যেসব চলচ্চিত্রকারদের জন্য কাহিনী চিত্রনাট্য রচনা করেছেন

মুশাফির (হিন্দি) । চলচ্চিত্রকার : ঋষিকেশ মুখার্জি, ১৯৫৫

মধুমতি (হিন্দি)। চলচ্চিত্রকার : বিমলরায়, ১৯৫৫

স্বরলিপি (বাংলা) । চলচ্চিত্রকার : অসিত সেন, ১৯৬০

কুমারী মন (বাংলা)।চলচ্চিত্রকার: চিত্ররথ, ১৯৬২

দ্বীপের নাম টিয়ারং (বাংলা) চলচ্চিত্রকার : গুরু বাগচী, ১৯৬৩

রাজকন্যা (বাংলা) চলচ্চিত্রকার : সুনীল ব্যানার্জি, ১৯৬৫

অভিনীত চলচ্চিত্রসমূহ

তথাপি। চলচ্চিত্রকার: মনোজ ভট্টাচার্য, ১৯৫০

ছিন্নমূল। চলচ্চিত্রকার: নিমাই ঘোষ, ১৯৫১

কুমারী মন। চলচ্চিত্রকার : চিত্ররথ, ১৯৬২

সুবর্ণরেখা। চলচ্চিত্রকার: ঋত্বিক ঘটক, ১৯৬২

তিতাস একটি নদীল নাম। চলচ্চিত্রকার : ঋত্বিক ঘটক, ১৯৭৩

যুক্তি, তক্কো, গপ্পো । চলচ্চিত্রকার: ঋত্বিক ঘটক, ১৯৭৪

অসমাপ্ত চলচ্চিত্র

তারাশঙ্করের কাহিনী অবলম্বনে ‘বেদেনী’

শংকরের কাহিনী অবলম্বনে ‘কত অজানারে’

বগলার বঙ্গদর্শন

রংয়ের গোলাম