Home নির্বাচিত লেখা সুব্রত সেনগুপ্ত । সেলিম মোরশেদ ।। গল্প

সুব্রত সেনগুপ্ত । সেলিম মোরশেদ ।। গল্প

সুব্রত সেনগুপ্ত  ।  সেলিম মোরশেদ ।। গল্প
0
0

বই: শ্রেষ্ঠ গল্প – সেলিম মোরশেদ / গল্প /  ২০১৬, উলুখড়।।

 

২২শে মার্চ তার চৈতন্যের শেকল যা এতোকাল বৃত্তবন্দি ছিলো, হঠাৎ বিচূর্ণ হয়। তার, কিংবা সুব্রতর, শিরদাঁড়ায় মৃত বাবার উল্কি, যেটা সে ভুলে গিয়েছিলো মেধার বিবর্তন ঘটাতে বাদ সাধে। এবং সবকিছু যেন ভেল্কিবাজির মতো সুব্রতর শৈশব থেকে বর্তমান অবধি চংক্রমিত। তাই, ঘটনাপরম্পরা : কাপড় নষ্টের সময় থেকে কৈশোর, যৌনজীবন তথা বামপন্থী রাজনীতির ভাবাবেগ এবং সামাজিক অনাচারে সহনশীল যুবক সুব্রত সেনগুপ্তের গোপন বায়োডাটা, হতাশা ও ব্যর্থতা, এবং তার অনুতাপরশ্মি পাঠক অন্তরাত্মায় মুদ্রণের জন্য এভাবে তুলে ধরাই সঙ্গত বলে দেয়া হলো।

১. নগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত ছিলেন সুব্রত’র বাবা। ঠাকুরদা যোগেন্দ্রনাথ নগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্তকে তেমনভাবে মানুষ করেছিলেন, যে-রকম নিজে হয়েছিলেন তাঁর পিতামহ সুরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের সাহচর্যে। সুরেন্দ্রনাথ সম্ভবত সেই ব্যক্তি যিনি প্রাক-রবীন্দ্র কিছু ছোটোগল্পের নামে টুথপেস্ট গদ্যশৈলীর প্রবর্তন এবং মায়াকাহিনীতে বাঙালি পাঠককে বিভ্রান্ত করেছিলেন— যার উত্তরসূরি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, তাঁর ছুটি, মণিহারা অথবা দৃষ্টিদান-এর মতো গল্পগুলো বোধ হয়, সুরেন্দ্রনাথ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাড়াতাড়ি লিখেছিলেন।

২. সুব্রত সেনগুপ্তের বিএ পাশ ১৯৮৪ সালে। চার রকমের চারটি বোন রয়েছে। সুব্রত গৌরবর্ণের এবং বেঁটে। গোঁফ রাখে। কালো প্যান্টের ওপর শাদা শার্ট চড়ায়। লম্বা চুল রাখে। বেশি কথা বলার সময় তার গাল দিয়ে অহরহ থুতু ছোটে। সে স্বাস্থ্যবান। নগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের তেলের মিল ছিলো। সেটি সুব্রত’র আওতায় রয়েছে। মহকুমা শহরে নগেন্দ্রনাথ অনেক টাকা কামিয়েছিলেন। খরচও করতেন দেদার। কেউ আলোচনা করলে তিনি বলতেন— মানি ইজ জাস্টিফায়েড হোয়েন ইট ইজ স্পেন্ড।

নগেন্দ্রনাথের তেলের মিলের ঠিক কোয়ার্টার মাইল পেছনে, বিজয়নগর স্কুল। পেছনে একচিলতে মরা নদী, ঝোপঝাড়, বাগান। সুব্রত’র হাতে খড়ি সেখানে হয়। সে-সময় বিজয়নগর স্কুলের হেড মাস্টার ছিলেন, মুরারিমোহন দত্ত। তিনি শেষ বয়সে ভারতে চলে যান। তাঁর এক ছেলে বর্তমান বাংলাদেশের একটি ইংরেজি পত্রিকার সম্পাদনা বিভাগে জড়িত রয়েছেন।

৩. নগেন্দ্রনাথ পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে হার্ট এ্যাটাকে মারা যান। অথচ নগেন্দ্রনাথ সাংঘাতিক তাগড়া এবং ক্ষিপ্ত ছিলেন। ছেলেবেলায় এক রাতে বাবাকে একদিন সুব্রত ভূত মনে করেছিলো। মদ্যপ নগেন্দ্রনাথ হাতে পাউরুটি নিয়ে এক রাতে বাড়ি ফিরে হৈচৈ করতেই মা ধমকে দিলে নগেন্দ্রনাথ ক্ষেপে উঠলেন। সম্ভবত স্ত্রীর এই কঠিন ব্যক্তিত্বকে নগেন্দ্রনাথ মনেপ্রাণে ঘৃণা করতেন। তাই ভয়াবহ কিছু একটা করার অভিপ্রায়ে এদিক-ওদিক মাথা নাড়তেই দেখেন, সিঁড়ির গোড়ায় মরা বেড়ালটা পড়ে রয়েছে, নগেন্দ্রনাথ হঠাৎ মাথা নিচু করে অনেকক্ষণ ওইদিকে তাকিয়ে পাউরুটিটা ছিঁড়ে খেতে লাগলে মা তৎক্ষণাৎ অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। নগেন্দ্রনাথ তাড়াতাড়ি পানি খেয়ে দ্রুত অন্য ঘরে চলে গেলেন।

ধারাবাহিকভাবে সুব্রত’র শিক্ষাজীবন, মানসিক উৎকর্ষের সমস্যাবলি এবং রাজনৈতিক জীবন বিস্তারিত তুলে ধরা হলো :

সুব্রত’র খ্যাতি ও সুনাম সারা স্কুলে ছড়িয়ে পড়েছিলো সদালাপী, মিষ্টভাষী এবং গুরুজন-ভক্তির জন্য। মুরারিমোহন দত্ত সুব্রতকে নিজ সন্তানের মতোই স্নেহ করতেন। বরাবরই সুব্রত পড়াশোনায় মেধার পরিচয় দিতো। বিজয়নগর স্কুল থেকে তিন বার চ্যাম্পিয়ন হিসেবে সে ইন্টারডিস্ট্রিক্ট ফুটবল খেলার গৌরব অর্জন করেছিলো। সে ক্লাস এইটে বৃত্তি পায়। মহকুমা শহরে সুব্রত’র সাথে অনেকেরই পরিচয় ঘটে। ক্লাস টেন-এ তার সঙ্গে পরিচয় হয় একটি ছেলের—ছেলেটির নাম জগলুল : জগলুল সুব্রত’র সমবয়সী। সে অল্পবয়স থেকেই লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছিলো : কিন্তু ওই বয়সেও জগলুল চমৎকার ইংরেজিতে কথা বলতে পারতো। সে কোনো কাজ না করেই ভাইদের ঘাড়ে বসে খেলেও ভাইয়েরা তাকে চটাতো না : কেননা সে ভয়ঙ্কর প্রকৃতির ছিলো। একদা সে বলে, তার হাতে দশ/বারো জন বিপজ্জনক ছেলে আছে—এদেরকে সঠিক ব্যবহার করতে পারলে এ-শহরের সবাই তাদের দুজনকে সমীহ করবে। প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা জগলুলের ভীষণ : সুব্রত রাজি হয়, পরবর্তী সময়ে একের-পর-এক ছোটোখাটো অপরাধ সুব্রত এবং জগলুল তাদের দলবল নিয়ে সংঘটিত করে। নগেন্দ্রনাথ ছেলেকে তেমন কিছু বলতেন না, কারণ তাঁর অনেক প্রতিষ্ঠিত বন্ধুরা মাঝেমধ্যে সুব্রত’র খোঁজ নিতে নিজেরাই বাড়িতে আসতেন। থানা ইনচার্জও অজ্ঞাত কারণে সুব্রতকে ভালোবাসতেন।

কিছুদিন পর এসএসসি পরীক্ষায়— যেহেতু মেধাবী ও রাগী— নানারকম পথ অবলম্বন করে সে অত্যন্ত ভালো রেজাল্ট করে। নগেন্দ্রনাথও এ-সময় ছেলেকে পুরোপুরি শিথিল করে দেন। এবার জগলুল তাকে বড়ো বড়ো কেস ধরার জন্য অনুপ্রাণিত করে। সুব্রত হ্যাঁ-না কিছুই বলে না। এরপর জগলুল বলে, সৌরিন নামে তার এক পুরনো বন্ধুর কাপড়ের দোকান আছে— সে -দোকানের সামনে আর একটি দোকান— ওই দোকানের মালিকের নাম শেখর। সে সৌরিনের দোকানের খদ্দেরপাতিকে জোর করে ভাগিয়ে নিজের দোকানে নিয়ে যায়। শেখরকে প্রয়োজনীয় বাটাম দিলে সৌরিন ওদেরকে ভ্যাট সিক্সটি নাইন খাওয়াবে। সুব্রত রাজি হয়েছিলো বিষয়টিকে সামান্য ভেবে; কিন্তু ওদিকে সৌরিন জগলুলকে বলে— মারামারির সময় হঠাৎ সে যদি শেখরকে স্ট্যাব করতে পারে তাহলে গোপনে সৌরিন জগলুলকে একটা মোটর সাইকেল কিনে দেবে; যেটি সুব্রত জানতো না। ভাগ্য খারাপ সৌরিনের। জগলুল যাকে বলেছিলো শেখরকে স্ট্যাব করতে— সে ছেলেটি আনকোরা, তাড়াহুড়োতে শেখরের পরিবর্তে দণ্ডায়মান সৌরিনের ছোটো ভাইকে স্ট্যাব করে। এরপরেও জগলুল সৌরিনকে ছাড়েনি। সে সৌরিনকে বলে, যদি তাকে মোটর সাইকেল না কিনে দেয়, তাহলে সে সৌরিনের বড়ো দাদাকে সব বলে দেবে। সৌরিন জগলুলকে কিছুদিন পর আট হাজার টাকা দিয়ে পুরনো ‘Suzuki 80’কিনে দেয়।

এ-মুহূর্তে শহরে একজন পূর্ণাঙ্গ যুবকের আবির্ভাব ঘটে। তার নাম ইলিয়াস। সে আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্সে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত। দিনকে-দিন সুব্রত’র সঙ্গে ইলিয়াসের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। সুব্রতকে সে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের যে গল্পের শেষ নেই, মাওয়ের পাঁচটি প্রবন্ধ এবং রাহুল সাংকৃত্যায়নের নতুন মানব সমাজ পড়তে দেয়। পড়ে অবশ্য সুব্রত তেমন কিছু বোঝার চেষ্টা করেনি; সে তখন ইলিয়াসকে বেশি বোঝার চেষ্টা করে— কেননা, সে-সময় তার আগ্নেয়াস্ত্রের দরকার— ইলিয়াসের কাছে যে প্রচুর আগ্নেয়াস্ত্র আছে, সেটি সুব্রত আগে থেকেই জানতো।

স্টার্টার ছাড়া যেমন রডলাইট জ্বলে না— তেমনি বন্দুকের নল থেকেই ক্ষমতার উৎস বেরিয়ে আসে; সেহেতু শ্রেণিশত্রু খতম আবশ্যক। মাস দু-একের মধ্যে, শ্রেণিশত্রুর নামে ইলিয়াসের দুজন শত্রুকে সুব্রত নির্দ্বিধায় হত্যা করে। এর বিনিময়ে সুব্রত এবং জগলুল দুটি কাটা রাইফেল এবং একটি পিস্তল ইলিয়াসের কাছ থেকে পায়। ইতোমধ্যে সুব্রত ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হয়েছে। ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়ের কাঁটা ও কেয়া তার সাংঘাতিক লাগে।

মোটর সাইকেলের গদির ওপর আগ্নেয়াস্ত্র রেখে তার ওপর তোয়ালে চড়িয়ে, সে-তোয়ালের ওপর তারা দুজন বসে দূর গ্রাম থেকে প্রয়োজনীয় অস্ত্র নিয়ে আসতো।

সহজাত প্রবৃত্তিসহ সুব্রতর যৌনজীবন :

সুব্রত’র বয়স যখন আট, তখন মায়ের শরীরের প্রতি তার কৌতূহল ছিলো। কাঞ্চনবালা দেবী, যিনি সুব্রত’র মা, ক্ষুরধার- বুদ্ধিসম্পন্ন এক মহিলা। শিশুসন্তানের হঠাৎ এ-কৌতূহলকে কাঞ্চনবালা তিরস্কার করেননি। সুব্রতকে বুকের কাছে টেনে নিতেন। বলতেন, কি রে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমাকে কী দেখিস? মায়ের কথায় সুব্রত হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। এটা তার ভেতর লুকিয়ে থাকুক তা সে আদৌ চায় না। ওই বয়সে সুব্রত সাহস করে মাকে জিজ্ঞেস করেছিলো, ‘মা তোমার বুক উঁচু যে।’

কাঞ্চনমালা এ-প্রশ্নে হকচকাননি। ব্লাউজ থেকে স্তন দুটি বের করে সুব্রতকে বলেছিলেন, ‘মেয়েদের এ-রকমই। এই দুধ তুমি খেয়েছো।’তারপর থেকে মায়ের সঙ্গে সহজ হয়ে গিয়েছিলো সুব্রত।

এর বছরতিনেক পরের ঘটনা। বিজয়নগর স্কুলে ধর্ম পড়াতো একজন যুবক শিক্ষক। তার নাম সুকুমার। সুকুমার ক্লাসে সবচে কড়া শিক্ষক হিসেবে পরিচিত ছিলো। সুকুমার হলুদ পাঞ্জাবি পরে হাতে বেত নিয়ে ধর্ম বোঝাতো। বড়ো ক্লাসের ছেলেরা সুকুমারকে ধর্মের ষাঁড় বলতো। ওই সময়কার একটি দিনের কথা : সেদিন প্রচণ্ড বৃষ্টি পড়েছিলো। সুব্রত’র বাসা থেকে সুকুমারের বাসা প্রায় পাশাপাশি। ওইদিনে সুকুমার তাকে বলে, আজ সবাই চলে গেলেও সুব্রতকে তার কাছে একঘণ্টা পড়তে হবে। ক্লাসরুম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সুকুমার স্কুলের পেছনে নদীর পাশে এক নিস্তব্ধ জায়গায় পড়ানোর বাহানা তোলে। সুব্রত’র কাছে বিষয়টি ভালো লাগে না। এ-সময় সুকুমার সুব্রত’র পিঠ, নিতম্ব এবং তলপেটে হাত দিয়ে আদর করে জাপটে ধরে। সুব্রত আপত্তি করলেও ভয়ে কিছু বলে না। অবশেষে সুকুমার সুব্রতকে আধা-উলঙ্গ করে সমকামের নিষ্ক্রিয় সঙ্গী বানায়। এ-অনুভূতিটি সুব্রত’র কাছে একেবারে নতুন। তবে এ-কথা ঠিক, শৈশবে বন্ধু-বান্ধবের পিঠের ওপর চড়ে ধস্তাধস্তিতে এক ধরনের শারীরিক সুখ পেয়েছে। ঘুমের ঘোরে পাশের বন্ধুকে কখন যে জড়িয়ে ধরেছে টের পায়নি। নিজেদের প্যান্ট দ্রুত খুলে ফেলেছে অবলীলায়। বোনদের সঙ্গে জাপটাজাপটি করেছে যখন, তখন নিম্নাঙ্গ স্ফীত হওয়ায় সুব্রত অবাক হয়ে লজ্জা পেয়েছে; কিন্তু সুকুমারের সঙ্গে এ-পদ্ধতিতে সুব্রত’র নিশ্চিত ধারণা হয়, বাবা-মা’র মধ্যে পরস্পর সম্পর্ক অবশ্যই এরকম। সে-রাতে এসব নিয়ে সে ভাবে। শেষমেশ অনেক ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়; তার মনে হয়, শিশুরা মায়ের নিতম্ব দিয়েই ভূমিষ্ঠ হয়।

এরপর থেকে সুকুমার সুব্রতকে প্রায় একবছর ধরে ব্যবহার করে এবং দীর্ঘ বয়সের ব্যবধানেও তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বছর কয়েকের মধ্যে সুব্রত’র সুপ্ত যৌন-ঈপ্সা হঠাৎ তাকে কাণ্ডজ্ঞানহীন করে তোলে। সে এর মধ্যে যে কাজটি করে তা মানুষের গোপন প্রবৃত্তি হলেও পরবর্তীকালে সে অনুশোচনায় দগ্ধ হয়। আগেই বলা হয়েছে সুব্রত’র চার বোন। বড়ো বোনের নাম বীণা, মেজো বোন কণিকা, তৃতীয় বোনটির নাম ডলি, রেণুকা মায়ের কোলপোছা সবচে’ছোটো বোন। বীণা সুব্রত’র থেকে আট বছরের বড়ো, কণিকা বীণা থেকে তিন বছরের ছোটো, ডলি সুব্রত’র থেকে এক বছরের বড়ো, ছোটো বোন রেণুকা সুব্রত’র থেকে নয় বছরের কমবয়সী।

বিজয়নগর স্কুলের পেছনে সেই ঝোপটার ভেতর সুব্রত একদিন দুপুরে বসে আছে। তখন তার বয়স চৌদ্দ হবে। সে-সময় তার সেজো বোন ডলি কোথা থেকে যেন মেহেদি পাতা ছিঁড়ে একটি ঠোঙায় ভরে বাড়ি ফিরছে। ডলি সুব্রত’র একবছরের বড়ো হলেও ভাইবোনের মধ্যে প্রচণ্ড মিল। সুব্রতকে একা থাকতে দেখে ডলি পাশে এসে দাঁড়ায়। কী ভেবে সুব্রত হঠাৎ ডলিকে বলে— এখানে বসে বসে আয় গল্প করি। ডলি তৎক্ষণাৎ বসে পড়ে। কথা বলতে বলতে অকস্মাৎ সুব্রত ডলির ঘাড় এবং বুকের ভেতর হাত ঘষে। ডলি ইতস্তত করে। একপর্যায়ে ডলিকে সুব্রত বুকের মধ্যে টানতে চায় ক্ষিপ্র হওয়ার মতোই। কেন এসব করছে তা সুব্রত নিজেই বুঝতে পারে না। শুধু এইটুকু বোঝে, ডলির সঙ্গে জড়াজড়ি করতে পারলে আসলে তার ভালো হয়।

ডলি ছিটকে ঝোপ থেকে বেরিয়ে হনহন করে বাড়ির দিকে হাঁটে। সুব্রত তখন নিজেকে অপরাধী মনে করে। অথচ সে-রাতে সুব্রত ডলির সঙ্গে উলঙ্গ অবস্থায় কী সব করছে, এইরকম স্বপ্ন দ্যাখে— যা তাকে আরও আহত করে। একবার সুব্রত’র ইচ্ছে হয় মাকে গিয়ে সব বলতে, কিন্তু পারে না, ভয় হয়, পাছে মা তাকে মেরে দূর করে দেন।

আরও বিচিত্র বিষয় কিছুদিন পর সুব্রত’র জীবনে এলো। সুকুমার এক অসম্ভব প্রস্তাব আনে : সে কণিকা, অর্থাৎ সুব্রত’র মেজো বোনকে ভালোবাসে। এ-ব্যাপারে সুব্রতকে তার সাহায্যে চায়। ইদানীং সে সুকুমারকে দেখতে পারে না। তবুও কণিকাদির কাছে, বাধ্য হয়ে সুব্রত, সুকুমারের প্রেমের চিঠি পৌঁছে দেয়। প্রথমদিকে কণিকা রাজি হয়নি। পরবর্তীকালে সুব্রত’র গাঢ় সহযোগিতায় কণিকার সঙ্গে সুকুমারের প্রণয় ঘটে।

উল্লেখ্য, তার দুবছরের ভেতর সুকুমারের সঙ্গে পারিবারিক অমতেই কণিকার বিয়ে হয়। এ-বছরদুটির ভেতর সুব্রত স্বমেহন শিখেছে। একজন কাজের মেয়ের সঙ্গে তার ইতোমধ্যে দুবার সঙ্গম হয়েছে : মেয়েটি সুব্রতকে সঙ্গম-পদ্ধতি বুঝিয়ে দিয়েছে।

বারো বছর পর দেখা যাক : কৈশোর এবং তারুণ্য পেরিয়ে সুব্রত যুবক এখন। সে এখন নগরে অবস্থান করে। জগলুলের বোন চামেলিকে নিয়ে সংসার পেতেছে সাবলেটে। জগলুল বেশ কিছুদিন আগে আবুধাবি গেছে। সুব্রত এবং চামেলি দুজনই এক গার্মেন্টসে চাকরি নিয়েছে। চামেলির প্রতি সুব্রত’র ভালোবাসা এতো প্রগাঢ় নয় যতোটুকু চামেলি সুব্রতকে বাসে। সুব্রত এমএ-তে ভর্তি হবে বলে ঠিক করেছে : সে এখন ভালো ভালো বই পড়াশোনা করে। চামেলিকে বিয়ে করে মুসলমান হওয়ায় সে পরিবার থেকে বিযুক্ত, তবে চিঠিপত্রের যোগাযোগ রয়েছে। বীণা এবং ডলি সুখে আছে। কণিকা সুব্রতকে জানিয়েছে, সুকুমারের সঙ্গে সে ভীষণ অসুখী। সুব্রত চিঠিতে কারণ জানতে চেয়েছিলো : কণিকা বিষয়টি এড়িয়ে গেছে।

এরমধ্যে নগরে সুকুমারের সঙ্গে সুব্রত’র একদিন দেখা হয়। সুব্রত তার কুশলাদি জানতে চাইলে সুকুমার প্রায় বিমর্ষ হয়ে বলে— সে নাকি কণিকার মধ্যে তাকে খুঁজতে চায়। লোকমুখে সুব্রত জানতে পেরেছে : কাঞ্চনবালা দেবী সুব্রতকে সন্তান হিসেবে অস্বীকার করেছেন।

(সুব্রতের ভাষ্য অনুযায়ী) তার মানসিক উৎকণ্ঠা, হতাশা এবং অনুতাপ যতোদূর সম্ভব তুলে ধরা হলো :

এখন চোখ বন্ধ করলে ক্যারম বোর্ডের কালো গুটির মতো গোল-গোল অন্ধকার তাকে আঁকড়ে ধরে। নিজের অস্তিত্বের ইন্দ্রিয়ানুভূতি তার কাছে প্রায়শই বহনযোগ্য। সে অফুরন্ত আনন্দে সবকিছু ভুলে থাকতে চায়, কিন্তু তার সামাজিক নিঃসঙ্গতা মানসিক বিপর্যস্ততাকে বাড়িয়ে তোলে। সর্বোপরি, দিনরাত কাজ করে যে-অর্থ তারা স্বামী-স্ত্রীতে উপার্জন করে তাতেও তাদের কুলিয়ে ওঠে না। শিশুদের আদর করতে পারে না সে, তার মনে হয়— তারা নিশ্চয় কোনো-না-কোনো ব্যাপারে তাকে সন্দেহ করছে। কোনো মেয়ের দিকে তাকাতে সে ভীত হয়, তার নিশ্চিত ধারণা,— মেয়েটি ভাবছে, সুব্রত তার প্রতি অশ্লীল ইঙ্গিত করছে। কোনো ভিড়ের ভেতর পুলিশ দেখলে সুব্রত’র মনে আসে এখনই হয়তো-বা তাকে ধরে নিয়ে যাবে। তার বন্ধুর সংখ্যা কম, প্রতিটা বন্ধুকে সে সন্দেহ করে, মনে করে, তারা তাকে অপমান করার চেষ্টা করছে। কোনো বন্ধু ভালো সিগ্রেট খেলে সুব্রত তাকে ঠ্যাক দিয়ে কথা বলে। প্রোডাকশন ম্যানেজার সুব্রতকে কোনো কথা বললে তৎক্ষণাৎ চাকরি ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করে তার। গোপনে গোপনে লক্ষ করে, চামেলি কারো সঙ্গে মেলামেশা করে কিনা। অফিসের প্রত্যেককে সে জানিয়েছে, সে ভয়ংকর লোক। বড়ো পরিবার থেকে এসেছে— প্রতিষ্ঠিত স্বজনদের সঙ্গে সে যোগাযোগ রাখেনি— স্কুলে রেজাল্টও তার ভালো : ভালো খেলোয়াড় সে। আর দশ জনের মতো সে মদ খায় না, মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশা কম। রাজনীতি সে করেছে : আন্দোলনের প্রতি তার কোনো আস্থা নেই। যেকোনো মহৎ শিল্পই তার কাছে দুর্বোধ্য ঠেকে। সে কথায় কথায় সেন্টিমেন্টাল হয়ে যায়। নিজেকে পাপী হিসেবে ধরে নিয়েছে বলে নিজের মুখোমুখি হতে চায় না সে।

লেখকের সঙ্গে সুব্রত’র সাক্ষাৎকার :

আত্মহত্যা বিষয়ে কী ভাবেন?

এটি একটি মুহূর্ত শুধু। এ-রকম মুহূর্ত জীবনে আসতে পারে। তবে মুহূর্তটা কাটিয়ে উঠতে পারলে আবার বেঁচে থাকা যায়।

সেটি কোন মুহূর্ত?

সত্তার ভেতর যখন দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিটা নিশ্চল হয়।

আপনার ভেতর সেটি কি সচল?

অনেকাংশে না।

অর্থাৎ আপনি আত্মহত্যা চান?

হ্যাঁ, তবে সাহসের অভাবে পারি না।

কারণ?

নিশ্চুপ।

সাহস পরিবেশগত, না জন্মগত?

বিষয়টি ভাবিনি কখনও।

পাপ বিষয়ে বলুন?

পাপ আছে কিনা জানিনে, তবে পাপবোধ পাপের চেয়েও মারাত্মক।

দেশে রাজনৈতিক ওলোটপালোট— এ বিষয়ে ভাবেন?

না।

কেন?

অকারণে ঝামেলায় গিয়ে লাভ কী। তাছাড়া আসলে আমার মানসিক সমস্যার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্কও নেই।

আসলে কি ঠিকমতো ভাবছেন বিষয়টি নিয়ে?

নিশ্চুপ।

দু’জনকে যে হত্যা করেছিলেন তাতে পুলিশ কেস হয়েছিলো আপনার?

না, তারা দু’জন বড়ো ক্রিমিনাল ছিলো এবং স্মাগলিং করতো। পরে জেনেছি ইলিয়াসকে ওরা ভাগ দেয়নি বলে আমাকে দিয়ে ইলিয়াস ওদেরকে হত্যা করে।

পরবর্তী সময়ে ইলিয়াসকে কিছু বলেননি?

না।

কেন?

ও ভয়ানক…। আর বলেও-বা লাভ কী?

কবিতা পড়েন?

না।

কেন?

বুঝি না। তাছাড়া, সব কবিতা ইদানিং একই রকম!

যুদ্ধ প্রসঙ্গে বলুন।

পছন্দ করি না।

শেষপর্ব :

এইপর্যন্ত লেখা অবধি সুব্রত নতুন কোনো চিন্তায় নিজেকে নিয়োজিত করেছে বলে এখনও জানা যায়নি।